Home

  • মাইকেল হানেকের ফানি গেমস্: অবিনির্মাণের চলচ্চিত্রায়ণ

    মাইকেল হানেকের ফানি গেমস্: অবিনির্মাণের চলচ্চিত্রায়ণ
    স্ত্রী-পুত্র-স্বামীর সুখী সংসারঃ মাইকেল হ্যানেকের ফানি গেমস
    ফানি গেমস ছবির ডিম চাওয়ার দৃশ্য

    ফানি গেমস্ (১৯৯৭) ছবির ব্যাপারটা আপাতভাবে খুবই সরল — পরিপাটি স্ত্রী-স্বামী-পুত্রের এক সংসারে হঠাৎই প্রবেশ করে পল আর পিটার নামক দুই অজ্ঞাতকুলশীল যুবক। তারা ঘরে প্রবেশ করে ডিম চাওয়ার ছুতোয়। পাশের বাড়ি থেকে ডিম চাওয়ার স্বাভাবিক দৈনন্দিনতা হঠাৎই পরিণত হয় অস্বাভাবিক এক নিয়মহীন খেলায়। আমাদের মনে পড়তে পারে আলফ্রেড হিচককের রেয়ার উইণ্ডো (১৯৫৪) ছবিটির কথা প্রসঙ্গক্রমে — আমার পাশের বাড়িতেই কীভাবে এক খুনির আবির্ভাব হয় তা আমি নিজেই টের পাই না। দৈনন্দিনতাই অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে, আমরা অসহায় হয়ে পড়ি। মূলত মেলোড্রামা হওয়া সত্ত্বেও বাস্তবোচিত যে অবশেষটুকু পড়েছিল হিচককের থ্রিলারে তাও যেন অবলুপ্ত হয়ে যায় হানেকের ফানি গেমস্-এ। ছবিটি সর্বার্থেই এক খেলা হয়ে ওঠে। রোজকার এক ঘটনা থেকে সূত্রপাত হয় যাবতীয় সমস্যার। তারপর ধীরে ধীরে অসহায় হয়ে পড়ে বাড়ির মালিক, স্ত্রী-পুত্রসহ। হানেকে ক্রমশ আমাদের নিরাপদ দেখাকে বিপন্ন করে তুলতে‌ সচেষ্ট হয়ে ওঠেন। বুর্জোয়া গার্হস্থ্যযাপন প্রায়শই ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় কোনো এক রহস্যময় অমঙ্গল শক্তির অনুপ্রবেশে। ‘অমঙ্গল’ শব্দটির অন্তর্নিহিত কূটাভাস হয়তো আমাদের বুঝতে সাহায্য করতে পারে পুনঃপুনঃ ঘটতে থাকা এই অনুপ্রবেশের তাৎপর্য। প্রাসঙ্গিকভাবে, মাইকেল হানেকের দর্শকের খেয়াল হতে পারে ক্যাশে (২০০৫) ছবিটির কথা — সেখানেও আমরা দেখেছি ‘অমঙ্গল’-অনুপ্রবেশের এক হতবুদ্ধি করে দেওয়া সমগোত্রীয় উপস্থিতি। অনুপ্রবেশের ধারণা যে ইউরোপীয় আর্ট ফিল্মের এক উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য এবং তা যে উন্মোচন করতে পারে সত্ত্বা বিষয়ক প্রশ্নের নানা স্তর, তা নির্দেশ করে টমাস এলসেসার আমাদের জানান এই হামলাকারী প্রায়শই স্বামী-স্ত্রী-পুত্রের ছোট পরিবারের ‘অভ্যন্তরীণ সমস্যার আত্ম-অবিনির্মাণের’ ‘অনুঘটক’। সেদিক থেকে ভেবে দেখলে এর উপস্থিতি ইতিবাচক। এলসেসার নির্দেশিত এই ইতিবাচক দিকটি অবিনির্মাণের সূত্র ধরে পড়া যেতেই পারে। পাশ্চাত্য মেটাফিজিক্সের শুরু থেকেই রয়ে গেছে থাকবন্দের (hierarchy) প্রণালী। ভাবা যেতে পারে যে থাকবন্দের আপাত নির্দিষ্টতায় দোলাচল ধরাই দেরিদার দার্শনিক প্রকল্পটির উদ্দেশ্য। পাশ্চাত্য দর্শনের ন্যায়কেন্দ্রিকতার (logocentrism) মধ্যে অতিরিক্ততার ধারণা নিয়ে আসে অবিনির্মাণ (deconstruction)। এই অতিরিক্ততা আসে দোলাচল থেকে। গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক্ দেখান যে “অবিনির্মাণ টেকসই বস্তুর তাপ্পি খোলে, জ্ঞানের আপাতদৃষ্টিতে সুপ্রতিষ্ঠিত ভূমিতে অন্তহীন কম্প লাগায়, কিন্তু কর্মক্ষেত্র বজায় রাখে”ফানি গেমস্ একইভাবে ‘কম্প লাগায়’ আতিথ্যের চিরচেনা ধারণায়। অতিথি ও অতিথিসেবকের অবস্থানের নির্দিষ্টতা খসে যায়। কে যে অতিথি, আর কার যে ঘর কিছুই নির্ণয় করা যায় না। অবিনির্মাণের পদ্ধতিতে যেভাবে প্রায় টের পাওয়া যায় না কোনটা মূল টেক্সট আর কোনটাই বা আসছে রেফারেন্স হিসেবে। বর্তমান প্রবন্ধটিতে দেখানোর চেষ্টা করব কীভাবে অতিরিক্ততা আর দোলাচলের প্রতিরূপায়ণে হানেকের ছবিটিই হয়ে উঠছে অবিনির্মাণ পদ্ধতির চলচ্চিত্রায়ণ। আতিথ্যের ধারণাটি নিয়ে পুনর্বার ভাবতে প্ররোচিত হই। খেয়াল করি যে প্রশ্নের মুখে পড়ে (দর্শক হিসেবে) আমার সক্রিয়তা। নিজের ঈক্ষণকামী অবস্থান নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারতাম। কিন্তু তাও বিঘ্নিত হয়। যে গোপন স্বায়ত্বশাসন দাবি করে ঈক্ষণকামের বিষয়ী, তাও আর নিরাপদ থাকে না ছবিতে। ঐ দুই ক্রীড়ারত অজ্ঞাতকুলশীল যুবক বেশ জানে কে তাদের দেখছে — কেবল তারাই অতিথি নয়, দর্শকরাও যেন অতিথি হয়ে ওঠে এই খেলায়। বিষয়ের ‘নিজস্ব’ মুহূর্তে বিষয়ী চায় তাকে আত্মগত করতে। আর “দৃষ্টি ফেরত দেবার শর্তই হল বিষয়ীর দৃষ্টি সম্পর্কে অপরের চৈতন্য’ এবং তা বিষয়ীর ‘বীক্ষণকে টলোমলো করতে [পারে] এবং পারস্পরিকের মধ্য দিয়ে প্রত্যাঘাতের সম্ভাবনা সূচিত [হয়]”। তাই যদি হয়, তবে আমাদের, ফানি গেমস্-এর দর্শকদের, কোনো আড়াল নেই। এই খেলায় অংশগ্রহণ করতে আমরা বাধ্য হয়েছি। আখেরে এই খেলাই আমাদের বিপন্ন করবে। আমরাও কি তবে পল আর পিটারের অতিথি? পল আর পিটারের দর্শক হয়ে কি যথাযথভাবে সীমা (‘threshold’) অতিক্রম করতে পারছি আমরা? পারছি কি নিজের পরিচিতির ঊর্ধ্বে উঠতে? পল আর পিটার সম্ভবত উঠতে পেরেছে। তবে আতিথ্য সম্পর্কিত আশঙ্কাটি কোথায়? অবিনির্মাণের পদ্ধতিটিই বা কীরকম?

    মোটামুটি টের পাওয়া গেল মাইকেল হানেকে কাজ করছেন একটি গভীর দার্শনিক সমস্যা নিয়ে। তবে ফানি গেমস্ ছবিটির গ্রটেস্ক দৃশ্যাবলির পরতে পরতে ইচ্ছাকৃতভাবে রয়ে গেছে স্থূল রসিকতা। প্রাচীন গ্রীক দর্শনে প্লেটোর সংলাপ ভেস্তে দেয় ইয়ার্কির মুখোমুখি গম্ভীরতাকে দাঁড় করানোর প্রবণতাটিকে। হানেকেও কি চান এমনই এক গুরুগম্ভীর আলোচনা যা কৌতুকময়? আদর্শ রাষ্ট্র বানানোও এক খেলার মতো যেন। তাই, কীরকম হবে আদর্শ সেই রাষ্ট্রের নেতৃবর্গ, সেখানকার মানুষ, এ নিয়ে বলতে বলতে রিপাবলিক-এ যখন গম্ভীর হয়ে যান সক্রেতিস, তখন আত্ম-তিরষ্কারের সুরে বলেন, যা বললাম তা বলে ফেললাম বেশ গম্ভীরভাবেই — ‘I forgot we were playing and spoke too vehemently.’ হানেকেও যেন দার্শনিক কচকচির মধ্যে ভুলতে দিতে চান না যে আসলে আমরা খেলছি। অ্যাথেন্সে এরকমই এক দ্বৈধের মুখে পড়েন সক্রেতিস তাঁর শেষ বিচারের সময়। বোঝা যায় না তিনি কি একজন বিদেশি? আলঙ্কারিক ভাষাব্যবহারে শ্রেষ্ঠ সক্রেতিস বুঝতে পারেননা আদালতের কেজো ভাষা। তাঁর যেহেতু সেই দক্ষতা নেই, নিজেকে মনে হয় এক ‘বিদেশি’। অফ হসপিটালিটি গ্ৰন্থে এই প্রসঙ্গে জাঁক দেরিদা পুনর্বার ভাবতে শুরু করেন আতিথ্যের স্বভাবধর্ম (ethics) বিষয়ে। আত্ম-অপরের সম্পর্ক পাশ্চাত্য দর্শনের একটি মূলগত সমস্যা। প্রথাগতভাবে এই সম্পর্কটি পর্যবসিত হয় প্রায় প্রভু-ভৃত্যের এক অসম সম্পর্কে যেখানে আত্ম সবসময় অধিকার করতে চায় অপরকে। অধিকার করবার মধ্যে রয়েছে অপরকে বস্তুতে পরিণত করবার প্রবণতা। বিংশ শতাব্দীতে ইমানুয়েল লেভিনাস ও জাঁক দেরিদার মতো দার্শনিকেরা আত্ম-অপরের সম্পর্ককে পড়বার চেষ্টা করেছেন স্বভাবধার্মিকভাবে — কীভাবে অপরের স্বরূপকে গ্রহণ করতে পারে আত্ম? এর মধ্যেও রয়েছে এক ধরণের অসম্ভব্যতা। অবিনির্মাণের স্বভাবধর্ম ধরে, আতিথেয়তা, ক্ষমা, বন্ধুত্ব, হিংসা, মৃত্যু ইত্যাদি নিয়ে জাঁক দেরিদার দার্শনিক ভাবনা আমাদের গোচরে আনে (অ)সম্ভব্যতার সূত্রগুলি। অপরকে অধিকার না করে, তাঁর সাথে সম্পর্ক স্থাপনে এ এক (অ)সম্ভব প্রচেষ্টা। নৈতিকভাবে ভেবে দেখলে, যে মুহূর্তে বিদেশি প্রবেশ করে অন্দরে, সত্তার আপাত সুরক্ষিত স্থিরতায় এক কঠিন আঘাত পড়ে। আমন্ত্রণ জানানো এক স্বভাবধার্মিক প্রক্রিয়া এবং আমন্ত্রণের মুহূর্তে আমন্ত্রক ত্যাগ করেন তাঁর ব্যক্তিস্বার্থ, কেননা অপরের দায় গ্ৰহণ করবার প্রতিশ্রুতি নিহিত এই কাজে। নিজের ঘর দুয়ার খোলা রেখে নিজেকে বোঝানো “আমারে যে জাগতে হবে, কী জানি সে আসবে কবে,” অপরের প্রতি এই চিরসমর্পণ ব্যক্তিসত্তা বিষয়ে এত গভীর দার্শনিক সমস্যা উন্মোচিত করে যে আমন্ত্রণ, স্বভাবধার্মিকভাবে, এক (অ)সম্ভাব্যতা হয়ে দাঁড়ায়। পাশাপাশি আরেকটি সমস্যার উত্থাপন করেন দেরিদা:

    To dare to say welcome is perhaps to insinuate that one is at home here, that one knows what it means to be at home, and at home one receives, invites, or offers hospitality, thus appropriating for oneself a place to welcome [accueillir] the other, or, worse welcoming the other in order to appropriate for oneself a place and then speak the language of hospitality.

    দেরিদার ‘অফ হসপিটালিটি’ বই

    অতিথি আর অতিথিসেবকের অবস্থানের নির্দিষ্টতায় যেন এক দ্বিধা সঞ্চারিত হল। কখনো কি একটি ঘর নির্ণয় করতে পারেন আমন্ত্রক? নাকি আমন্ত্রণ করবার মাধ্যমেই তিনি ঘরকে নিশ্চিত করেন? টের পাওয়া যায় এই খটকাটি — অপরকে আমন্ত্রণ করব কীভাবে, আমার নিজেরই তো নির্দিষ্ট ঘরের কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। সক্রেতিসেরও অ্যাথেন্সে মনে হচ্ছিল যে তিনি বিদেশি। আমারও তো নিজের ঘরের নিরালায় হঠাৎই কিংকর্তব্যবিমূঢ় বোধ হয়। ঘরে কীভাবে যেন এক উনহেইমলিশ প্রবেশ করে। যখন ঘরই নেই তখন আমন্ত্রণ করব কীভাবে আমি? আমন্ত্রণ তো জানাবো আমি নিজের বা নিজের ঘরের ওপর কর্তৃত্ব ত্যাগ করতে। এই দুইয়ে মিলে কি সৃষ্টি হচ্ছে না এক অসম্ভাব্যতার? ঘর বিষয়ক একটি বক্তৃতা অরিন্দম চক্রবর্তী শেষ করেছিলেন এই বলে, “নিজের ঘর সেখানে ফেরত গিয়ে আমি বুঝি এটা আমার নিজের ঘর নয়। আমার এই নিজের ভাবটাকে দূর করবার জন্য আমার ঘরে বসেই এই জ্ঞান হতে পারে”। অদ্ভুতভাবে ধ্বসে যায় ক্ষমতা ও মালিকানার ভাবনাগুলি। ঘরের সাথে যে আগলের অন্তরঙ্গ সম্পর্ক, তা প্ররোচিত করে আমাদের সুরক্ষিত মালিকানার দিকে। বুদ্ধ ভগ্নস্তূপ ঘরের চিত্র অঙ্কিত করে তার সাথে তুলনা করেছেন লোভ লালসা মুক্ত এক আমি-র। ‘বেঘর’ আর ‘বে-আমি’ যেন এক। ঘরের নির্মাণই যেন হয় অপরের উদ্দেশ্যে। প্রশ্নাতীত স্বাগত জানানোই তাহলে আতিথেয়তার মূল। ‘প্রশ্নাতীত’ শব্দটির মধ্যেই রয়েছে নিঃশর্তের ভাবনা। দেরিদা জানান শর্তহীন আতিথেয়তা (‘absolute hospitality’) ন্যায় কানুন দ্বারা বৈধ আতিথেয়তার ভাবনা থেকে গুরুতররকম পৃথক। শর্তহীন আতিথেয়তা প্রত্যাশাহীন, নিষ্প্রশ্ন। নিজ গৃহের দরজা সর্বদা খুলে রাখার ওপরই তা নির্ভর করে — অপেক্ষা করা, কেবল‌ গোলমেলে পরিচয়ের বিদেশির জন্য নয়, সেই সম্পূর্ণ অপরিচিত অপরের জন্যেও। আত্মের সার্বভৌমত্ব আতিথ্য এতটাই কেড়ে নেয় যে আমার আতিথ্য প্রদানের সম্মতিও চায় অপরের সমর্থন। আতিথ্য তখনই সম্ভব হয় যখন অপর সম্মতি জানায়। অপরের সম্মতির পশ্চাতে আসে আত্ম-র সম্মতি। এই প্রক্রিয়ার সম্পূর্ণতা খুলে দেয় অন্তহীন এক অপরকে — ‘This responsible response is surely a yes, but a yes to preceded by the yes of the other’।8 তবে কি অন্তহীন অপর অসম্ভাব্য আতিথেয়তার কথা বলে? দয়া: রামমোহন রায় ও আমাদের আধুনিকতা বইতে, রণজিৎ গুহ অনুভূতি, অভিজ্ঞতা, কর্তব্যবোধের মধ্য দিয়ে ধরতে চেয়েছিলেন প্রাগভিজ্ঞের (a priori) ক্ষেত্র। বহির্জগতের অভিজ্ঞতা সীমিত করে আমাদের অন্তরের কর্তব্যবোধ। অন্তরের কর্তব্যবোধে রয়েছে অনুভূতির প্রাবল্য। সেদিক থেকে ভেবে দেখলে, স্বভাবজ যে প্রাগভিজ্ঞ তা বহন করে অন্তহীন অপরকে ধারণ করার সম্ভাবনা। এই অন্তহীনতাকেই যেন স্বাগত জানানো হয় অপরকে স্বাগত জানানোর সঙ্গে সঙ্গে — ‘The response is called for as soon as the infinite — always of the other — is welcomed’১০ফানি গেমস্-এ কি তবে অন্তহীনতার ভার গ্রহণ করতে পারল না সেই স্ত্রী, স্বামী আর পুত্র? আপন স্বভাব থেকে এতটাই বিচ্ছিন্ন আমরা যে নিষ্প্রশ্ন গ্ৰহণ করতে পারি না অপরের অন্তহীনতাকে?

    নাকি অতিথিই কখনো হয়ে ওঠে পরজীবী? অতিথিসেবকের সাথে আর আলাদা করা যায় না তাকে কেননা সে বেঁচে থাকে অতিথিসেবকের শরণে। শরণে নাকি তাকে অধিকার করে? আতিথ্যের স্বভাবধর্ম সমগ্ৰ আলোচনার প্রেক্ষিতটি তৈরি করে। তবে হানেকে, প্রকৃতপ্রস্তাবে, সচেষ্ট থাকেন পরজীবী সংক্রান্ত বীভৎসতার প্রতিরূপায়ণে। ফানি গেমস্-এর খেলা আসলে অতিথিসেবককে দখল করবার খেলা। দৈনন্দিনতা ছেনে বেরিয়ে আসে এক ভয়াবহতা যেখানে অতিথিসেবক ক্রমে আক্রান্ত হতে থাকে। পল আর পিটারের কোনো কুলকুলজি আমরা জানিনা। তাদের আগমন হয় আচম্বিতে। এসেই তারা প্রশ্নের মুখে ফেলে ছোট সেই পরবিবারকে। প্রশ্নটি আস্তিত্বিক। অফ হসপিটালিটি-তে জাঁক দেরিদা বলেন এই বিদেশি আদপে পিতৃহন্তা — সে প্রবেশ করে গৃহকর্তার সার্বভৌমত্ব নষ্ট করে। গৃহকর্তার সার্বভৌমত্বর সঙ্গেই সম্পৃক্ত ন্যায়কেন্দ্রিকতা। বিদেশি নাড়িয়ে দেয় ‘the threatening dogmatism of the paternal logos১১। এতক্ষণ তাও এক অবস্থানগত নিশ্চয়তা বোঝা যাচ্ছিল — কেউ কেউ ঘরের কেউ কেউ ঘরের বাইরের। ধীরে ধীরে সেটিও অস্পষ্ট হয়ে যায়। ফানি গেমস্-এ পাঁচজনের প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে বিদেশি। অতিথির হন্তারক সত্তা হয়ে ওঠে স্পষ্টতর। ঘরের বীভৎসতা ধীরে ধীরে প্রকট হয়। এখানেই বোঝা দরকার প্যারাসাইট ও হোস্টের সম্পর্ক। এই সম্পর্কই প্রকাশ করে হানেকের ছবিটি কীভাবে হয়ে ওঠে অবিনির্মাণ প্রদ্ধতিটিরই চলচ্চিত্রায়ণ। জে. হিলিস মিলার তাঁর ‘দ্য ক্রিটিক অ্যাজ হোস্ট’ প্রবন্ধে এই সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেছেন। এম.এইচ. আব্রামসের একটি লেখার প্রতিসমালোচনা করতে গিয়ে তিনি দেখান, আসলে প্যারাসাইট আর হোস্টের কোনো অবস্থানগত স্থিরতাই থাকে না আর। যেটাকে মনে হয়েছিল আক্রান্ত হোস্ট আর আক্রমণকারী প্যারাসাইট, তা ত্রিমুখী কাঠামো তৈরি করে। সম্পর্কটি গেস্ট, হোস্ট আর প্যারাসাইটের এক ত্রিকোণ সম্পর্ক, কোনো পরিপূর্ণ বিপরীত নয়। ফানি গেমস্-এ পল আর পিটার নিছকই কোনো হন্তারক হয়ে আসে না, যেভাবে সাধারণ জ্ঞানে রেফারেন্স আসে টেক্সটে। স্ত্রী স্বামী পুত্রের সেই ঘরও টিকতে পারবে না, পল আর পিটার ছাড়া। হোস্টেরও প্রয়োজন প্যারাসাইটকে। এটিই অবিনির্মাণের স্বভাবধর্ম। যেরকম দেরিদা জানান অপরের হ্যাঁ-র অগ্ৰাধিকার বিষয়ে, অরিন্দম চক্রবর্তী বে-ঘর হবার মধ্যেই খুঁজে পান সত্তার চৈতন্যময় জাগরণ, সেভাবেই পল আর পিটার ঘরের ‘মালিক’দের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে স্থিরতর অবস্থানকে নাড়িয়ে দিয়ে। ক্রমশ টের পাওয়া যায় অবিনির্মাণের অতিরিক্ততা ফানি গেমস্-এ — উৎসহীন, স্থিরতাহীন। যেন বা, মিলারের ভাষায়,

    a strange sort of chain without beginning or end, a chain in which no commanding element (origin, goal, or underlying principle) may be identified. … The relation between any two contiguous elements in this chain is a strange opposition which is of intimate kinship and at the same time of enmity.১২

    পাদটীকা:

    ১) Thomas Elsaesser, “Performative Self-Contradictions: Michael Haneke’s Mind Games,” in A Companion to Michael Haneke, ed. Roy Grundmann (Chichester, West Sussex: Wiley-Blackwell, 2010), 59.

    ২) তদেব, 59.

    ৩) গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক্, “অবিনির্মাণ: অনুবাদ,” in জ্যাক দেরিদা: পাঠ ও বিবেচনা, সম্পা. পারভেজ হোসেন ও ফয়েজ আলম (ঢাকা: সংবেদ, ২০০৬), ১৪.

    ৪) চিরন্তন সরকার, শরীরের সংস্কৃতি সংস্কৃতির শরীর (কলকাতা: অবভাস, ২০১৯), ১৫.

    ৫) Jacques Derrida, Adieu to Emmanuel Levinas, trans. Pascal-Anne Brault and Michael Naas (Stanford, California: Stanford University Press, 1999), 15.

    ৬) অরিন্দম চক্রবর্তী, “‘সব পাখি ঘরে ফেরে’: ঘর ছেড়ে ঘরে ফেরার বাস্তু-দর্শন” in এ তনু ভরিয়া: দর্শন আপাদমস্তক (কলকাতা: অনুষ্টুপ, ২০২০), ১৮৫.

    ৭) তদেব, ১৮৪-৫.

    ৮) Derrida, Adieu to Emmanuel Levinas, 23.

    ৯) রণজিৎ গুহ, দয়া: রামমোহন রায় ও আমাদের আধুনিকতা (কৃষ্ণনগর: আদম, ২০২১), ৩৫-৬, ৫৩.

    ১০) Derrida, Adieu to Emmanuel Levinas, 23.

    ১১) Jacques Derrida, Of Hospitality, trans. Rachel Bowlby (Stanford, California: Stanford University Press, 2000), 5.

    ১২) J. Hillis Miller, “The Critic as Host,” in The J. Hillis Miller Reader, ed. Julian Wolfreys (Stanford, California: Stanford University Press, 2005), 22.


  • আড্ডায় ওয়েস্টার্ন: সঙ্গে অরূপরতন সমাজদার (পর্ব ৩)

    আড্ডায় ওয়েস্টার্ন: সঙ্গে অরূপরতন সমাজদার (পর্ব ৩)

    সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন এখানে

    সাক্ষাৎকারের দ্বিতীয় পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন এখানে

    সায়ন্তন: হ্যাঁ, এই প্রসঙ্গে একটা কথা মাথায় আসছে। আশি-নব্বই দশক থেকেই যে একধরণের ঐতিহাসিক ছবির বাড়বাড়ন্ত, এবং সেই সূত্রে রিয়্যালিসম …

    অরূপরতন: আমার মনে হয় রিয়্যালিসম না বলে এটাকে ন্যাচরালিসম বললে বেশি জুতসই হবে। এখানে সবসময় চেষ্টা করা হয় অত্যন্ত যত্ন সহকারে একটি ঐতিহাসিক যুগ ও তার মানুষজনকে পুনর্নিমাণ করার। স্বাভাবিকভাবেই, এদের কাছে জরুরি প্রশ্ন হচ্ছে, ওয়ায়েট আর্প-এর গোঁফ কি হেনরি ফন্ডার মতো এতটুকু ছিল নাকি ইয়া বড় ছিল? কিংবা, ওরা স্টিলের চামচে পরিজ খেত নাকি কাঠের চামচে? এবার ভেবে দ্যাখ, হেভেন’স্ গেট যতই বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ুক না-কেন, ওটা মুক্তি পাওয়ার পর থেকেই কিন্তু ওয়েস্টার্ন ঘরানার অন্যান্য ছবিতে এই উপসর্গগুলো দেখা দিচ্ছে। যদিও হেভেন’স্ গেট এই কাজটা অনেক যত্ন নিয়ে সুকৌশলে সম্পন্ন করেছিল। ছবিটা ওপর-ওপর দেখতে তো একদমই ইউরোপীয় আর্ট সিনেমার মত! বোঝাই যায়, ভিসকন্তির ইল গাতোপার্দো (১৯৬৩), আর বের্তোলুচি’র নোভেচেন্তো (১৯৭৬) গোছের ছবি দেখেই এদের মাথায় ভূত চাপে যে, এরকম চোখধাঁধানো ছবি নিজের দেশে না বানালেই চলছে না। সিনেমা তো নয়, যেন ছবির এগজিবিশন! প্রতিটা ফ্রেম একগাদা বোরিং ডিটেলে ভর্তি  –  লোকে কীভাবে হাঁটত, কীরকম কোট পড়ত, কোন কায়দায় কথা বলতো – এসব খুঁটিনাটি নিয়ে বাড়াবাড়ির একশেষ! 

    সায়ন্তন: অথচ ‘মিথ’ জিনিসটা একেবারেই অ্যাবসেন্ট!

    অরূপরতন: হ্যাঁ, পুরো বেপাত্তা! এবার এই বিষয়টাই আমি আরেকটু খতিয়ে দেখতে চাই, যে ওয়েস্টার্ন নামক জ্যঁর –  যা কিনা এককালে ছিল আমেরিকার মিথোলজির আরেক নাম – সেখান থেকে ভোলবদল হয়ে ঠিক কোন কারণে সেটা অতীতের ইতিহাস হয়ে ওঠার তোড়জোড় শুরু করল? মিথোলজির বদলে, ওয়েস্টার্ন হয়ে গেল অতীতের বিশ্বস্ত ন্যারেটিভ! তার পরেই তো হেভেন’স্ গেট-এর মত হাজার-একটা ছবি আমাদের সামনে আসতে শুরু করল।

    ডেডউড-এর পোস্টার

    এই সূত্রেই ডেডউড প্রসঙ্গে আসা যাক। ডেডউড অনেককাল আগের সিরিজ্ – যে-সময়টাকে আজকাল ‘গোল্ডেন এজ অফ এইচবিও’ বলা হয়…

    অভিষেক: ২০০৪-৬ সাল…

    অরূপরতন: …অর্থাৎ ‘কোয়ালিটি টেলিভিশন’-এর যুগ। তখন ডেডউড, সিক্স ফিট আন্ডার, দা ওআয়ার, সোপ্রানোস্, ট্রু ব্লাড –  এগুলো বেরোচ্ছে একের পর এক। ডেডউড-এর ক্রাফট নিঃসন্দেহে খুব উঁচুমানের – অভিনয় দুর্ধর্ষ, টানটান গল্প, কোনো কোনো জায়গায় শেক্সপিয়রের নাটকের কথা মনে পড়ে। সিরিজ্টা কীভাবে তৈরি হয়েছিল জানিস তো? ডেডউড-এর শো-রানার যিনি, সেই ডেভিড মিল্চ গোড়ায় ভেবেছিলেন সিরিজটা করবেন রোমান সাম্রাজ্য নিয়ে। রোমান সাম্রাজ্য তখন যাকে বলে ‘দ্য রোমান এমপায়ার’ হয়ে গিয়েছে। সাম্রাজ্যের কেন্দ্র বা ‘সিট্ অফ পাওয়ার’ হচ্ছে রোম। এবার প্রশ্ন উঠল, কেন্দ্র থেকে বহুদূরে সাম্রাজ্যের সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ অঞ্চল, যা সদ্য অন্যান্য শক্তির কবল থেকে ছিনিয়ে আনা হয়েছে –  সে-সব জায়গায় শাসনকার্য চলবে কী করে? সমাধান: রোমসম্রাটের কাছ থেকে ইজারা নিয়ে সেনাপতি ও অভিজাত কর্তাব্যাক্তিরা যাবেন ঐসব এলাকায়, তারপর যথেচ্ছ শক্তিপ্রয়োগ করে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন করবেন, এবং তার পাশাপাশি ফিউডাল কায়দায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রাজস্ব পাঠাবেন রাজকোশে। মিল্চ যে গল্পটি ফেঁদেছিলেন, তার বিষয়বস্তু ছিল –  রোম থেকে অনেক দূরে নাপোলি-সিসিলির আশেপাশে আরবদের থেকে উদ্ধার করা একটি রুক্ষ মরুস্থলীতে শাসনরত দুটি পরিবারের বিবাদের ইতিবৃত্ত। 

    ডেডউড-এর সেটে শো-রানার ডেভিড মিল্চ (ছবির বাঁ দিকে)

    ‌‌এই গল্প নিয়ে মিল্চ পিচ করতে গেলেন এইচবিও-র কর্তাদের কাছে – কিন্তু এইচবিও তা থেকে সিরিজ করতে রাজি হল না। এদিকে মিল্চ একে নাছোড়বান্দা, তায় ধুরন্ধর। চেয়ে-চিন্তে আদায় করে নিলেন দুটো দিন। ঐ দুই দিন একটা হোটেলে বসে, গল্পের চরিত্রগুলোর নাম-ধাম বদলে, তাকে রোমের পরিবর্তে এনে ফেললেন নর্থ ডাকোটার একটা জায়গায়, যার নাম ডেডউড। ওঁর মূল সিনপসিসের খসড়ায় লেখা ছিল, রোমান সাম্রাজ্যের প্রান্তে মরু অঞ্চলের মধ্যে একটি মিনারেল ডিপোসিট পাওয়া গেছে, তার ওপর কে কর্তৃত্ব করবে –  তাই নিয়েই লড়াই বাঁধে দুই অভিজাত পরিবারের মধ্যে। এই গপ্পোটাকেই, মিল্চ কায়দা করে নর্থ ডাকোটার সোনার খনি আবিষ্কার আর গোল্ড রাশের ইতিহাসের সাথে অদলবদল করে নিলেন। বুঝতেই পারছিস, শুরু থেকে ডেভিড মিল্চের মাথায় যে আইডিয়াটা খেলে বেড়াছিল, সেটা আদতে রোমান সাম্রাজ্যের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে নির্মিত একটি পিরিয়ড পিস। পটভূমি ও চরিত্রের নামধাম বদলে ভোল পালটে আপাতদৃষ্টিতে সেটা ওয়েস্টার্নে পরিণত হল বটে, কিন্তু আদতে ডেডউড দেখতে বসলে, ঐতিহাসিক ডিটেলে ভরপুর পিরিয়ড পিস-এর কথাই মনে আসে।

    ডেডউড সিরিসের দুই ঐতিহাসিক চরিত্র: ওয়াইল্ড বিল হিকক্ (কিথ ক্যারাডিন) এবং সেথ বুলক (টিমথি অলিফ্যান্ট) (বাঁ দিক থেকে ডানদিকে)

    আর যেটা বলার, সেটা হল – সিরিজ (তাকে ফর্ম বলব কিনা সে-ব্যাপারে এখনও নিশ্চিত নই – আপাতত ‘ন্যারেটিভ ফর্ম্যাট’ বলাই শ্রেয়) এই ফর্ম্যাটটা কিন্তু উপন্যাসের গল্প বলার ধরণকেই আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করেছে। সিরিজ হল – মাল্টিপল্ এপিসোড উইথ আ ক্লিয়ার ডেডলাইন – যেখানে মুখ্য হয়ে ওঠে চরিত্রের খুঁটিনাটি, স্পেসের ডিটেল, তার সঙ্গে সঙ্গে সাইকোলজিকাল পার্সপেক্টিভ এবং ডেপথ্। সিরিজের এই ছকের মধ্যে যখন ওয়েস্টার্ন এসে পড়ছে (দু-একটা দৃষ্টান্তের নিরিখে এ সম্বন্ধে এখনই কোনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক নয়, স্রেফ যে ঝোঁকটা চোখে পড়ছে, তার কথাই বলি) তখন এই ফর্ম্যাটটা যেন কোনোভাবেই ‘ওয়েস্টার্ন অ্যাস্ আ মিথোলজি’-র সাথে মানিয়ে নিতে পারছে না, বরং তাকে পিরিয়ড পিস হিসাবে কল্পনা করতেই সে বেশি স্বচ্ছন্দ। কোথাও গিয়ে মনে হয় যেন এর পিছনে একটা বড় ভূমিকা রয়েছে সিরিজের পরিকাঠামো এবং প্ল্যাটফর্মের: এই গল্পগুলো তো ভ্যাকুয়ামে তৈরি হচ্ছে না, তাদের একটা মেটিরিয়াল বেসিস আছে; সুতরাং এই প্রোডাকশন লজিস্টিক্সগুলো মাথায় না রাখলে গল্পে কী হচ্ছে না হচ্ছে – তাকে থিওরাইজ্ করাই কঠিন হয়ে পড়বে। আরেকটা হিস্টোরিকাল টেন্ডেন্সি – যেটা হেভেন’স্ গেট-পরবর্তী তাবৎ ওয়েস্টার্নের মধ্যে লক্ষণীয় – তা হল, সেখানে মিথোলজির চাইতে অনেক-অনেক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে নিখুঁত ঐতিহাসিক ডিটেলিং। অবশ্য হেভেন’স্ গেট এমন ডাহা ফ্লপ করার পরেও, ছবিটা ওয়েস্টার্ন ঘরানায় কী করে এত সুদূরপ্রসারী প্রভাব রেখে গেল – সেটাই একটা রহস্য!

    অভিষেক: ঠিক। কিন্তু এর আগেও, ধরা যাক সত্তর দশকে পেকিনপা বা আর্থার পেনের ওয়েস্টার্ন যখন দেখি, সেখানেও তো একধরণের হিস্টোরিকাল টেন্ডেন্সি, ডিটেলের প্রতি মনোযোগ…ইত্যাদি ফুটে ওঠে, তাই নয় কি?

    অরূপরতন: হ্যাঁ, কিন্তু ঐ ডিটেলিং-এর উদ্দেশ্য আলাদা। ওদের প্রোজেক্টটা ছিল – ওয়েস্টার্নের মিথকে সামনে রেখে, এই ডিটেলিং-এর সাহায্যে তার ফ্যালোসেন্ট্রিক, লোগোসেন্ট্রিক প্রকল্পের বিরুদ্ধাচরণ করা। মিথ কিন্তু সেখানে একেবারেই অনুপস্থিত নয়, বরং তাকে চাঁদমারি হিসেবে সামনে রেখে তবেই সার্থক হয়ে ওঠে ঐতিহাসিক ডিটেলিং।

    সায়ন্তন: তাছাড়া এটাও ভেবে দেখতে হবে যে, ষাট-সত্তরের দশকে গড়পড়তা হলিউডের ছবির চেহারাটাই অনেকখানি বদলে গিয়েছিল। ওয়েস্টার্নও তার ব্যতিক্রম নয়।

    অরূপরতন: হেভেন’স্ গেট-এর পর একটার পর একটা ওয়েস্টার্ন –  যেগুলোতে স্টুডিও আর আগের মত ঝুড়ি-ঝুড়ি টাকা ঢালছিল না (এমনকি ক্লিন্ট ইস্টউডের মত স্টার-পরিচালককেও অত টাকা দেওয়া হত না), সেখানেও এই হিস্টোরিকাল টেন্ডেন্সিটা চোখে পড়ার মত। যদিও আর্থিক কারণেই, হেভেন’স্ গেট-এর ব্যাপক স্কেল বা মাউন্টিং তুই টুম্বস্টোন বা সিলভারাডো-র মত ছবিতে পাবি না, কিন্তু সেই ঝোঁক র‍য়েছে পুরোমাত্রায়।

    এদিকে, এই সিরিজ্ ফরম্যাটে গল্প বলার ধরণগুলোও শেষমেশ গিয়ে একটা ছকে আটকা পড়ে যাচ্ছে। লক্ষ্য করবি, ইদানীং বিভিন্ন সাংবাদিক লেখাপত্রেও প্রশ্ন তোলা হচ্ছে যে নেটফ্লিক্সের সব ছবিই কেন দেখতে-শুনতে একইরকম? সব যেন একই ছাঁচে গড়া! এই যে গতে বাঁধা পড়ে যাওয়া – এর জন্যও সেই ইনফ্রাস্ট্রাকচারের গল্পটাই দায়ী। যেন সিরিজের ইনফ্রাস্ট্রাকচার একটা গতে-বাঁধা গল্প বলতেই বেশি অভ্যস্ত, কোনো আভাঁ গার্দ এক্সপেরিমেন্ট তার দ্বারা সম্ভব নয়। এবং, এক্ষেত্রে যা বিশেষ জরুরি, এখানে মিথোলজির ভূমিকাও অনেকখানি কমে গিয়েছে।

    তোরা যে জানতে চাইছিস – এই গোটা ইতিবৃত্তের মধ্যে ক্লিন্ট ইস্টউডের, বিশেষত, ওঁর আনফরগিভেন ছবিটার অবস্থান কোনখানে – সেই প্রশ্নের একটা সন্তোষজনক জবাব দেওয়ার চেষ্টা করে, আমি এই তর্কে ইতি টানব। আনফরগিভেন আমার সম্প্রতি দেখা নেই, কাজেই যতদূর যা স্মৃতিতে আছে তা-ই বলছি।

    আনফরগিভেন : টাইট্ল্ কার্ড

    আনফরগিভেন চারটে জিনিস করে – সেগুলো দিয়েই শুরু করা যাক। প্রথমত, একদম শুরু থেকেই সে খুব ধরে ধরে, যত্ন নিয়ে – ওয়েস্টার্ন মিথোলজির কাঠামোটাকে খাড়া করে। ওয়েস্টার্ন মিথোলজি, বুঝতেই পারছিস, আদতে ভায়োলেন্সের ওপর রংচড়ানো, রোম্যান্টিক প্রশস্তি। সাম্রাজ্যবিস্তারের হিংস্র ইতিহাসকে গুম করে, একটা ইউটোপিয়ান সিভিলাইসেশনের গল্প শোনায় এই মিথ। তার আনাচেকানাচে গোঁজা থাকে শ্বেতাঙ্গ খ্রিস্টীয় সভ্যতার মূল্যবোধ। তার পাশাপাশি চলতে থাকে নিরন্তর আদারাইজেশন, সেই জগতে ‘বর্বর’ ইন্ডিয়ান, ‘বন্য’ প্রকৃতি –  এসবই হল অপর। এটাই পরবর্তীকালে ভোল পালটে হয়ে দাঁড়ায় বন্দুক বনাম আইনের বাইনারি। আনফরগিভেন প্রথমে এই মিথোলজিকে দাঁড় করায়, তারপর সেটাকে দুরমুশ করতে করতে এগোয়। মিথের কনস্ট্রাকশন বা নির্মাণের কাজ বা অ্যাক্ট – দেখবি – নানা প্রসঙ্গে ঘুরে ফিরে আসে ছবিতে। ছবির শুরুতেই, বিগ হুইস্কি ওয়াইওমিং শহরের একটি বেশ্যাখানায়, এক মহিলার উপর চড়াও হয় জনৈক খদ্দের। এলোপাথাড়ি ছুরি চালিয়ে, সে ক্ষতবিক্ষত করে দেয় ঐ মহিলার মুখ। এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আমরা। দৃশ্যটা আরম্ভ হয় একটা আউটডোর শট দিয়ে। সেখান থেকে কাট করে ক্যামেরা চলে যায় ইনডোরে – দেখা যায় একজন অর্ধোলঙ্গ লোক ছুরি দিয়ে কোপাচ্ছে একজন মহিলাকে। মহিলার নাম ডেলায়লা (অ্যানা টমসন)। ঐ ঘটনার পরে ডেলায়লা-র চেহারার কী দশা হয়েছে –  তা আমরা দেখেছি, বা বলা ভালো, আমাদের দেখানো হয়েছে। পরে একটি দৃশ্যে ছবির প্রোটাগনিস্ট উইলিয়াম মানি (ক্লিন্ট ইস্টউড)-র সঙ্গেও দেখা গেছে তাকে। উইলিয়াম মানির কানে এই খবরটা যে পৌঁছে দেয়, সেই ছোকরা বাউন্টি-হান্টার কায়দা করে নিজের নাম রেখেছে – স্কোফিল্ড কিড (জেইমজ্ উলভেট)। তা, স্কোফিল্ড কিড এসে কী ভাষায় বর্ণনা করছে গোটা ঘটনাটা? সে বলছে: দুটো লোক মিলে বেশ্যাখানায় এক মহিলার ওপর নৃশংসভাবে চড়াও হয়েছে –  খুবলে নিয়েছে তার চোখ, ছুরির কোপে কেটে নিয়েছে দুই কান, ‘ইভেন কাট হার টিটস’, ইত্যাদি ইত্যাদি। এরপর মানি যাবে তার দোস্ত নেড লোগান (মর্গান ফ্রিম্যান)-এর কাছে, তারপর এই গল্পটারই (সামান্য রং চড়িয়ে) পুনরাবৃত্তি করবে সে (নিচের ছবি)। 

    দ্বিতীয়ত, স্কোফিল্ড কিড কী বলে নিজের পরিচয় দেয়? সে বলে –  ‘মানুষ খুন করতে ওস্তাদ আমি, আমার মত বাউন্টি হান্টার আর দুটো নেই!’ 

    তৃতীয়ত, ছবিতে আরেকটি ইন্টারেস্টিং চরিত্র রয়েছে (যাকে বাদ দিলে মূল গল্পের কোনো ইতরবিশেষ হয় না, তা সত্ত্বেও ছবিতে তাকে রাখা হয়েছে একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে), সে হল কেতাদুরস্ত বন্দুকবাজ ইংলিশ বব (রিচার্ড হ্যারিস)। লোকটা সুযোগ পেলেই নিজের ঢাক পেটায়, বন্দুকের কেরামতি দেখিয়ে হাঁ করে দেয় লোকের মুখ, তার ওপর কথা বলে ব্রিটিশ অ্যাক্সেন্টে। ববের সঙ্গে সবসময় এঁটুলির মত সেঁটে থাকে একজন বায়োগ্রাফার (সল রুবিনেক), সে ববের মুখে অতীতের বিভিন্ন বাহাদুরির রোমহর্ষক বৃত্তান্ত শুনে সেসব আগাগোড়া নোট করে রাখে নিজের খাতায়। এই বায়োগ্রাফারের দৌলতে ববের নাম হয়েছে – ‘ডিউক অফ ডেথ’।

    ইংলিশ বব, সঙ্গে তার জীবনীকার

    চতুর্থত, উইলিয়ামানি (ক্লিন্ট ইস্টউড)-কে আমরা যেভাবে দেখি, তার চরিত্র সম্বন্ধে ছবিতে যেভাবে ওয়াকিবহাল করা হয় আমাদের, সেটাও উল্লেখযোগ্য। একদম শুরুতে ছবির পর্দায় স্ক্রলের মত করে কিছু লেখা আসে, যেখানে বলা হয় – এককালে উইলিয়াম মানি ছিল এক নৃশংস ডাকাত, কত মানুষকে সে খুন করেছে তার কোনো হিসেব নেই – ইত্যাদি ইত্যাদি। এরপর যখন আমরা মানি-কে চাক্ষুষ করি, তখন সে কাজ করছে শুয়োরের খোঁয়াড়ে। মুখের অজস্র রেখার আঁকিবুকি তার বয়সের ইঙ্গিত দিচ্ছে। অশক্ত শরীরে দামাল শুয়োরগুলোকে সামলাতে না পেরে, মুখ থুবড়ে পড়েছে কাদার ওপরে।

    অর্থাৎ ছবিতে আমরা একগাদা জিনিস শুনি আর দেখি – কিছু জিনিস আমরা প্রত্যক্ষ করছি, কিছু কানে শুনছি, সেগুলো আমাদের কাছে আসছে তথ্য হিসেবে। এরপর একে একে প্রতিটা ইনফর্মেশন ছবিতে প্রশ্নের মুখে পড়বে। 

    ডেলায়লা আক্রান্ত হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহই নেই, ছুরির নির্মম আঘাতে বিকৃত হয়ে গেছে তার মুখ – কিন্তু এও সত্যি যে তার বর্ণনা দিতে গিয়ে, জেনে বা না-জেনে বাড়তি রং চড়ানো হয়েছে। বাস্তবে তার কানও কাটা যায়নি, চোখও খুবলে নেওয়া হয়নি (নিচের ছবি)।

    ডেলায়লার ক্ষতবিক্ষত মুখ

    দ্বিতীয়ত, মানুষ খুন করা তো দূরস্থান, স্কোফিল্ড কিড চোখে দেখতেই পায় না ভালো করে! ছবির শুরুতে সে নিজের সম্বন্ধে যা যা বলেছে, তা সেন্ট-পার্সেন্ট গাঁজাখুরি।

    তৃতীয়ত, ইংলিশ ববের কী হল, তা তো আমরা সকলেই জানি। চূড়ান্ত অপদস্থ হতে হল টাউন শেরিফ লিটল বিলের (জিন হ্যাকম্যান) হাতে। উত্তম-মধ্যম দিয়ে, তাকে শহর থেকে খেদিয়ে দিল বিল। বিলের কথা শুনে এও স্পষ্ট যে, এতদিন বব নিজের যেসব গুণপনা জাহির করে এসেছে, সেগুলো সর্বৈব মিথ্যে।

    মোদ্দা কথা, এই যে নানাবিধ আদর্শের জয়গান গেয়ে ওয়েস্টের মিথ তৈরি হয়েছিল – যেমন শৌর্য, বীর্য, চাতুর্য, ক্ষিপ্রতা – এগুলো সব একে একে ভুয়ো সাব্যস্ত হয় ক্লিন্ট ইস্টউডের ছবিতে। ওয়েস্টার্ন মিথোলজি সবসময় দেখাতে চায় যে ইংলিশ বব বা লিটল বিলের মত দুঃসাহসী লোকগুলোই হল মার্কিন সভ্যতার প্রকৃত স্রষ্টা বা ফাউন্ডিং ফাদার্স –  ‘দিজ্ আর দা হ্যান্ডস‌্ দ্যাট বিল্ট আমেরিকা’। সেই মিথোলজির খোসা ছাড়িয়ে আনফরগিভেন দেখিয়ে দেয় – আসলে এদের গল্পগুলো আগাগোড়াই ধোঁকার টাটি। 

    অবশ্য একটা গল্প সত্যি, সেটা হল – উইলিয়াম মানি ওয়াজ্ আ কোল্ড-ব্লাডেড ভায়োলেন্ট কিলার। ছবির শেষে যখন নেড লোগানকে জেলখানায় পিটিয়ে খুন করা হয় (মৃত্যুর মুহূর্তটা আমরা স্বচক্ষে দেখি না, তার খবর পাই), তখন বৃদ্ধ উইলিয়াম মানির মনের অতলে বহুকাল যাবৎ দমিয়ে রাখা ঐ ভয়ানক হিংস্র প্রবৃত্তি মাথাচাড়া দেয় নতুন করে। বন্ধুর মৃত্যুর শোধ তুলতে এক বৃষ্টিবাদলার রাতে শহরে ফিরে আসে উইলিয়াম মানি। তারপর ন্যায়-অন্যায়ের তোয়াক্কা না করে নির্বিচারে মানুষ খুন করে। এই দৃশ্যের মিজঁসেন যেন সটান বাইবেল থেকে তুলে আনা হয়েছে: বৃষ্টি পড়ছে অঝোরধারে – তার সঙ্গে থেকে-থেকে বিদ্যুতের ঝলকানি আর মুহুর্মুহু বাজ পড়ার শব্দ। ধিকিধিকি জ্বলা লন্ঠনের আলোয় ফ্রেমের খুব সামান্যই দেখা যাচ্ছে। তার মধ্যে গর্জে উঠছে উইলিয়াম মানির বন্দুক (নিচের ছবি)। 

    অতএব, হয় ওয়েস্টার্নের মিথোলজির আগাগোড়া নির্ভেজাল ঢপ – অথবা, যদি সত্যিই বাস্তবে হয়ে থাকে, তবে তাকে মোটেই ভালো বলা চলে না। সে-মিথোলজি এক অন্তহীন হিংসার ইতিবৃত্ত – সেখানে জাস্টিসের কোনো জায়গাই নেই। আনফরগিভেন এই মিথোলজির ব্যাপারে খুব-খুব সচেতন, না হলে এ-ধরণের ন্যারেটিভ তৈরি করা সম্ভব হত না। 

    এখানে ঐ বায়োগ্রাফারের কথাও ভাব – নিতান্ত হাস্যকর গোবেচারা গোছের লোক – ইংলিশ ববের মুখে ঝুড়ি ঝুড়ি মিথ্যে কথা শোনে আর সেগুলো নিয়ে স্বপনকুমার-মার্কা রোমাঞ্চ-উপন্যাস লেখে। অথচ এর হাতেই ওয়েস্টের মিথ পাকাপাকি চেহারা নেয়। এদিকে ইংলিশ ববকে বেদম ঠ্যাঙানি দিয়ে জেলে বন্দি করার পর, যখন বায়োগ্রাফারের প্রয়োজন ফুরোবে-ফুরোবে করছে, তখন টাউন শেরিফ লিটল বিল এসে তাকে আদেশ করে: ‘এখন থেকে আমাকে নিয়ে গল্প লিখবে তুমি।’ মিথ-নির্মাণ যে আসলে ভাঁওতাবাজি, তার প্রমাণ হাতেনাতে পেয়েও, লিটল বিল নিজের মাহাত্ম্য প্রচারের লোভ এড়াতে পারছে না।

    টাউন শেরিফ লিটল বিলের চরিত্রটা এখানে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। ছবিটা দেখতে-দেখতে একটাই খটকা লাগে, ঠিক কোন অপরাধে বিল-কে ছবির ভিলেন হতে হল? ওয়েস্টার্ন ছবির খলনায়করা সচরাচর যেসব অপকর্ম করে থাকে – যেমন হুটপাট নিরপরাধ মানুষকে কোতল করা, তাদের বাড়িঘর-ক্ষেতখামার পুড়িয়ে দেওয়া, মহিলাদের ওপর চড়াও হওয়া – বিল কি সেরকম কোনো ঘৃণ্য নৃশংস কাজ আদৌ করেছে? তা তো নয়! তবে? 

    ওয়েস্টার্নের এই ধূসর জগতে, লিটল বিলের দোষ একটাই – সে বিশ্বাস করেছিল মডার্ন জাস্টিসে। প্রথমত, যে লোকটা ছবির শুরুতে ডেলায়লার ওপর চড়াও হয় – তাকে লিঞ্চ না করে, চাবুক না মেরে, বিল বলেছিল ক্ষতিপূরণ দিতে। এটা হল মডার্ন ল বা আধুনিক সাংবিধানিক আইনের নিদান—এখানে চোখের বদলে চোখ-এর সেকেলে প্রতিহিংসার নিয়ম খাটে না। দ্বিতীয়ত, ও নোটিশ টাঙিয়ে নির্দেশ দিয়েছিল – এই শহরে বন্দুক নিয়ে প্রবেশ নিষেধ। নেড লোগান এই নির্দেশ অমান্য করে বন্দুক নিয়ে ঢুকেছিল, তাই পত্রপাঠ তাকে বন্দি করা হয়। জেরার সময় পুলিশের থার্ড ডিগ্রি সইতে না পেরে নেড বেঘোরে মারা পড়ে। ওয়েস্টার্নের জগৎ যে অতীত ও ভবিষ্যত-সম্ভাবনার মাঝখানে দোদুল্যমান, সেখানে টাউন শেরিফ লিটল বিল হল সময়ের এদিককার মানুষ – আসন্ন আধুনিক, শিল্পসভ্যতার প্রতিনিধি। নতুন যুগের আইনের রক্ষক হিসেবে তার যা করণীয়, সে তাই করেছে। সেজন্য ছবির শেষ দৃশ্যে – নিশ্চিত মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে – মেঝেয় চিৎ হয়ে পড়ে থাকা অসহায় লিটল বিল সেই বিখ্যাত উক্তিটি করে – ‘আই ডোন্ট্ ডিসার্ভ দিস্!’ এই ‘ডিসার্ভ’ হল আধুনিক যুগের কনসার্ন – আধুনিক আইনকানুনেই ডিসার্ভ নিয়ে মাথা ঘামানো হয়। তার জবাবে বিলের নেমেসিস – সাবেকযুগের গানফাইটার উইলিয়াম মানি ঠান্ডা গলায় বলে: ‘ডিসার্ভ’স্ গট নাথিং টু ডু উইথ ইট।’ তারপর ট্রিগারে চাপ দেয় (নিচের ছবি)।

    এছাড়া আমাদের চোখে বিলের ভিলেন হয়ে ওঠার আরেকটা কারণ আছে। স্রেফ একটা শটের জন্য দর্শকের মনে আর কোনো সন্দেহই থাকে না, যে লিটল বিলই হচ্ছে ছবির খলনায়ক। ছবিতে নেড লোগান গ্রেপ্তার হওয়ার পর এক জায়গায় একটা টাইট টু-শট আছে। ফোরগ্রাউন্ডে জেলখানার গরাদ আঁকড়ে দাঁড়িয়ে আছে কৃষ্ণাঙ্গ নেড লোগান, তার গা অনাবৃত – পিছনে মিডগ্রাউন্ডে সামান্য শ্যালো ফোকাসে চাবুক হাতে এগিয়ে আসছে লিটল বিল। দৃশ্যটা দেখা মাত্র যে ইতিহাস ছবি হয়ে আমাদের মনে ভেসে ওঠে, তা হল ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের দাসত্বের ইতিহাস। আমেরিকার যে-কোনো গড়পড়তা ইতিহাস-জানা লোক এই একটা শট দেখেই ধরে ফেলবে কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাস-শ্বেতাঙ্গ প্রভুর ঐতিহাসিক আইকনোগ্রাফি। অর্থাৎ লিটল বিলকে রীতিমত স্টেজ করা হচ্ছে ঘৃণ্য ভিলেন হিসেবে! এই আইকনিক স্টেজিং এবং পুলিশ ব্রুটালিটি-র অপরাধ বাদ দিলে কিন্তু তাকে দোষ দেওয়ার মত তেমন গুরুতর কোনো কারণ থাকে না। নেড লোগানকে থার্ড ডিগ্রি না দিয়ে যদি আদালতে তার পাবলিক হিয়ারিং করা হত, তাতেও বিলের কোনো আপত্তি থাকত বলে মনে হয় না, কারণ হি ইজ্ এ মডার্ন ম্যান!

    জেরার দৃশ্যে নেড লোগান ও লিটল বিল

    আনফরগিভেন, সে-অর্থে, ঐ মিথোলজি নিয়ে শেষবারের মত কাজ করে তার খাপ-বন্ধ করে ছেড়ে দেয়। তারপর এক তারান্তিনোর তৈরি কিছু মেটা-ওয়েস্টার্ন বাদ দিলে এই ঘরানায় তেমন কোনো ইন্টারেস্টিং কাজ আমার অন্তত চোখে পড়েনি।

    সায়ন্তন: বেশ! আমাদের শেষ প্রশ্ন –  ইদানীং কিছু ব্যতিক্রমী ছবি, যেমন মিক’স্ কাটঅফ্ (কেলি রাইকহার্ড, ২০১০), হাউহা (লিসান্দ্রো আলনসো, ২০১৪)- প্রভৃতিতে একটি বিশেষ এসথেটিক-এর প্রভাব স্পষ্ট চোখে পড়ছে, যাকে সচরাচর স্লো সিনেমা বলা হয় (পোস্টার নিচে)। এ-ধরণের এসথেটিক আমরা ইদানীংকালের আর্টহাউস সিনেমায় প্রায়ই দেখতে পাই। মিক’স কাটঅফ বা হাউহা জাতীয় ছবিতে যেন এই নতুন ঘরানার আর্ট সিনেমার সাথে অনবরত সংলাপ চলে ওয়েস্টার্ন জ্যঁরের। অথচ এখানে মোটেই ওয়েস্টার্ন-সুলভ রোমাঞ্চকর গানফাইটিং নেই, আছে শুধু ওয়েস্টের ধু-ধু ল্যান্ডস্কেপ এবং কিছু মানুষ। এগুলোকে আদৌ ওয়েস্টার্ন বলা চলে কি?

    অরূপরতন: দ্যাখ্, ওয়েস্টার্ন কী, তার একটাই সন্তোষজনক উত্তর আছে আমার কাছে –  কোনো ছবিকে আমি কেবল একটি শর্তেই ওয়েস্টার্ন বলব, যদি সে ওয়েস্টার্ন মিথোলজির সঙ্গে এনগেজ করে – তা সে যেভাবেই করুক না কেন। অর্থাৎ, ওয়েস্টের গল্পের আধারে পৌরুষ এবং জাতীয়তাবাদের মিথ-নির্মাণ সম্বন্ধে যেন সে ওয়াকিবহাল থাকে। এই মিথোলজির কিছু মৌলিক উপাদান রয়েছে –  যেমন ল্যান্ডস্কেপ, ঘোড়া, বন্দুক, টুপি, কাউবয়, ওয়েস্টার্নার ইত্যাদি। এ-সব উপাদান বাদ দিয়ে আদৌ ঐ মিথোলজিকে খাড়া করা যায় কি? আবার, ওয়েস্টে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনার ছবি মানেই তাকে ওয়েস্টার্ন বলব – এমনও নয়। মিথোলজির সাথে এনগেজ করতে না পারলে, তাকে বড়জোর একটা পিরিয়ড পিস বলা চলে, ওয়েস্টার্ন নয়। আর হেভেন’স্ গেট প্রসঙ্গে আমরা আগেই দেখেছি যে, একধরণের গ্লোবাল সিনেম্যাটিক প্র্যাক্টিসের সাথে ওয়েস্টার্নের সংলাপ বহুকাল আগেও ছিল, যেজন্য হেভেন’স্ গেট-এ ইউরোপীয় আর্ট সিনেমার প্রভাব এত চোখে-পড়ার মত। তাই ডিজিটাল টার্ন-পরবর্তী আজকের যুগে যদি মার্কিন জ্যঁর-ফিল্মের সাথে স্লো-সিনেমা এসথেটিকের গাঁটছড়া বেঁধে যায় – তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। এর পিছনে নিঃসন্দেহে পুঁজির একটা বড় ভূমিকা আছে। বিভিন্ন গোত্রের ছবির সার্কুলেশন-ডিস্ট্রিবিউশনের নেটওয়র্ক যদি কোনো বিশেষ বিন্দুতে এসে পরস্পরের সঙ্গে মিলে যায় –  তবেই এই আদানপ্রদান এত সাবলীল, এত নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে ওঠে।

    সমাপ্ত

    সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন এখানে

    সাক্ষাৎকারের দ্বিতীয় পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন এখানে

  • মৃণাল সেন-রাইনহার্ড হফ কথোপকথন, ১৯৮৩

    মৃণাল সেন-রাইনহার্ড হফ কথোপকথন, ১৯৮৩

    ১৯৮৪ সালে সাবেক পশ্চিম জার্মানির মিউনিখে মুক্তি পেয়েছিল টেন ডে’জ্ ইন ক্যালকাটা : আ পোর্ট্রেট অফ মৃণাল সেন (ইংরেজি নাম) তথ্যচিত্রটি। পরিচালনা করেছিলেন রাইনহার্ড হফ— জার্মানির নতুন প্রজন্মের দুঃসাহসী চলচ্চিত্রকারদের অন্যতম। ছবির সিংহভাগ জুড়ে ছিল মৃণাল সেনের সাথে হফের কথোপকথন। কথাবার্তার বিষয় হিসাবে অবশ্যই যে-প্রসঙ্গ বারবার ঘুরে-ফিরে এসেছে, তা হল মৃণাল সেনের সিনেমা ও তার আঙ্গিকের বিশেষত্ব। সত্তরের দশকের শেষপাদে পৌঁছে তাঁর চলচ্চিত্রে দেখা দিতে শুরু করে কিছু নতুন লক্ষণ। ভুবন সোম, কলকাতা একাত্তর, পদাতিক, কোরাস ইত্যাদি ছবির আঙ্গিকের চমকপ্রদ ‘স্বতঃস্ফূর্ততা’ থেকে অনেক দূরে সরে গিয়ে, ক্রমশ মন্থর হয়ে আসে ছবির গতি– ক্যামেরার দৃষ্টি চোরাগোপ্তা ঢুকে পড়তে থাকে দৈনন্দিনের গলি-ঘুঁজি বেয়ে। এইসব পরীক্ষানিরীক্ষার খুঁটিনাটি নিয়ে মৃণাল সেন স্বয়ং কতখানি সচেতন ছিলেন, তারই পরিচয় মেলে এই সাক্ষাৎকারে। 

    রাইনহার্ড হফের ছবিটি অবশ্য অধুনা দুষ্প্রাপ্য। ছবির চিত্রনাট্য বই হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল সিগাল বুকস থেকে, ১৯৮৭ সালে। পরবর্তীকালে, ঐ সিগাল বুকস থেকেই মৃণাল সেনের লেখালিখি ও সাক্ষাৎকারের একটি সংকলন ছেপে বের হয়–যার নামমন্তাজ (২০০২)। এই কথোপকথনের অংশবিশেষ অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল সে-বইয়ে, তারই একটি তর্জমা এবার প্রকাশিত হল কাউন্টার শট-এ। এই অনুবাদের অনুমতি দেওয়ার জন্য, এবং আমাদের পাশে থাকার জন্য, আমরা আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই শ্রদ্ধেয় শ্রী কুণাল সেন-কে।


    রাইনহার্ড হফ: এটা কি আপনার কখনো মনে হয়েছে, যে কোনো এক সময়ে (জঁ-লুক) গোদার বা (আলেক্সান্ডার) ক্লুগের মত একধরণের ‘মুক্ত আঙ্গিক’ নিয়ে আপনার কাজ করার ইচ্ছা জাগবে?

    মৃণাল সেন:  আমি ঠিক নিশ্চিত নই। করতেও পারি। (সেজারে) জাভাত্তিনির একবার ইচ্ছে হয়েছিল অমন করার। উনি খুব একটা সফল হননি। তবে আপনি ছবির মাধ্যমে কী বলতে চান, ছবিতে আপনার লক্ষ্যটাই বা কী – সে ব্যাপারে একটা মোটামুটি ধারণা থাকা ভালো। তারপর আপনি যখন শুট করতে যাবেন, তখন চোখ-কান খোলা রাখলে– দেখবেন চারপাশের কতকিছু আপনার কানে আসবে, চোখে পড়বে– তখন সেগুলোকে ঠিক ঠিকভাবে মিশিয়ে দেবেন আপনি কাজের মধ্যে। যদি কিছু পছন্দ না হয়, সেটাকে বাদ দিতেই পারেন, তবে তাতে খরচ বেজায় বেড়ে যেতে পারে, এ আমি জানি।

    রা: কিন্তু আপনার শেষ দুটো ছবির গড়ন এতই নিটোল, দেখে তো মনে হয়, চিত্রনাট্য যেন আগে থেকে তৈরিই ছিল। এটা কীভাবে সম্ভব হল, কারণ আপনি যেভাবে ছবি শুট করার কথা বলছেন…

    মৃ: এর জন্য বোধহয় আমার অভিজ্ঞতাই দায়ী। আমি তো বেশ অনেকদিন হয়ে গেল এই লাইনে আছি। এখানে যে সবসময় সবকিছু আগে থেকে প্রস্তুত থাকে- এমন নয়। এমন অনেক কিছুই আছে, যা আমি যখন চিত্রনাট্য লিখি তখন মাথায় থাকে না। আপনাকে বেশ কতকগুলো উদাহরণ দিতে পারি, কীভাবে শুটিং স্পটে দাঁড়িয়ে আমি একটা বিশেষ দৃশ্যের পরিকল্পনা করেছি, যেটা পরে গিয়ে ছবির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যগুলোর একটা হয়ে দাঁড়িয়েছে – সেরকম অনেক ঘটনা শোনাতে পারি। এটা আমার শেষ দুটো ছবিতেও হয়েছে। বোলপুরের কাছে একটা জায়গা আছে, আপনাকে দেখাব, সেখানে আমরা খন্ডহর শুট করেছিলাম। ছবির একটা দৃশ্য, সেটা মোটেই স্ক্রিপ্টে ছিল না, কিন্তু আমার মাথায় খুঁটিনাটি সমেত তার একটা আদল তৈরি-ই ছিল। দুটো শটের মধ্যিখানে অনেক সময় কিছু জিনিস আমার চোখে পড়ত যা হয়তো-বা আমায় ভীষণ অভিভূত করল, কোনো আইডিয়া উঁকি দিল মনের কানাচে, তৎক্ষণাৎ মনে হল – আমি তো এগুলো রাখতে পারি ছবিতে…!

    রা: যখন আপনি এরকম বদলে ফেলার প্রস্তাব করেন, কিংবা হয়তো একটা গোটা দিনের কাজ বদলে দেন, তখন আপনার প্রোডাকশন ম্যানেজার কী বলেন? 

    মৃ: যখন ওঁকে গিয়ে বলি যে আমি এরকম এরকম করতে চলেছি, আর তার জন্য এই এই জিনিস আমার লাগবে, ভদ্রলোক ঠায় চেয়ে থাকেন আমার দিকে, কিছুক্ষণ তাঁর মুখ দিয়ে কোনো কথা সরে না। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারি উনি ভিতরে ভিতরে তিতিবিরক্ত হয়ে উঠছেন, কিন্তু অবশেয়ে সায় দিয়ে বলেন, ‘ওকে’। যেহেতু ভদ্রলোক আমায় চেনেন– জানেন আমি প্রায়ই এরকম করে থাকি– তাই উনি সবকিছুর জন্যই প্রস্তুত থাকেন।

    রা: কিন্তু এভাবে কাজ করতে গিয়ে ছবির খরচ আরো বেড়ে যায় না? 

    মৃ: না, বেড়ে যায় না, কারণ আমি অভিজ্ঞতার ওপর ভরসা করে কাজ করি। আমি আগে দেখেছি, আমি এরকম চান্স নিতে থাকলে সেগুলো শেষমেশ ভালোভাবেই উৎরে যায়।

    রা: মৃণাল, আপনার ছবিতে যে ধরণের বাস্তববাদ আমরা দেখি, সে’ সম্বন্ধে আপনার কী মত?

    মৃ: বাস্তববাদ বলতে আমি কী বুঝি, সেটা অল্পকথায় বোঝানো বেশ মুশকিল। আমি এটুকুই বলতে পারি যে, যে বস্তুজগৎ আমরা প্রত্যক্ষ করি, তাকে চলচ্চিত্রের সাহায্যে উদ্ধার করা যায় না। বড়জোর যেটা করা যেতে পারে, তা হল বাস্তব সম্বন্ধে আপনার বোঝাপড়াটুকু তুলে ধরা। একটি বিশেষ বস্তুর সামনে লেন্স বসিয়ে– তার আকৃতি ও ঘনত্বের প্রতিরূপায়ণ করে– আপনি আসলে যা সৃষ্টি করছেন, তা বাস্তবের একটি প্রতিচ্ছায়া মাত্র। এই একই জিনিস আমিও চেষ্টা করে থাকি। আমি বাস্তব সম্বন্ধে শুধু নিজের ধারণাটুকুই তুলে ধরতে পারি, যা আপনার ধারণার সাথে হয়তো একেবারেই মিলবে না। আমরা যে বাস্তবকে প্রত্যক্ষ করছি তা হয়তো একই, কিন্তু যেই আমি সেটাকে পর্দায় তুলে ধরলাম, অমনি সেটা অন্য যেকোনো মানুষের বাস্তবের ধারণা থেকে আলাদা হয়ে গেল। এখানেই নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটা আসে। এখানে বস্তুজগৎ-কে আমি নিয়ন্ত্রণ করছি নিজের মনের গতিপ্রকৃতি অনুযায়ী।

    রা: আচ্ছা, আপনার ছবিতে যে বাস্তবতা ফুটে ওঠে, তাকে কি আপনি সাধারণ বাস্তবের সাপেক্ষে বিচার করেন? নাকি তার বড় একটা প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন না– (রাইনার ভের্নার) ফাসবিন্ডার যেমন বলেন, ‘আমার ছবিগুলোই বাস্তব। আমি আর দ্বিতীয় কোনো বাস্তব নিয়ে মাথা ঘামাই না।’

    মৃ: আমি কথাটা একটু অন্যভাবে বলি। আমি যা করি তা অনেকটা এরকম – আমি যখন আমার চারপাশের বাস্তবের সান্নিধ্যে আসি, তখন আমি চেষ্টা করি গোটা জিনিসটাকে আত্মস্থ করার, ব্যক্তিগত করে তোলার। তারপর শেষমেশ আমি যে বাস্তবটাকে তুলে ধরি, সেটা আমার নিজেরই বাস্তব, আমিই তার স্রষ্টা। যে বাস্তবকে আপনি নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টিতে দেখছেন, এ কিন্তু সেই বাস্তব নয়। এ এমন একধরণের বাস্তব, যাকে আমি স্বয়ং তুলে ধরছি, যার যুক্তিকাঠামো তার নিজস্ব।

    রা: বাঙালি হিসেবে আপনার যে সাংস্কৃতিক পরিচয়, সে ব্যাপারে একটা প্রশ্ন…

    মৃ: আমার জন্ম বাঙালি পরিবারে, বিয়ে করেছি একজন বাঙালি মেয়েকে, আমার ছেলেও ঘটনাচক্রে বাঙালি, এবং আমাদের বাস বাঙালি-অধ্যুষিত পরিবেশে। কিন্তু এটাও আমি ভুলতে পারি না যে আমরা বাস করছি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে, যেখানে দেশকাল আগের চাইতে অনেকটাই ছোট হয়ে এসেছে। আর তার ফলে আজকের দিনে এমন কিছুই নেই যাকে বিশুদ্ধ বাঙালি, বিশুদ্ধ ভারতীয়, বিশুদ্ধ জার্মান, বিশুদ্ধ ব্রিটিশ, বা বিশুদ্ধ ফরাসি বলা চলে। আমরা একটা দো-আঁশলা সংস্কৃতি নিয়ে জীবন অতিবাহিত করছি– এ ব্যাপারটা আমার চমৎকার লাগে। আমার মনে হয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যে-গতিতে অগ্রসর হচ্ছে, তাতে নিজের সংস্কৃতির বিশুদ্ধ খাঁটি শেকড়বাকড় খুঁজে বের করার চেষ্টাটা দিনে-দিনে একটি বাজে পণ্ডশ্রম বলে সাব্যস্ত হবে।

    রা: কিন্তু এই একই সময় আমরা ইউরোপে, বিশেষ করে যারা নতুন প্রজন্মের পরিচালক, তারা জগৎ জুড়ে মার্কিন সংস্কৃতি বা বকলমে কোকাকোলা সংস্কৃতির দখলদারি থেকে নিজেদের সংস্কৃতিকে মুক্ত করার দাবি জানিয়ে যাচ্ছি।

    মৃ: লোকে সংস্কৃতির ওপর মার্কিন প্রভাবের কথা বলে বটে, কিন্তু আমি সেটা ঠিক বুঝে উঠতে পারি না। প্রযুক্তি তো কোনো একটা বিশেষ সংস্কৃতির বা কোনো বিশেষ সরকারের একচেটিয়া নয়…

    রা: আমি কিন্তু প্রযুক্তির কথা বলছি না। আমি বলছি একটা ভোগবাদী সংস্কৃতি অন্য সংস্কৃতির ওপর যে প্রভাব ফেলতে পারে, তার কথা।

    মৃ: সেটা আমি মানুষের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ওপরেই ছেড়ে দিতে চাই। আমার যদি মার্কিন কালচারের প্রতি টান থাকে, তাহলে তার দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার হক্ আমার আছে পুরোমাত্রায়। কিন্তু আমি এটাও বলব, আমার পছন্দ অপছন্দকে নিয়ন্ত্রণ করছে আমার চারপাশের বাস্তব। 

    রা: বেশ।

    মৃ:  আমার ছবিগুলোর ওপর যে সংকটের ছায়া রয়েছে, তাই নিয়ে কথা হচ্ছিল। আমার প্রথম দিকের ছবিগুলো যদি দেখেন, দেখবেন আমার ভাবনার কেন্দ্রে ছিল বস্তুজগৎ এবং বস্তুগত অস্তিত্বের সংকট। এই বস্তুজগৎ আমার প্রথম ছবিগুলো-র ছন্দ, তার বৈপরীত্য, কঠোরতা, এমনকি রসবোধের ওপরও মাতব্বরি করেছে। আমার ছবির চরিত্ররা যেসব স্ববিরোধ দিয়ে গড়া, যা তাদের কুরে কুরে খায়– তাকেও রেখেছে কব্জা করে। একটা সময় ছিল, যখন আমি বিস্তর চেঁচামিচি করতাম, সব নতুন করে গড়ার কথা, একটা আশ্চর্য নতুন দিনের কথা– যেন সেটা গলির মোড়েই অপেক্ষা করছে– বলতাম সে-সব। নেহাতই সহজসরল এ-সব কথা, কিন্তু মনে মনে তা নিয়ে ছিল স্বতন্ত্র এক আবেগ, ভীষণ সাচ্চা আবেগ। আর এ-সব কিছুই ছিল আমার সময়ের অবদান, সেই সময়ের দাপুটে সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে নিংড়ে নেওয়া। এ-সব কথা তখন হাওয়ায় ভাসত। সেই অবস্থান থেকে আজ অনেক দূরে চলে এসেছি আমি, কিন্তু তাতে ক্লান্তি নেই এতটুকুও। এই বয়সে এসেও আমার নিজেকে মনে হয় যেন এক তরতাজা যুবক, তার শিরায় শিরায় বইছে গরম রক্ত! এই শহর কলকাতার মত আমি, জীবন্ত, প্রাণপ্রাচূর্যে পরিপূর্ণ! আমি এখনও আমার সময়ের প্রতি অনুগত, আরো নিখুঁত হওয়ার চেষ্টায় চালিয়ে যাচ্ছি যাবতীয় আত্মসমীক্ষা– আত্মসমালোচনা– আত্মানুসন্ধান, মাথার চুল ধরে টেনে খাড়া করছি নিজেকে (পিটার ওয়াইস যেমন বলেছেন)– তারপর সটান দাঁড় করাচ্ছি আয়নার সামনে। আপনি কি বলবেন একে? নার্সিসিজম? ম্যাসোকিজম বলবেন? কভি নেহি! এ-ধরণের জিনিসে আমি প্রশ্রয় দিই– এমন অভিযোগ করতেই পারেন না আপনি। আমি শুধু ছানভিন করি নিজের ভিতরটা– তারপর ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলি, তাকে উলটে নিয়ে আসি বাইরে, তুলে ধরি সবার চোখের সামনে। আমি চাই নিজেকে জানতে, নিজেকে বুঝতে, এই সমাজটাকে বুঝতে – যার সাথে আমি জড়িয়ে আছি আষ্টেপৃষ্টে। এই প্রক্রিয়াটাই চলছে এখন। সেই ১৯৭৯ তে একদিন প্রতিদিন-এর সময় থেকে, এই শেষ কয়েক বছর যাবৎ, আমি মানুষের ভিতরের জগৎটা নিয়ে চিন্তা করছি, তার রহস্যময়তা, হতাশা, দ্বিধাদীর্ণ জটিলতা, এবং অবশ্যই তার ভিতরের জ্বলন্ত শক্তির উৎসটিকে আবিষ্কার করাই আমার লক্ষ্য। এই ভাবনা নিয়েই আমি আমার চরিত্রদের এবং আমার আপন সত্তার সংকটের ওপর জোর দিচ্ছি…আমার একদিন প্রতিদিন দেখুন, সাতজন সদস্যের একটি পরিবার, যাদের মধ্যে মোটামুটি সদ্ভাব রয়েছে। অথচ ছবি যত এগিয়েছে, তারা যেই না সরাসরি বাস্তবের সম্মুখীন হয়েছে, অমনি তাদের ঝগড়া-বিবাদ চড়েছে সপ্তমে, যেন একে অপরকে ছিঁড়ে কুটিকুটি না-করা অবধি তারা থামবে না! কিংবা আকালের সন্ধানে-র কথাই ধরুন। অতীতের একটি বীভৎস বাস্তব ঘটনা তেতাল্লিশের মন্বন্তরের ওপর ছবি করতে গিয়ে ফিল্ম কোম্পানির লোকজন মুখোমুখি হল বর্তমানের নগ্ন নির্মম বাস্তবের সঙ্গে, যা থেকে তারা পালানোর চেষ্টা করেছে এতদিন। অথবাখারিজ-এর কথাই ভাবুন না, সেখানে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই বাস্তব থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে চায়, কিন্তু জীবন বড় শক্ত ঠাঁই, তার থেকে পালিয়ে বাঁচা কঠিন। আমি এই অমোঘ নিয়মের কথাই বলার চেষ্টা করি।

    “যেন একে অপরকে ছিঁড়ে কুটিকুটি না-করা অবধি তারা থামবে না”: একদিন প্রতিদিন

    এখন আমায় যেটা টানে সেটা স্রেফ বস্তুজগৎ নয়, যা আমার কাছে জড়বৎ, নিষ্প্রাণ। বরং আমি এই বস্তুজগতের মধ্যে সঞ্চারিত করতে চাই এই সময় থেকে জন্ম নেওয়া বোধ-কে। বাস্তব, তার সাথে জুড়ে দেওয়া হয়েছে ভাষ্য, টীকাটিপ্পনী। কিন্তু শেষমেশ সেটা যদি হয় আগাগোড়া স্বকপোলকল্পিত, তাহলে চলবে না। বাস্তবের অনেক রূপভেদ আছে। আপনার নিজের বাস্তবের অবয়বটিকে প্রতিষ্ঠা করতে গেলে খন্ডন করতে হবে অন্য কারোর বাস্তবের অবয়বকে। এটা তথ্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তথ্য যতক্ষণ না একটা আদল পাচ্ছে, ততক্ষণ তো সেটা একটা নখদন্তহীন খবরমাত্র, তার কোনো অভিঘাত নেই। সামাজিক জীব হিসেবে, আমার নজর থাকে এই অভিঘাতের ওপর। আপনি চাইলে আমাকে প্রোপাগ্যান্ডিস্ট বলতেই পারেন। আমার ছবিতে যখন আমি কিছু চরিত্রের সপক্ষে একটা যুক্তি খাড়া করি, আর কিছু চরিত্রের যুক্তিকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিই, তখন আমি একটা নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গিতে স্থির থাকার চেষ্টা করি। কিন্তু এটা প্রোপাগ্যান্ডা হিসেবে যতটা গা-জোয়ারি ভাবছেন ততটাও নয়। আমার প্রথম দিকের ছবিগুলোর দিকে যখন আবার ফিরে তাকাই, বুঝতে পারি সেখানে এ-ধরণের দূর থেকে ভেসে আসা, সূক্ষ্ম প্রোপাগ্যান্ডার কোনো স্থান ছিল না। আমি যখন একটা সর্বজনীন সংস্কৃতির উল্লেখ করছি, তখন প্রকৃতপক্ষে আমি বলতে চাইছি যে পরিকাঠামো ও প্রযুক্তির প্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আমরা মন্থর গতিতে, কিন্তু অনিবার্যভাবে, দুটি সংস্কৃতির দিকে অগ্রসর হচ্ছি: একটি সুবিধাভোগীর সংস্কৃতি, অন্যটি বঞ্চিত মানুষের সংস্কৃতি। সংস্কৃতির আঞ্চলিক লক্ষণগুলো আস্তে আস্তে ভেঙে গুঁড়িয়ে নিশ্চিহ্ন হতে বসেছে, তার জায়গায় মাথাচাড়া দিচ্ছে সব নিত্যনতুন লক্ষণ। এ’সব কিছুই হয়তো হচ্ছে কোনো সামূহিক বিপদের প্রকোপে, যা এখনও আমাদের দুনিয়া ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারছে না। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দ্রুত প্রসার এখানে একটা অনুঘটকের কাজ করছে বলেও মনে হয়, যার ফলে আরো তাড়াতাড়ি প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাচ্ছে। আমি যখন আপনার একটা ছবি দেখছি তখন আপনি জার্মান, আমি ভারতীয়, অবিশ্বাস্যরকমের ভারতীয়। কিন্তু আমার ধারণা, আপনাকে একজন জার্মান যতটা বুঝবে, আমিও ঠিক ততটাই বুঝব। আপনার মতের সাথে আমার মত মেলে। এমন নয় যে আমি আপনার সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলি না, কিন্তু আবার একমতও হই। আপনার সংকট, আপনার অসহায় ক্রোধ – এগুলোর মধ্যে আমি অব্যর্থভাবে খুঁজে পাই নিজেকে। আমার মনে হয়, আজ হোক বা কাল, ন্যাশনাল সিনেমা নামক বস্তুটির দিন ফুরোবে। তার জায়গায় দু-ধরণের সিনেমা থাকবে: একধরণের ছবি থেকে ফুটে বেরোবে সুবিধাভোগী রঈসদের ভাবজগৎ, আরেকধরণের ছবি ধরে রাখবে বঞ্চিত মানুষের বিশ্ব ও তার দেখার ভঙ্গিমাকে। এর বাইরে থাকবে না আর কিচ্ছু।

    রা: আপনি কোন শ্রেণির ছবিকরিয়ে-দের মধ্যে ফেলেন নিজেকে? কোন দলে?

    মৃ: আমি যে শ্রেণি থেকে উঠে এসেছি, তার সাথেই আমি একাত্ম অনুভব করি, আর সেটা হল বঞ্চিত মানুষের শ্রেণি। কিন্তু সেখানেও একটা সমস্যা রয়েছে। আমি শুরুতে যে মানুষটা ছিলাম, আজ তো আর সেরকম নই। অতএব আমার নিজের মধ্যে হরবখত একটা লড়াই চলে। ভিতরে আমি যেন দুটো মানুষ। যদি জিজ্ঞেস করেন, আমি আমার জীবনের ধরণধারণ বদলেছি কিনা, আমি খুব জোরগলায় বলে উঠব: না, বদলাইনি। কিন্তু আবার আমি এও জানি যে বদলে আমি গিয়েছি নিশ্চয়ই, হয়তো নিজের অজান্তেই।

    রা: মানে আপনি বলতে চান আপনার বৌদ্ধিক অবস্থানটা বদলে গেছে?

    মৃ: আমি ঠিক নিশ্চিত করে বলতে পারব না, তবে যখন নিজের অজান্তে, এমনকি আপনার নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও জীবনের ধরণধারণ বদলে যায়, তখন জগতের প্রতি আপনার যে দৃষ্টিভঙ্গি, সেটা তো একটা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। আমি সেই ভয়টাই পাই। সেজন্য আমি চেষ্টা করি পিছনদিকে ফিরে তাকাতে। চেষ্টা করি অতীতকে ভুলে না যেতে। এরকম সময়েই আমার মনে পড়ে যায় চ্যাপলিনের সেই উক্তি। তিনি বলেছিলেন, ‘আমার কোনো অপমানবোধ নেই, আর অপমানবোধ হল এমন এক জিনিস, যাকে কখনও চাইলেও ভোলা যায় না।’ আমি চেষ্টা করি এই লাইনটা সবসময় স্মরণে রাখতে, নিজের কাছাকাছি রাখতে, যাতে কখনও হারিয়ে না ফেলি নিজেকে, নিজের নোঙরগুলোকে। এটা খুব জরুরি।

    রা: কিছু লোকে যে বলে, মৃণালবাবু, আপনি কেবল বিদেশি ফেস্টিভালের জন্যই ছবি-টবি করেন, নিজের দেশের জন্য আর করেন না।

    মৃ: আমি ছবি বানাই যাতে আমার নিজের বিবেক সন্তুষ্ট থাকে। আমার বিবেক আমাকে নির্দেশ দেয় ছবি বানাতে, আর আমি আমার ছবির বিষয় নিয়ে বরাবরই খুশি। যা-ই বলতে চাই না কেন, আমার ইচ্ছে করে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষের কাছে সেটা পৌঁছে দিই। আর সিনেমার কায়দাকানুন হচ্ছে আমার ভালোবাসার জিনিস। কনটেন্ট আর ফর্ম, এই দু’য়ের জোরেই আমি জগৎ-জোড়া দর্শকের কাছে পৌঁছনোর তাগিদ অনুভব করি। আর এ-ও সত্যি যে আমি বিদেশি ফেস্টিভালগুলোয় ছবি পাঠাই। এমন কেউ কি আদৌ আছেন, যিনি নিজের ছবি বিদেশি ফেস্টিভালে পাঠাতে চাইবেন না? 

    রা: সকলেই চাইবে।

    মৃ: আমি চাই আমার ছবি লোকে দেখুক, সে নিয়ে আলোচনা করুক। সেই উদ্দেশ্যেই আমার ছবিগুলো বিদেশের ফেস্টিভালে পাঠানো।

    রা: আমার এক ভালো বন্ধু, পরিচালক পিটার লিলিয়েনঠাল একবার বলেছিলেন, ‘সত্যি বলতে কী, এর বোধহয় একটাই উত্তর হয়। আমি ছবি বানাই সবার আগে নিজের জন্য, তারপর আমার বন্ধুদের জন্য। তারপর যদি সেটা একটা বড় সংখ্যক দর্শকের কাছে পৌঁছয়, তাহলে আম খুশি।’ কিন্তু এটা তো ওঁর মত। আপনি এ ব্যাপারে কী মনে করেন?

    মৃ: পরিচালক যখন দেখেন যে তাঁর ছবি একটা বিশাল সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে গিয়েছে, তখন তার চেয়ে সুখী আর কেউ হয় না। যখন সেটা হয় না, কেবল তখনই তিনি মনে মনে একটা কৌশল করেন, বলার চেষ্টা করেন যে তিনি ছবি বানান শুধু নিজের জন্যই। কিন্তু আপনার বন্ধুর মত আমারও মনে হয় যে আমি নিজের জন্যই ছবি বানাই, আর যখন সেটা দেখে নিজের সন্তুষ্ট লাগে, তখন বুঝি সেটা বাকিদেরও সন্তুষ্ট করবে। আর বিদেশি ফেস্টিভালে ছবি পাঠানো নিয়ে কথা হচ্ছিল, সেই সূত্রেই বলি, আপনি যে ছবি বানিয়েছেন, তার জন্য পুরষ্কার জেতা কোনো গর্হিত অপরাধ নয়। বরং উল্টোটা, এতে করে আপনার মনে তৃপ্তি আসে, যে আপনি নিজেকে সঠিক উপায়ে প্রকাশ করতে পেরেছেন। সেই কারণেই আপনার ছবি বিদেশি ফেস্টিভালে মানুষের মনে ধরেছে। কেউ যদি তার কদর করে থাকে, তবে আপনার খুশি হওয়ার ন্যায্য কারণ আছে।

    রা: আপনার প্রযোজকের সাথে আজকেই দেখা করেছি, ওঁর মতে, আপনার পরের ছবিটা যদি মুখ থুবড়ে পড়েও, কুছ পরোয়া নেহি। উনি বললেন, আমি যখন কারোর সাথে বন্ধুত্ব করি, সেটা চিরকালের বন্ধুত্ব, আর যদি তার ছবি ফেল করে, তাহলে বলব, আমার বন্ধু তার সেরাটা দিয়েছে, এ নিয়ে আর কী-ই বা বলার থাকতে পারে?

    মৃ: উনি বেশ অমায়িক মানুষ। তবে আমার সবসময় মনে হয়, পরিচালক, প্রযোজক, যে লোক ছবিতে টাকা ঢালছে, তাদের সম্পর্ক আগাগোড়া নির্ভর করে লাভলোকসানের খতিয়ানের ওপর। যদি ছবি বক্স অফিসে ভালো চলে, তাহলে প্রযোজক খুশি। আর যদি সে’ ছবি টাকা তুলতে না পারে, তাহলে, স্বভাবতই তাঁর খুব একটা ভালো লাগবে না।

    রা:  আপনি তো মাঝে-মধ্যেই প্রযোজক বদলেছেন…

    মৃ: আগে যেটা হত, একই প্রযোজকের সাথে পর পর দু’-দু’বার কাজ করার সুযোগ আমার কখনোই হত না, যদি না সেই প্রযোজক হতাম আমি নিজেই। কিন্তু ইদানীং, যেহেতু দুনিয়ার সর্বত্র যত মাইনরিটি ছবির পকেট আছে সেখানকার দরজা আমার কাছে খুলে গিয়েছে, যেগুলো একসঙ্গে ধরলে বেশ বড়সড় একটা বাজার হয়, তার ফলে আমি এখন আগের চাইতে বেশ লাভজনক-ই বটে, কাজেই আগের মত প্রযোজক পেতে এখন আর বড় একটা সমস্যা হয় না।

    রা: আপনার প্রযোজক জানালেন যে উনি যে পরিমাণ টাকা লগ্নি করেছেন, সেটা ফেরত পেতে হলে এক কোটি কুড়ি লক্ষ লোককে ছবি দেখতে হবে। আর তিনি যেহেতু জানেন যে সেটা এদেশে সম্ভব নয়, কাজেই তিনি প্রত্যাশা করছেন বিদেশ থেকে টাকা উঠে আসবে। তাই নয় কি?

    মৃ: ওঁর সেটাই ধারণা। আমার যদিও মনে হয় ভদ্রলোক একটু বেশিই আশাবাদী এ ব্যাপারে। আমি নই। কিন্তু দেখা যাক কী হয়। আশা তো আমরা করে যাবই। আর এই কয়েক বছর ধরে এমনিতেই আমি প্রায় যুদ্ধকালীন ব্যস্ততায় ছবি করে চলেছি, যেমন আপনিও করছেন, কাজেই দেখা যাক কী হয়। ঝুঁকি আমাদের নিতেই হবে।

    রা: শুনেছি, অনেক ভারতীয় পরিচালকের নাকি কিছু অনুগামী থাকেন, যাঁরা বছরের পর বছর ঘিরে থাকেন তাঁদেরকে– এটা সত্যি নাকি? এমনটা ইউরোপে কদাচিৎ হয়। ফাসবিন্ডারের কিছুকাল জুটেছিল এরকম, তা বলে খুব বেশি লোকের ভাগ্যে তেমনটা হয়নি।

    মৃ: না, আমাদের এখানে সেরকম কিছু নেই। প্রথম দিকে আমরা অনেকটা সময় একসাথে থাকি, কিন্তু যে মুহূর্তে নিজের পায়ের তলায় শক্ত জমি পেয়ে যাই, সে’মুহূর্তে আমি বাকিদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলি নিজেকে। এমনটাই হয়ে আসছে। আমি যখন শুরু করি, তখন আমাদের একটা দল ছিল। তারা তখন সবাই তাল করছে, কীভাবে সিনেমার দুনিয়ায় ঝটিতি ঢুকে পড়া যায়। শেষমেশ আমাদের দ্বারা সেটা হল। তার আগে অবধি আমাদের মধ্যে ছিল একটা আশ্চর্য বন্ধুত্ব– তাই এখন যখন অতীতের কথা ভাবি, তখন এত রোমাঞ্চ অনুভব করি! কিন্তু ফিল্মের জগতে এসে যেই আমরা একেকজন কেউকেটা হয়ে গেলাম, অমনি প্রত্যেকে হয়ে যেতে থাকলাম একা, পরস্পরের সাথে কথাবার্তা পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেল। আমার মনে পড়ে, ১৯৭৫ কি ৭৬ সাল, আমি গেছি কর্ণাটকের ব্যাঙ্গালোরে, সেই প্রথম কানাড়া ভাষার ‘নিউ সিনেমা’র সঙ্গে আমার পরিচয় হল। আমার মনে আছে, একদিন রাত একটা বাজে, আমি ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকে পাশ করা একজন তরুণের ছবি দেখলাম, নাম গিরীশ কাসারাভল্লি, আর সেটা ছিল তার প্রথম ছবি, ঘটশ্রাদ্ধ (১৯৭৭)। তাকে বললাম: এটা তো তোমার প্রথম ছবি, অথচ আমি একজন ছাত্রের মত দেখলাম তোমার ছবিটা, তার থেকে শিখলাম কত কিছু! তা-বলে কিন্তু এই নয় যে তোমার ছবি আমার একেবারে নির্ভুল, নিখুঁত লেগেছে। আমি নিজে কিছু জায়গায় দ্বিমত পোষণ করি, কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্যি যে তোমার এখনও অনেক পথ চলা বাকি। চলো, আমরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগটুকু রাখি, আমাদের মধ্যে কথাবার্তা যেন চলতে থাকে। তিন বছর বাদে আমি আবার সেখানে গেলাম, আর দেখলাম ততদিনে সেই কথোপকথন থেমে গিয়েছে।    

    রা: মৃণাল, আপনার কি কোনো বন্ধুবান্ধব আছে, নাকি শত্রুই আছে অনেক? শিল্পী হিসেবে আপনার কি কখনও নিজেকে খুব একা লাগে?

    মৃ: শত্তুরের দলে অনেক বন্ধু ভিড়ে গিয়েছে – এটা বলতে পারি। শো বিজনেসে আছি তো, এখানে যতক্ষণ না কারোর প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছি, ততক্ষণ তার সাথে বন্ধুত্ব রাখাই যায়। যে মুহূর্তে সে বুঝে যাবে আমি তাকে টেক্কা দিতে পারি, অমনি দুজনের মাঝখানে কী একটা যেন চলে আসবে। এটাই হয়ে এসেছে। মাঝে মাঝে ভীষণ একা লাগে নিজেকে, ভীষণ একা, নিজেকে একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত মনে হয়। এ’ নিয়ে বেশিক্ষণ ভাবলেও খারাপ লাগে। মনে হয়, কথা বলে মিটিয়ে নিই না কেন। মনে আছে, একবার এক ফরাসিকে এই সমস্যার কথা জানিয়েছিলাম, তাতে সে আমায় বলল, এ’ তো চিরকেলে সমস্যা। তুমি যদি মাতিসের কাছে গিয়ে তাকে পিকাসোর কথা বল, মাতিস বলবে, ‘উফ্’, আর তুমি যদি পিকাসোকে গিয়ে মাতিসের কথা বল, পিকাসো বলবে, ‘উফ্’! এই তো ব্যাপার। কিন্তু ভারতবর্ষে এটা আরো অশালীন পর্যায়ে চলে যায়, যার পিছনে একটা আশঙ্কা কাজ করে, চিরতরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। ফলে আমাদের মধ্যে যখন শত্রুতা জন্মায়, তখন তার কদর্যতার কোনো তুলনা হয় না।

    রা:  এক বন্ধু আমায় বলেছিল, তার মনে হয় কলকাতার বুদ্ধিজীবীরা বড্ড একগুঁয়ে, অথচ পরিস্থিতি সম্বন্ধে হয়তো তারা একেবারেই ওয়াকিবহাল নয়। আপনি যেভাবে ব্যাখ্যা করলেন, তাতে মনে হয় এই আচরণের সাথে এদের ইতিহাসের কোনো যোগসূত্র রয়েছে, যা নিয়ে ওরা যারপরনাই গর্ববোধ করে। হয়তো তাতে করে অনেকগুলো বিষয়, যা নিয়ে এখন আলোচনা করা দরকার, সেগুলো অক্লেশে ভুলে থাকা যায়, শুধু তাই নয়…

    মৃ: কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের আলাদা করে কোনো বিশেষ দোষ বা গুণ নেই, গোটা দেশেরই এক অবস্থা। তবু যখনই দেখি কলকাতার বুদ্ধিজীবীকুল মাত্রাতিরিক্ত ঔদ্ধত্য দেখাচ্ছে  তখন বুঝি এটা আসলে তাদের নিজ নিজ নৈরাশ্য আড়াল করার একটা ছল।

    রা: এই যুক্তিটা বোধহয় সবরকম বুদ্ধিজীবী-সুলভ ঔদ্ধত্যের ক্ষেত্রেই খাটে। কিন্তু বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বাসিন্দাদের মুখে শোনা যায়।


    ২: গোরস্থানে

    মৃ: কিন্তু খেয়াল করবেন, আমি আটাত্তর সালে পরশুরাম শুট করার সময় এই গোরস্থান যা ছিল, আর আপনি এখন যে গোরস্থান দেখছেন–এই দু’য়ের মধ্যে কিন্তু একেবারেই কোনো মিল নেই। তখন সব খোলামেলা ছিল। এখন দেখুন, এখানে ওখানে বাসা উঠেছে, যার মানে আরো অনেক নিরাশ্রয় মানুষ এখানে আশ্রয় খুঁজছে। গৃহহীনতা ভারতীয় জীবনযাত্রার, বা বলা ভালো, ভারতীয় বাস্তবের একটা অংশ হয়ে উঠেছে।

    রা: এই যে একটা পুরনো শুটিং লোকেশনে আবার ফিরে এলেন– একটুও নস্টালজিক লাগছে না?

    মৃ: তা অবশ্য লাগছে, কিন্তু এটা দেখে খারাপও লাগছে যে সব আর আগের মত নেই।

    রা: আপনি বলতে চাইছেন, তাদের পরিবর্তনগুলো ঠিক ইতিবাচক অর্থে হয়নি?

    মৃ: না, ইতিবাচক অর্থে তো নয়ই। এগুলো খতিয়ে দেখলে আপনার আরো খারাপ লাগবে। তা সত্ত্বেও, বেঁচে থাকার যে ইচ্ছে, তার যে তীব্র তাড়ণা মানুষকে এতকিছুর মধ্যেও জীবিত রেখেছে, সেটাই সবচেয়ে আশ্চর্যের। এটাই বোধহয় এখানে মানুষকে টিকে থাকার আশা জুগিয়ে যাচ্ছে। 

    রা: এই যে বাস্তব বদলে যায়, কিন্তু মিউজিয়াম বা আর্কাইভের তাবৎ শিল্পবস্তু একইরকম থাকে, এটা দেখে আপনার আশ্চর্য লাগে না?

    মৃ: তা তো বটেই, বাস্তবতার পরিবর্তন হলে ফিল্ম সাবেকি হয়ে যায়, আর্কাইভে সেঁধিয়ে যায়, এতে করে সম্ভবত প্রমাণ হয় যে ফিল্ম আদতেই সমাজে কোনো আশাপ্রদ পরিবর্তন আনতে পারেনি। এই গোরস্থানের দিকেই চেয়ে দেখুন না–গোরস্থান তো–তা সত্ত্বেও লোকে এখানে এসে থাকছে–তার কারণ তাদের অন্য কোথাও মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। এটাও মনে রাখবেন, এরা সবাই কিন্তু এসেছে গ্রাম থেকে। জমিসংস্কার নিয়ে অনেক কথার ফুলঝুরি উঠলেও, এতদিনে কাজের কাজ খুব কমই হয়েছে। ফসল তোলা আর লাঙল দেওয়ার মরশুমের মধ্যিখানের সময়টুকু-তে, যখন মানুষের হাতে কোনো কাজ থাকে না, তখন তারা একের পর এক ঢেউয়ের মত এসে আছড়ে পড়ে শহরের বুকে।  ফুটপাথে ঠাঁই হয় তাদের, ভাড়া খাটে এখানে ওখানে, তবে সবচেয়ে যেটা আশ্চর্যের–তা হল–এত কিছু সত্ত্বেও তারা স্বপ্ন দেখা থামায় না–সন্তান জন্ম দেয়–বংশবৃদ্ধি করে চলে। এটাই আমায় এতখানি মুগ্ধ করে রাখে।


    ৩: আকালের সন্ধানের লোকেশনে

    মৃ: একটা দৃশ্য ছিল বটে যেটা আমার পক্ষে এখানে তোলা সম্ভব হয়নি, স্টুডিওয় গিয়ে তুলতে হয়েছিল। সেটা ঐ বাড়ির সেই পক্ষাঘাতগ্রস্ত স্বামীকে নিয়ে, আকালের ছবির শুটিং চলাকালীন এক রাতে যাঁর মৃত্যু হয়। আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম সিকোয়েন্সটা বাড়িতেই ঐ ঘরের মধ্যে শুট করব, কিন্তু তার আগে আমাদের আরেকটা দৃশ্য শুট করতে হয়েছিল, যেখানে বিধবা স্ত্রীকে শেষকৃত্যের প্রথা-মাফিক স্নান করতে হবে। ওখানেই একটা পুকুরপাড়ে দৃশ্যটা তুলছি, এমন সময় লক্ষ্য করলাম – উপস্থিত গ্রামের বাসিন্দারা, বিশেষ করে মেয়েরা, দৃশ্যটাকে ঠিক ভালো মনে নিচ্ছে না। অন্ধবিশ্বাস থেকে তাদের মনে হয়েছে যে, এখানে মৃত্যু নামক জিনিসটাকে নিয়ে খানিক হেলাফেলা করা হচ্ছে। ব্যাপারটায় ওরা বেশ রুষ্ট হয়েছিল। তখনই আমি ঠিক করে ফেলি যে, স্বামীর মারা যাওয়ার দৃশ্যটা আমি ওদের থেকে দূরে স্টুডিওয় শুট করব। ওদেরকে ‘সংশোধন’ করা অসম্ভব। ওদের জীবনযাপনের সাথে ওতোপ্রোত জড়িয়ে আছে কুসংস্কার। তাই আপনি যখন ছবি-করিয়ে হিসেবে আমার দায়িত্ব, অর্থাৎ সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব নিয়ে আমায় প্রশ্ন করেন, তখন আমি বলব যে, আমি যাদের নিয়ে এসব ছবি বানাই, তাদেরকে আগাগোড়া শুধরে দেওয়ার এলেম আমার নেই।

    রা: হয়তো ওদের ‘সংশোধন’ করা নয়, বরং পরিস্থিতিকে শুধরে দেওয়া…

    মৃ: হ্যাঁ, আলবাৎ, সিস্টেমটাকে শোধরানো, আর সেটা যারা এসব ছবি দেখে, তাদের মাধ্যমেই করতে হবে। আমি যখন এ-ধরণের ছবি বানাই, তখন আমি কিছু বিশেষ লোকজনকে নিয়ে বানাই– তা-বলে এমন নয় যে ছবিগুলো তাদের জন্য বা তাদেরকেই উদ্দেশ্য করে তৈরি করা হয়েছে। আমি সেইসব মানুষের জন্য ছবি বানাই, যারা আমার ছবির সমঝদার দর্শক। আর আমি সর্বতোভাবে চেষ্টা করি যাতে দর্শক আমার ছবি বুঝতে পারে। কিন্তু বোধ করি, আমি সমস্যাগুলোকে ঠিকঠাক তুলে ধরতে পারি না, তাদেরকে ঠিক মত বিশ্লেষণ করতে পারি না। এটা একটা চিরন্তন, ঘটমান প্রক্রিয়া, চলতেই থাকবে। আমি ছবি বানাতে থাকি, সমস্যা তুলে ধরি, পরিস্থিতিগুলো নিয়ে কাঁটাছেঁড়া করি, আর একটা দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাই সবসময়। অপর দিকে আমি চাই দর্শক এই পরিস্থিতিগুলোকে বুঝুক, আমাকে শুধরে দিক। আমার ছবি দেখে তারা যে প্রতিক্রিয়া দেয়, এবং তার সাথে সাথে আমার যে পাল্টা প্রতিক্রিয়া– এই দুয়ের মধ্য দিয়েই কাজটা সম্পন্ন হয়।

    রা: কিন্তু এই যে আপনি এত কাঠখড় পোড়ালেন, তারপর এখানে এসে দেখলেন আদপে কিছুই বদলায় নি, সব যে-কে-সেই রয়েছে, এমনকি সে নিয়ে কারোর কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই, সবাই তাতে‌ই খুশি – আপনার মনে হয় না এটা একটা মারাত্মক সমস্যা? আপনি তো ছবিটা করেছিলেন কিছু জানান দেওয়ার জন্য!

    মৃ: যখন ওরা পর্দায় নিজেদের দেখে উৎফুল্ল বোধ করে, তখন আমার একটা খটকা লাগে, আমি টানটান হয়ে বসি…

    রা: কিন্তু গাঁয়ের লোক নিজেদেরকে পর্দায় দেখে খুব আহ্লাদিত হচ্ছে, এটা তো খুব একটা সিরিয়াস ব্যাপার বলে মনে হয় না … 

    মৃ: কেবল গাঁয়ের বাসিন্দারা নন, আপনি এখন একটা বস্তিতে যান, সেখানকার মজুরদের নিয়ে কি বস্তির বাচ্চাদের নিয়ে ছবি বানান, দেখবেন ওরাও নিজেদেরকে সিনেমার পর্দায় দেখে আহ্লাদে আটখানা হচ্ছে। 

    রা: তা তো বটেই, কিন্তু আপনি কি একটা ভিন্ন অ্যাপ্রোচ নিয়ে ছবি করতে শুরু করেননি? আমার কাছে তো এটাই সবচেয়ে জরুরি পয়েন্ট, আমি সবসময় একটা কিছু নিয়ে ছবি করতে শুরু করি, তখন যদি আমার এই আশাটুকু না থাকে যে এর দ্বারা সামান্য হলেও পরিবর্তন আসবে – সেই পরিবর্তন অবশ্যই সরাসরি ফিল্মের মাধ্যমে হবে না – কিন্তু যদি ফিল্ম অন্তত কিছুসংখ্যক মানুষের চিন্তাভাবনার ওপর ছাপ ফেলতে পারে, যাদের দায়িত্বজ্ঞান বাকিদের চাইতে বেশি, যাতে করে সিস্টেমটা…

    মৃ: সম্ভবত একটা অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করে ফিল্ম তার ছাপ ফেলে যায়।

    আকালের সন্ধানে-র সেটে মৃণাল সেন এবং স্মিতা পাতিল

    রা: আমার আরেকটা প্রশ্ন ছিল। ঐ বাচ্চা মেয়েটি, যার নাম আরতি, যার সাথে এই মাত্র দেখা হল, সে জানতে চেয়েছিল আপনি তাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যেতে পারবেন কিনা। তার উত্তরে আপনি কী বলেছিলেন?

    মৃ: আমি এখানে আসার পরপরই ও জানতে চাইল, আমার সাথে আমার বাড়ি যেতে পারবে কিনা। আমি শুধালাম: ‘তারপর তুমি কী করবে?’ ও বলল ফিল্মে পার্ট করতে চায়। অর্থাৎ আমি ছবির মাধ্যমে কী বক্তব্য রাখতে চাইছি তা নিয়ে ওর একটুও মাথাব্যথা নেই, তবু ও ছবিতে অভিনয় করতে চায়।

    রা: কিন্তু মেয়েটি আপনার ওখানে আসতে চেয়েছিল কাজ করবে বলে? 

    মৃ: হ্যাঁ। আমি জানতে চাইলাম, কোন কাজের জন্য? সে বললে, ‘আমি আপনার ছবিতে পার্ট করতে চাই, আপনি বলুন না আমায় কী করতে হবে।’ তারপর কী হল জানেন? আমি তখন একটা অন্য ছবির শুটিং করছি, এমন সময় মেয়েটির বাবা কলকাতায় আমার বাসায় এসে উপস্থিত, তারপর সে কী কান্নাকাটি। তিনি বলেন, তাঁর মেয়ে নাকি দু’মাস হয়ে গেল বেপাত্তা– হেন জায়গা নেই যেখানে তিনি মেয়ের সন্ধান করেননি, কিন্তু কোত্থাও পাওয়া যায়নি তাকে। পুরো ছ’-ছ’মাস লেগে গেল মেয়েটিকে খুঁজে বের করতে। এক্ষেত্রে যেহেতু আমিই তাকে ছবির একটা ছোটখাটো সিকোয়েন্সে পার্ট দিয়েছিলাম, আর তার পরেই সিনেমার ভূত চাপল ওর মাথায়, কাজেই মনে হয় কোথাও গিয়ে যেন আমার ওপরও খানিকটা দায়িত্ব বর্তায়। ঐ-জন্যই তো মেয়েটি বাড়ি ছেড়ে পালাল। শেষমেশ পরিবর্তন বলতে এ-টুকুই হয়, যত নচ্ছাড় পরিবর্তন। 


    রা: আচ্ছা, আর্টিস্ট হিসেবে আপনাকে যেসব কঠিন বাধার মুখোমুখি হতে হয়, সে-ব্যাপারে আপনার কী মত?

    মৃ: কেরিয়ারের শুরুর দিকে আমার সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা ছিল কীভাবে টাকাপয়সা জোগাড় হবে। কিন্তু এখন টাকা জোগাড় করাটা আর তেমন কঠিন বলে মনে হয় না। তবে বিষয় পছন্দ করার ব্যাপারে আজকাল আমি ভীষণ খুঁতখুঁতে হয়ে গেছি। কারণ কেরিয়ার শুরু করার সময়ে মানুষে-মানুষে সম্পর্ক যা ছিল, তার চাইতে এখন ও-সব আরো জটিল। বিষয় খুঁজে পাওয়াটাই এখন আমার কাছে একটা বিষম ব্যাপার। কোন দিকে নজর দেব? দর্শককে আমার বলার আছে-টা কী? ছবিতে আমি আদৌ ঠিক কী দেখাতে চাইছি? প্রত্যেকবার ছবি শুরু করার সময় আমার এ-রকম একটা না একটা ক্রাইসিস হবেই! মনে হয় যেন একটা খাঁ খাঁ শূন্যতার মধ্যে রয়েছি। মনে হয়– এই বুঝি আমার নতুন কিছু সৃষ্টি করার সামর্থ্য ফুরিয়ে যাবে– হয়তো আর বেশিদূর যাওয়া-ই হবে না আমার। শেষ কয়েক বছর ধরে কেবলই মনে হচ্ছে এ-রকম। ছবিতে টাকা লাগাবে বলে লোকজন এসে দাঁড়িয়ে থাকে দরজায়। আমি বলি তাদের– সবুর করো। কিন্তু তারাই বা কাঁহাতক করবে সবুর? তার ওপর আমার ইউনিটের লোকজন আছেন, আমি নতুন ছবি হাতে না নিলে তাঁরা বেকার হয়ে বসে থাকবেন। সেটাও একটা দুশ্চিন্তার কারণ। ফলে দ্বিধা-সংশয় আরো দ্বিগুণ হয়ে যায়।

    রা: মৃণাল, প্রশ্নটা আমি হয়তো একটু অন্যভাবে করতে পারতাম। একজন আর্টিস্ট হিসেবে, আপনার কি কখনও এমন মনে হয়েছে যে গল্প বলার ব্যাপারে আপনি হয়তো খুবই পটু, কিন্তু ইমেজ তৈরির ব্যাপারে ততটা নন, বা এরকম কিছু?

    মৃ: দেখুন, আমার সবসময় মনে হয় ছবি করার সময়, সবার আগে আমাকে একটা আইডিয়া বা কনসেপ্ট ভেবে নিতে হবে। এই কনসেপ্টটাই প্রথমে আমার মাথায় আসে, তবে দৃশ্য হিসেবে নয়। একটা ছবি দেখে বা শব্দ শুনে মানুষের মনে কনসেপ্টের উদয় হতেই পারে, কিন্তু কাজ শুরু করতে হবে ঐ কনসেপ্ট থেকেই। ওটাই হচ্ছে কাজ শুরু করার ভিত। তারপর সেখান থেকে বাড়াতে থাকো, ছবি নিয়ে ভাবো, শব্দ নিয়ে ভাবো, সুর নিয়ে ভাবো, তারপর ভাবো ছবি বানাতে গেলে যা যা সরঞ্জাম দরকার, সেসব নিয়ে। 

    রা: তার মানে ধরুন আপনি একটা লোকেশনে গেছেন, গিয়ে সেখানে একটা বাড়ির সন্ধান পেলেন, তারপর ভাবলেন, আরে, এটা নিয়ে তো একটা গল্প ফাঁদতে হবে – এরকম আপনার সাথে কখনো হবে না? 

    মৃ: আপনার পয়েন্টটা ঠিক ধরতে পারলাম না।

    রা: ধরুন আপনি একটা লোকেশনে গেলেন…

    মৃ: …ছবি করতে?

    রা: …হ্যাঁ, ছবি করতে, তারপর আপনি সেই লোকেশনটা দেখে খুবই প্রভাবিত হলেন, ঠিক করলেন সেটা নিয়েই একটা ছবি করবেন। এরকম কখনও হতে পারে?

    মৃ: নিশ্চয়ই পারে। আমি একটা কিছু দেখলাম–বা কিছু আমার কানে এল–কোনো শব্দ। আমি ছবির মত করে দেখলাম–তারপর সেখান থেকে একটা আইডিয়া ঠিকরে বেরোল–সেটা হয়তো একটা কনসেপ্টের জন্ম দিল। তবেআসল কাজটা শুরু করতে হবে কনসেপ্ট থেকেই। ধরা যাক, একটা জায়গায় এসে পড়েছি, সেখানে হয়তো কিছু চোখে পড়ল আমার–তারপর বলে বসলাম, এই জায়গাটা নিয়ে একটা ছবি করবই করব। কিন্তু সেটার বিষয় কী হবে? এ’টা হল মোদ্দা কথা। বা আমি হয়তো খবরের কাগজে একটা কিছু পড়লাম, তারপর ভাবলাম: এটা নিয়ে একটা ছবি করলে কেমন হয়? কিন্তু মোদ্দা কথাটা হল, এই খবর থেকে কীভাবে একটা কনসেপ্ট খাড়া করা যায়। ঠিক কোন জিনিসটায় তোমার আগ্রহ, আর তা নিয়ে তুমি আসলে কী করতে চলেছ? এভাবেই শুরু হয়, এটা আমার ক্ষেত্রে বারবার নানাভাবে ঘুরে ফিরে এসেছে। ধরুন, একটা গল্প, সেটা হয়তো অনেককাল আগে পড়েছি। সেটা আমার মনে ধরেছে কি ধরেনি, তারপর সেটার ব্যাপারে আর কিচ্ছু মনে নেই। হঠাৎ একদিন মাঝরাতে আমি একটা বই নামিয়ে পড়তে শুরু করলাম, সেখানে সেই গল্পটা, আজ থেকে দশ বছর আগে যা পড়ে আমি আহামরি কিছু পাইনি। আবার সেটা পড়তে আরম্ভ করলাম, আর সেটাই আমার ছবির স্টার্টিং পয়েন্ট হয়ে গেল। এভাবেই হয় ব্যাপারটা, ছবির কায়দাকানুনের ভাবনা অনেক পরে আসে। 

    ছবির ডানদিকে রাইনহার্ড হফ ও মধ্যমণি মৃণাল সেন

    রা: এরকম কখনও হয়েছে, যে আপনি একটা চিত্রনাট্য প্রায় শেষ করে ফেলেছেন, হঠাৎ ঠিক করলেন সেটা নিয়ে আর ছবি করবেন না?

    মৃ: কখ্খনও না। একটা ছবি আমি করতে চলেছি, এটা না জানা অবধি আমি কোনো মতেই চিত্রনাট্য লেখায় হাত দিতে পারি না। যখনই একটা গপ্পো পছন্দ করে চিত্রনাট্য লিখতে শুরু করি, মনে হয় যেন খুব বোকার মত কাজ করছি, আমার গল্প বাছাই-এ গলদ হচ্ছে। চাপ থাকে। কিন্তু চাপ আমার মন্দ লাগে না। চাপে থাকলে, মনে হয় বয়সটা এখনও কমই আছে। সেটা একটা চ্যালেঞ্জের মত হয়ে দাঁড়ায়। এভাবেই চিত্রনাট্য ক্রমশ আড়েবহরে বাড়তে থাকে, যতক্ষণ না রীতিমত চিত্তাকর্ষক হয়ে উঠছে। আমার কাছে চিত্রনাট্য নেহাতই একটা গাইডলাইনের মত, আমি হরদম সেটার রদবদল করতে থাকি। 

    রা: আমার ধারণা আপনি ছবি করার ক্ষেত্রে ডায়ালেকটিকাল স্টাইলে বিশ্বাসী।

    মৃ: ডায়ালেকটিক্সের নাগাল এড়ানো মুশকিল, ওটা যে শেকড় গেড়ে বসে রয়েছে চিন্তাভাবনায়। তবে চলচ্চিত্রের আঙ্গিকের দিকটা ধরলে, আমার ঝোঁকটা থাকে যন্ত্রপাতি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার দিকে, মানে আমার ক্যামেরা, রেকর্ডিং মেশিন, তারপর শুটিঙের পরে যা যা করা হয়, মন্তাজ, মিক্সিং, আরো কী না কী…সেই নিয়ে। আমি এই সব কিছু নিয়েই নাড়া চাড়া করতে পছন্দ করি, ঠিক যেরকম একটি শিশু তার বিল্ডিং ব্লক নিয়ে করে, একজন কবি করেন তাঁর শব্দ নিয়ে, ফুটবলার করেন ফুটবল নিয়ে, শিল্পী করেন তুলি দিয়ে – সেরকমই আমি আমার ক্যামেরা আর সাউন্ড নিয়ে কাজ করতে পছন্দ করি।  

    রা: কিন্তু আমি লক্ষ্য করেছি আপনার কী বলতে চাইছেন, তা কিন্তু আপনার কাছে ভীষণভাবে স্পষ্ট– যদিও আপনি সবসময় স্বতঃস্ফূর্ততা নিয়ে কথা বলছেন, আর এত সব যন্ত্রপাতি নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে চলেছেন।

    মৃ: স্পষ্টতা পরে আসে…আসলে আমি একধরণের পাগলামিতে বিশ্বাস করি। সেই পাগলামির অবশ্যই একটা কায়দাকানুন থাকা চাই। একবার ঠিক করেছিলাম ক্রেডিটে লিখব: ডিরেকশন, স্ক্রিপ্ট অ্যান্ড গিমিকস – অল বাই মৃণাল সেন। ভারতবর্ষের মত একটা চরম গোঁড়ামি-সর্বস্ব দেশ, যেখানে মানুষ পূর্বপুরুষের বেঁধে দেওয়া পথ থেকে একচুলও নড়ে না, সেখানে মাঝেসাঝে একটু-আধটু পাগলামি করার প্রয়োজন আছে বইকী। আমার দিক থেকে যতটুকু করার আমি করেছি। কিন্তু এখন এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছেছি আমি, যখন ইচ্ছে করে ভিতরের দুনিয়া-টার কথা বলতে। সেখানে আগেকার মুহূর্মুহূ কাটের কোনো স্থান নেই। মন্তাজের কাজটা আগে যেভাবে করতাম, তার চাইতে অনেকটাই বদলে গিয়েছে এখন। ছবির বিষয়বস্তুই আসলে স্থির করে দেয় তার স্টাইলটা ঠিক কী রকমের হবে।

    রা:  কখনও বিষয়বস্তু নেই এরকম কোনো ছবি তৈরির কথা ভেবেছেন, ফিল্ম অ্যাস ফিল্ম – এই ভেবে? 

    মৃ: বিষয়বস্তু তো ফিল্মে থাকতেই হবে। ফিল্ম অ্যাস ফিল্ম বলতে কি বিমূর্ত ছবির কথা বলছেন? বিমূর্ত হলেও তো কিছু বলার থাকে তার। বিমূর্ততা তো কারোর নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই আহরণ করা হয়। 

    রা: তবু, আজকাল তো এমন অনেকেই আছে যারা ছবির সম্পাদনার ভাষাকে ঘোর সন্দেহের চোখে দেখে, যেহেতু ধরেই নেওয়া হচ্ছে তার দ্বারা কিছু না কিছু বলা হবে, বা কোনো বার্তা দেওয়া হবে।

    মৃ:  আমি একেবারেই তার বিরুদ্ধে নই। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমি সেধরণের ছবি কখনও বানাবো না। তবে যদি দেখি এমন কোনো কাজ রয়েছে যেটা স্রেফ আঙ্গিক নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে, আমি তাকে কখনোই সটান ‘না’ বলে নাকচ করে দেব না। আমার যথেষ্ট আগ্রহ থাকবে তার ব্যাপারে। দর্শকের সাথে ভাবনার আদান-প্রদানের স্বার্থে যদি প্রয়োজন হয়, তবে আমি হয়তো এ’রকম ছবি থেকে দু একটা কায়দাকানুন ধারও নিতে পারি। উদাহরণ হিসেবে নরমান ম্যাকল্যারেনের কথাই ধরুন না [(১৯১৪-৮৭) স্কটিশ ক্যানাডিয়ান অ্যানিমেশন-শিল্পী, পরিচালক ও প্রযোজক]–বিচিত্র সব থিমের ওপরে ছবি বানিয়েছেন, আবার এমন ছবিও করেছেন যেগুলো আগাগোড়া আইডিয়া-বিবর্জিত, স্রেফ কিছু প্যাটার্নের খেলামাত্র–আমার তো ওঁর প্যাটার্নগুলো অসামান্য লাগে। উনি এধরণের যে;কটা ছবি বানিয়েছেন, সেগুলো নিয়ে আমি খুবই উৎসাহী। 

    রা: এবার একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করি, যখন আমরা এই ছবিটা শুরু করলাম, আপনাকে কিন্তু বেশ চিন্তিত মনে হচ্ছিল। আর আপনার বন্ধুবান্ধব অনেকের মুখেই শুনেছি আপনি নাকি খুব নার্ভাস প্রকৃতির। এটা সত্যি নাকি?

    মৃ: আমি জীবনে এর আগে কখনো ক্যামেরার সামনে আসিনি। যখন আপনি প্রশ্ন করছিলেন, আমি বুঝতে পারছিলাম না কীভাবে আমার ভাবনাগুলোকে গুছিয়ে উঠব। সেজন্যই বোধহয় একটু নার্ভাস লাগছিল। বেশ কয়েকবার আমতা আমতা করছিলাম। আর আমার জবাবগুলোও সবসময় ঠিকঠাক হচ্ছিল না। শট নেওয়া হয়ে গেলে পরে মনে হচ্ছিল জবাবগুলো বোধহয় অন্যভাবেও দেওয়া যেত। 

    রা: আপনার মনে হয় না, জীবনে একবার না একবার ক্যামেরার সামনে আসাটা নিজেকে পরখ করে নেওয়ার একটা ভালো উপায়?

    মৃ: সে তো বটেই, আমি ভেবেছিলাম ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে কী করতে হয় না হয় সে’সব বুঝি আমার জানা হয়ে গেছে। কিন্তু যখন নিজে হাতেকলমে করতে গেলাম, দেখলাম কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। আমার মনে হয় এটা আরো অনেকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আমি সত্যিই জানি না। আমার সবচেয়ে বড় বিড়ম্বনা হচ্ছে, যখন আমি ক্যামেরার সামনে দাঁড়াই, তখন আমার হাত দু’খানা নিয়ে যে কী করব সেটা কিছুতেই ঠিক করতে পারি না। 

    রা: আপনি তো বেশ কয়েকটি প্রোভোকেটিভ ছবি করেছেন। এমনকি আজও আপনার ইচ্ছে হচ্ছে আমাকে নানাভাবে উসকে দিতে। আপনার কি মনে হয় একটা ছবির উচিৎ দর্শককে উসকে দেওয়া, দিলেও সেটা কতটা?

    মৃ: ফিল্ম তো উসকে দেয়ই। একটা সময় ছিল যখন আমি নিজেকে এজেন্ট প্রোভোকেটর বলতাম। দর্শক আমার সাথে একমত হল কি হল না ততটা জরুরি ছিল না সে প্রশ্নটা। আমার কাজ তাদেরকে উসকে দেওয়া–দর্শককে বিচলিত করা–তারপর একটা প্রতর্ক উসকে দেওয়া–সেটা আমার সাথে দর্শকের না হলেও, হবে দর্শকের সাথে তার সহ-দর্শকের। একটা ছবি করেছিলাম– নাম পদাতিক— কলকাতা-ত্রয়ীর তৃতীয় ছবি। সেসময় মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদীরা যে আন্দোলনটি করছিলেন (নকশালবাড়ি আন্দোলন)– আমি যদিও তার ঘোর সমালোচক ছিলাম– কিন্তু চেষ্টা করেছিলাম ছবিতে যেন কোনোভাবে তার কুৎসা না করে ফেলি। আত্মসমালোচনা আর কুৎসার ভেদরেখা কখনো কখনো খুবই সূক্ষ্ম হয়, সে ব্যাপারে আমি ছবি করার সময় ভীষণ সচেতন ছিলাম। পদাতিক বাংলার বেশ কয়েকজন মার্কসবাদী-লেনিনবাদী কর্মীর একেবারেই মনে ধরেনি। ওঁরা ছবিটাকে রীতিমত অপছন্দ করেছিলেন। তবু, তাঁদের মধ্যেও কেউ কেউ তাৎপর্য খুঁজে পেয়েছিলেন তাতে, রাজনৈতিক দিক থেকে। একটা ছবি যদি রাজনৈতিক আলোচনার সূত্রপাত করতে পারে–আমার পক্ষে সেটুকুই যথেষ্ট। আপনার ছবিটা পছন্দ হল কি না–আমার দৃষ্টিভঙ্গি আপনি গ্রহণ করলেন কি করলেন না–সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। কিন্তু এই যে আমার ফিল্ম একধরণের অনুঘটকের কাজ করল, বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুগুলো নিয়ে বাদানুবাদ উসকে দিল, এখানেই বোধহয় আমি উৎরে গেছি।

    রা: আচ্ছা মৃণাল, আপনি কি দর্শককে প্রশ্নের মুখোমুখি করতে পছন্দ করেন?

    মৃ: হ্যাঁ, তা করি বটে। কিন্তু তার পাশাপাশি আমি জবাবও দিই, অথবা তার সূত্র ধরিয়ে দিই। আমার ছবিতে দর্শকের উদ্দেশ্যে কিছু প্রশ্ন থাকে, আজ বেশ কিছুকাল ধরে আমি যেটা করছি সেটা হল, ছবির শেষগুলো অমীমাংসিত রেখে দেওয়া। কোনো নিশ্চিত নিষ্পত্তিতে পৌঁছনোর অভিপ্রায় আমার নেই, কারণ জীবনের বেশিরভাগটাই আমার মনে হয় নিষ্পত্তিহীন। আমরা স্রেফ পরিস্থিতিগুলো বিশ্লেষণ করতে পারি, যাতে দর্শক যতক্ষণ না নিষ্পত্তি খুঁজে পাচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত প্রশ্ন করে চলে। 

    রা: এই যে আপনি ন্যারেটিভ, যেটা কিনা একটা গল্প-বলার ফর্ম, সেখানে এরকম পন্থা অবলম্বন করছেন – এটা আমার বেশ কঠিন লাগে। যেভাবে ফর্মটাকে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেখানে তার একটা শেষ বা পরিসমাপ্তি তো থাকবেই, সেই পরিণতিতে কোনো নিষ্পত্তি না হলেও: কারণ গল্প-বলার তো একটা শেষ আছে। অতএব এটা একটা স্ববিরোধ।

    মৃ: মানে আপনি বলতে চাইছেন স্ববিরোধটা কাঠামোর মধ্যেই আছে। কিন্তু তার মানে তো এই নয় যে নিষ্পত্তি আপনাকে পেতেই হবে। আপনার হয়তো একটা পরিসমাপ্তি থাকবে, কিন্তু সেটাকে একটা পর্যায়ে অমীমাংসিত রেখে দিতেই পারেন।

    রা: ভাবনার স্তরে আমার মনে হয় দর্শক চাইবে জিনিসটাকে অমীমাংসিত রেখে দিতে, কিন্তু আবেগ-অনুভূতির স্তরে, আমার আন্দাজ, ওরা সবসময়েই কোনো না কোনো পরিসমাপ্তি প্রত্যাশা করে। 

    মৃ: কিন্তু আপনি একটা পরিসমাপ্তির ইঙ্গিতটুকু দিয়ে ছেড়ে দিতে পারেন। যেমন আপনার নাইফ ইন দা হেড (১৯৭৮) আর ম্যান ইন দ্য ওয়াল (১৯৮২) ছবিতে আপনি একটা শেষের ইঙ্গিত দেন, মীমাংসার ইঙ্গিত করেন, কিন্তু তবু সেটা নিষ্পত্তিহীন থেকে যায়। তারপর যে যার ইচ্ছে মত সেটার অর্থ নিরূপণ করুক না।

    রা:  এটা দর্শকদের একটা সমস্যা, যেহেতু তাদের একটা পরিসমাপ্তি দরকার…

    মৃ: …তার সাথে মীমাংসা ও নিষ্পত্তি। চামচে করে খাইয়ে দিলে দর্শকরা খুব খুশি। তারা মাথা খাটাতে নারাজ।

    রা: হ্যাঁ, তবু হয়তো আমরা আমাদের ফিল্ম সম্বন্ধে তাদের ভাবতে বাধ্য করতে পারি। আমাদের উচিত তাদের একটা পরিসমাপ্তি দেওয়া। আমার ধারণা, অমীমাংসিত রেখে দেওয়ার চাইতে হয়তো সেটাই ভালো।

    মৃ: কোথাও একটা গিয়ে তো থামতে হবেই ফিল্মকে। সেটা একশ-বার সত্যি। ফিল্ম কোথাও একটা গিয়ে থেমে যায়, কিন্তু সেটা যে সবসময় নিষ্পত্তি দেয় তা-ও তো নয়।

    রা: কোনো স্থায়ী নিষ্পত্তি নেই, হয়তো এটাই গল্পের একমাত্র নিষ্পত্তি, কিন্তু এটা আরো খানিক দূর অবধি যাওয়া উচিত।

    মৃ: হ্যাঁ, আরো দূর অবধি যাওয়া উচিত। দর্শকের মনে থেকে যাওয়া উচিত তার রেশ। সেই জন্যই আমার মনে হয়, এধরণের সৃষ্টিশীল কাজে দর্শকদের অংশ নেওয়াটাও ভীষণ জরুরি। পরিচালক, যিনি ছবি করছেন, তাঁকে মাথায় রাখতে হবে যেন তিনি দর্শকের হাতে কিছু সূত্র ধরিয়ে দিতে পারেন, যাতে করে সে নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে ছবির পরিস্থিতিকে মিলিয়ে দেখতে পারে। এভাবেই দর্শক প্রেক্ষাগৃহে থাকাকালীন হয়ে ওঠেন একজন সৃষ্টিশীল অনুঘটক। এরকম অনুকূল পরিবেশ যদি তৈরি করা সম্ভব হয় (তখনই সম্ভব যখন আমরা সেই ধরণের ছবি তৈরি করব, তার সঙ্গে দেখা পাব উপযুক্ত দর্শকের) যখন স্রষ্টা আর দর্শকের মধ্যে একটি মিলনক্ষেত্র প্রস্তুত করা যাবে, সেই মুহূর্তে একটা অন্য কিছু ঘটতে আরম্ভ করবে। তখন আপনি আপনার দর্শকের সামনে কিছু পেশ করবেন, দর্শক তার নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সেটা মিলিয়ে দেখবে, অতঃপর সেই দর্শক পৌঁছবে এমন একটি সিদ্ধান্তে, যেটি মোটেই আপনার নয়…

    রা: এমনটা নিশ্চয়ই সম্ভব…

    মৃ: …আর সেটা, আমার মতে, হলে ভালোই হয়। আমার মতে সেটাই আদর্শ পরিস্থিতি, যেখানে আপনি আপনার দর্শককে একটা সৃষ্টিশীল কাজের অংশীদার করে তুলছেন, তাকে উসকে দিচ্ছেন স্বয়ং সৃষ্টিশীল কাজের একজন সক্রিয় অনুঘটক হয়ে উঠতে। এই একই কারণে আমি দর্শকদের উসকে দিতে চাই।

    রা: পুরোটাই নির্ভর করছে আমরা কতটা মাথা খাটিয়ে তাদেরকে ম্যানিপুলেট করছি– তার ওপর।

    মৃ: আর তারাই বা কতটা বুদ্ধি খাটিয়ে সেই ম্যানিপুলেশনের পাল্টা প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে।

    রা: হ্যাঁ। কিন্তু আপনি কি ম্যানিপুলেটর হওয়ার পক্ষপাতী?

    মৃ: না হওয়ার কী আছে? আমি একজন ম্যানিপুলেটর তো বটেই, এমনকি আপনিও!

    রা: মানছি আপনার কথা। কিন্তু আমি চাই কেউ একটা পর্যায় অবধি আমায় ম্যানিপুলেট করুক, তার অতিরিক্ত হয়ে গেলে সেটা আমার পছন্দ নয়।

    মৃ: একটা সময় ছিল, যখন বেজায় বুকনিবাজ ছিলাম আমি– কথায় কথায় বুলি ঝাড়তাম, তখন আমরা সকলেই মনে মনে এক শিশুসুলভ আশাবাদ পুষে রেখেছিলাম– ভাবতাম বুঝি রাস্তার মোড় ঘুরলেই দেখব– আশা বলে একটা জিনিস দাঁড়িয়ে রয়েছে আমাদের অপেক্ষায়। আমাদের রাজনৈতিক নেতারা আমাদেরকে সেরকমই শিখিয়ে-পড়িয়ে নিয়েছিলেন– তার ছোঁয়াচ আমিও এড়াতে পারিনি। সে-সময় অত্যন্ত বুকনিবাজ নীতিবাগীশ কয়েকটি ছবি করেছি– আর বলে বেড়িয়েছি– কেউ যদি আমার ফিল্মকে ইস্তাহার বিলির মঞ্চ মনে করেন, তাতে বিন্দুমাত্র লজ্জা পাব না আমি। কথাটা যে খাঁটি ছিল তাতে সন্দেহ নেই, কিন্তু লাভের লাভ হয়নি খুব একটা। কারণ ওসব করে বাস্তবকে যথাযথ দৃষ্টি দিয়ে দেখানো সম্ভব হয়নি, মানুষের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষাকে রূপদান করতেও সাফল্য আসেনি বড়-একটা। অতঃপর, নিজেকে শুধরে নিয়েছি আমি।

    জার্মান চলচ্চিত্র-পরিচালক রাইনহার্ড হফের জন্ম ১৯৩৯ সালে জার্মানির মারবুর্গে। যুবাবয়সে সাহিত্য ও সমাজতত্ত্বের পাঠ নিতে গিয়েছিলেন মিউনিখে, কিন্তু ঘটনাচক্রে অক্ষচ্যুত হয়ে ঢুকে পড়েন বাভারিয়া স্টুডিও-তে। টেলিভিশনের জন্য নির্মাণ করেন একাধিক তথ্যচিত্র ও অনুষ্ঠান। চলচ্চিত্রে হাতেখড়ি হয় লব্ধপ্রতিষ্ঠ পরিচালকদের সহকারী হিসেবে। ১৯৭৩ সালে জার্মানির নতুন প্রজন্মের অন্যতম খ্যাতনামা পরিচালক ভোলকার শ্লন্ডর্ফ ও প্রযোজক এবার্হার্ড ইয়ুঙ্কার্সডর্ফের সাথে একটি প্রযোজনা সংস্থার পত্তন করেন, যার নাম বায়োস্কোপ ফিল্ম।


    অনুবাদ সম্বন্ধে দু-চার কথা

    এই অনুবাদটি করার সময় আমরা মূল বয়ানের কিছু ইংরেজি শব্দ অপরিবর্তিত রেখেছি, যেমন: থিম, আইডিয়া, কনসেপ্ট, প্যাটার্ন, প্রোভোকেটিভ, ম্যানিপুলেশন ইত্যাদি, যেহেতু শব্দগুলি বাংলা কথোপকথনে প্রায়শই ব্যবহৃত হয়। তাছাড়া গা-জোয়ারি তর্জমা করলে সংলাপ কৃত্রিম ঠেকতে পারে– এমন আশঙ্কাও ছিল। অবশ্য কিছু ক্ষেত্রে বহুলব্যবহৃত হওয়া সত্ত্বেও ইংরেজি শব্দকে আমরা বাংলায় অনুবাদ করেছি, কারণ আমাদের ধারণা তাদের বাংলা প্রতিশব্দ যথেষ্ট সুপরিচিত–আমাদের দৈনন্দিন প্রয়োগে তারা একই অথবা নিকটবর্তী কোনো দ্যোতনা বহন করে। আবার কতিপয় শব্দ/শব্দবন্ধ, যা আমাদের নিত্যদিনের কথোপকথনে বড় একটা উঠে আসে না–কিন্তু শিল্প ও জ্ঞানচর্চার প্রাঙ্গনে হাজিরা দেয় ঘন ঘন– ভবিষ্যতের কথা ভেবে খানিক স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়েই তাদের বঙ্গীকরণ করা হল। 

    শেষ দু-ধরণের কিছু শব্দ ও তাদের বাংলা প্রতিশব্দের একটি তালিকা: 

    অবয়ব – form, আবহ – climate, একাত্ম অনুভব করা – identify, কায়দাকানুন – technique, বস্তুজগৎ – physical reality*, বিষয় – content/subject, মুক্ত আঙ্গিক – open form, সর্বজনীন সংস্কৃতি – common culture, প্রতর্ক**/বাদানুবাদ – discourse, সৃষ্টিশীল অনুঘটক – creative agent

    * এ বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ শ্রী অনিন্দ্য সেনগুপ্তকে (যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্রবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক)

    **দ্রষ্টব্য: গৌতম ভদ্র প্রণীত ন্যাড়া বটতলায় যায় ক’বার (ছাতিম বুকস, ২০১১), পৃ: ৩৭৯-৮০

  • Images of Dreams and Memories: a conversation with Payal Kapadia

    Images of Dreams and Memories: a conversation with Payal Kapadia

    Payal Kapadia has earned recognition as one of the most promising filmmakers of our generation. An alumnus of Film and Television Institute of India (FTII), she has demonstrated her unique vision over a number of experimental films, e.g., Watermelon, Fish and Half Ghost (2013), The Last Mango Before the Monsoon (2015), Afternoon Clouds (2017), And What is the Summer Saying (2018), but her best known work till date is the documentary feature A Night of Knowing Nothing (2021) which also won the Golden Eye Award at Cannes. This film is a poetic homage to the heroic protests led by university students against the forceful intervention of Hindu nationalists in educational spaces. In the face of the endless night that has descended upon our land, Kapadia’s film summoned some of the forlorn spirits of the past by stitching together stray memories, nightmares and dreams. The following conversation reveals her passionate commitment toward the project of undoing all the prevailing norms of industrial cinema and navigating through unfamiliar territories of audiovisual experience–where generic divisions between fiction and nonfiction often cease to exist.

    Counter shot: We would like to begin with your 2015 film, The Last Mango Before the Monsoon, which has been recently screened on the Youtube channel of theCircle. Last Mango.. is an eighteen-minute-long experimental film, it sets out with the sound of ocean waves thrashing somewhere off-screen. We see a woman savoring mango slices alone in her room. Later it is revealed what we have been witnessing was the woman’s dream, where her husband visited with her and asked her to prepare his favorite dish. It is very difficult to reduce the film to a single plot, as there is no straightforward story as such. Instead, we are presented with a set of episodes that are only tangentially connected, if at all. Can you describe how the film came to you? Did you start with a method of free association of fragments? Or did the concept/theme come first, and then you looked for a concoction of the corresponding pattern of sound and image?

    Payal Kapadia: This film was made in 2014 and like all my projects, this one also didn’t start as a planned film. I had a friend who worked with the Shola Trust in Gudalur and he used to send me images that they had captured through camera traps. They were usually animal footages shot in night vision. I was very intrigued by these images as I didn’t know much about this kind of work before. I was very moved by how harmless and fragile even large animals in the wild can seem. There was something very poetic about these very scientific images. Meanwhile, my grandmother had been losing her memory and having dreams about visits from her husband who had died many years ago. To make her remember, I had encouraged her to write a diary of her dreams and memories. She could not remember things she did yesterday but her past from many years ago was crystal clear to her because it was associated with specific memories. I started thinking about documenting memories as well as the present in the form of camera traps. Somehow I found there to be a connection. 

    Counter shot: The forest is a prominent presence in Last Mango.., it makes its appearance as two government staff go to install a camera to monitor wild animals, and then it acquires an autonomous existence beyond the adventure of the two men. How did you come up with that sequence?

    Payal Kapadia: The stories I read from the Shola Trust website and some more about the conflict between elephants and people in this area was the start of the whole film. 

     We tend to romanticize nature but it is the most brutal force. I wanted to generate that fear of nature through these two men. 

    Poster of The Last Mango Before the Monsoon

    Counter shot: You have superimposed and inserted some animated shots with your video footage, which also reminded us of some of the recent works of Amit Dutta and Mehdi Jahan. Is there any aesthetic reason for using them that is specific to this film and its theme?

    Payal Kapadia: Since my very first film Watermelon, Fish and Half Ghost (2013) I have been using drawings and animations in my films. It’s how I like to work with film, as a medium layered with different images. Working on film for me is like stitching a collage of things that come together to form a larger whole. Like making a patchwork quilt that is built from smaller, unrelated bits of fabric but when you put these scraps together, a larger image can be formed.

    Counter shot: Your 2021 film, A Night of Knowing Nothing is about the student protests that took place against the rise of Hindu Nationalist forces in India over the last few years, as well as its impact on major educational institutions, in form of saffronisation of the managerial bodies, cutting off of subsidies, quelling of dissent, and an overall demoralisation of any alternative discourse. But it is also a very intimate and personal narrative, in the sense that we come across all these events through a character’s (L) voice; her letters give us an entry to this recent history. What drove you to this type of narration which is, to put it very simply, a melange of intimate memories and historical events? 

    Payal Kapadia: We began shooting in 2016. Ranabir (the cinematographer and editor) and I started to document life around us at FTII where we were students then, and through that, we started documenting our friends. Over the years we shot extensively but were not always sure of what we were doing but because it was amongst people we knew well, the shooting process was intimate and casual.  Some time passed and there was still no real sense of what the film would be. All we had were the memories that we were collecting with our small camera and sound recorder. Through these documentations, and testimonies of our friends, their dreams, memories, and anxieties, an image of a section of the youth began to emerge.

    Many years passed and some of our friends gave us footage that they had shot in other universities. By then, protests were taking place across the country. They shot it because they had a pressing need to document, but like us, they were unsure of what they wanted to do with it. We began to find more and more of such footage – rushes borrowed from friends, old family archives, and viral videos off the internet. Our collected images became an ever-growing archive of memories – memories of the time that we had lived and witnessed. Soon, even the footage we had shot, began to feel as if it were ‘found’. We began to devise a narrative to connect all these seemingly unrelated images.

    I started to think about the idea of a found footage film and got in touch with my friend Himanshu Prajapati, who is also a writer and filmmaker. We had been classmates at FTII. We began to come up with a fictional narrative to hold all these seemingly different types of footage to create a narrative.

    A Night of Knowing Nothing (2021)

    Counter shot: It appears to us that A Night of Knowing Nothing marks a clear departure from your earlier style – be it in terms of tone and texture of the image, or the way you framed a fictional narrative to tell a series of non-fictional actual events, etc. Have you already got it planned before making the film? Or did everything fall together during the actual process of production?

    Payal Kapadia: This film had a much more organic working style from my previous work. As I was doing this project with a very small group of people and very basic camera, the images would be of a certain nature. It was also shot by many people with their own gaze and motivations. Perhaps the style evolved from this. I feel myself drawn to this kind of filmmaking more and more now. I am excited by the sense of something more hybrid where fiction and non-fiction can mix freely. 

    Counter shot: When did you decide to use the marriage video footage in the film? Was it there in the screenplay?

    Payal Kapadia: There was no screenplay to start with as the film was evolving in the filmmaking and editing process. We chanced upon some 8mm film archives which were uploaded on a website called Pad.ma which is run by the artist collective CAMP. When we saw that footage of the marriage, it connected very well with one of the dreams we had recorded of our friend Mukul. So we decided to use it together – using image and sound as the process of montage. 

    Counter shot: We are really intrigued by the image texture you used in this film. On the one hand, it has the look of 16mm – which once stood as an alternative to the 35mm standard film look. Needless to say, this position is political in the philosophical sense of the term. On the other hand, several filmmakers (like Jonas Mekas, for instance) have used this texture for their own personal kind of ‘diary film’ – which has interesting affinities with your project. Again, after the digital turn, we have saturated ourselves with this home-video look – the internet is full of them. So, have you been inspired by any of them? We want to know how you conceived, and if possible, created this texture at the time of work.

    Payal Capadia: We were very much inspired by French New Wave films from the 1960s as well as old Soviet Cinema. We were especially inspired by Chris Marker. We wanted to shoot our campus with that grainy style and 1.33 aspect ratio to evoke those films. Ranabir used some basic filters to make a template for the style. After that we worked with the colour grader Mr. Lionel Kopp, who helped us achieve this look. He is a true artist. He uses colour grading like a painter. This helped us a lot.

    A Night of Knowing Nothing (2021)

    Counter shot: The film has a very loose structure; the sequence of images does not follow a cause-effect pattern. It is L’s voice that seems to give it a framing narrative. It also uses sound freely, mixing up the sounds of bells, crickets, wind, rain, distant thunder, etc. We are curious about how you came up with this sound design.

    Payal Kapadia: Working with sound that is evocative rather than illustrative is exciting for me. We wanted to create a sound design that does not always go in synch with the images but creates a narrative of its own. The hope was that sound and images that are disjointed would be then juxtaposed to create another image in the viewer’s mind – to also become a form of montage. 

    Counter shot: The space of FTII is quite crucial for the film’s unfolding. The footage of the protests, the writings on the wall – slogans, posters, graffiti – the whole ambience of the space convey to us a utopian imagination long embedded in the institution’s project. What immediately comes to our mind is the Indian New Wave (1960s-80s), which is entangled with the history of this space. Can you please talk a little bit about how you came up with the idea of making a film about this institution, about the experiences which inspired you to make such an intimate portrait of it, and the way you did it?

    Payal Kapadia: Spaces like FTII were made so that everyone in this country can have access to making films regardless of their economic and social background. This was important for us to talk about in the film. One of the early teachers at FTII was Ritwik Ghatak and his films and ideology helped the film school also get a certain ideology.  As we were students there, we felt the need to document our campus. Personally, going through the long strike really changed me as a person and my political thought. I wanted to pay homage to a space that did that. Our public institutions are spaces of free thought and dissent. Although there are many problems within them and what they have managed to achieve, they at least give space for thoughts and ideas to blossom and raise questions. Perhaps this is why our governments feel so afraid of them!

    A Night of Knowing Nothing (2021)

    Counter shot: What is your next project? Are you interested in making a narrative feature film in the future, like Chauthi Koot (Gurvinder Singh, 2015)?

    Payal Kapadia: Yes, I am currently in the process of making a fiction film as well.

    Counter shot: What would be your advice to those independent filmmakers who may not have any institutional training in filmmaking, but are enthusiastic to make films without adhering to the mainstream commercial format? We ask this question because unlike in the 1970s and 80s, there are not many organized spaces for discussing alternative cinema which might help us cultivate a taste for non-mainstream, nonindustrial art forms. On the contrary, we are facing an onslaught of images every second from each direction which has a numbing effect on our senses. How, as artists and filmmakers, can we preserve our sensibilities to offer images that are nonconformist, imaginative, and at the same time, healing?

    Payal Kapadia: I agree with you that we are now consuming images all the time. We cannot escape it. Maybe that should be the reason that independent filmmakers push even harder to challenge the conventions of form. But now the thing that is very freeing for us is that technology has become cheaper. With very good mobile phones, we can make films. So the best thing is to keep practising and keep making. Everything may not be a complete film but maybe it’ll lead you to something else. Always having an end in sight may not be the only method for making films! I would recommend for everyone to read an essay by Godard – https://www.diagonalthoughts.com/?p=1665 which talks about making a film politically. 

    And about cultivating a taste for non-industrial cinema – One way is to keep watching contemporary films from around the world that are doing formalistic experiments. Check festivals and see their lineups then try and find those films online or even write to filmmakers for links! Filmmakers can be really accessible! 

    On the other hand, if one wants to make mainstream cinema intelligently, it is also very difficult but the need of the hour! In fact, this is more difficult as there are so many factors to consider. But more important too as these films reach out to so many more people. 

    We are deeply indebted to Abhradeep Gangopadhyay (curator, theCircle). Without his cooperation this interview would have been impossible

    উপরের সাক্ষাৎকারটির বাংলা অনুবাদ পড়তে ক্লিক করুন এখানে / Click here to read the Bengali translation of this conversation

  • স্বপ্ন ও স্মৃতির ছবিঃ চিত্রনির্মাতা পায়েল কাপাডিয়ার সাথে কথোপকথনে কাউন্টার শট

    স্বপ্ন ও স্মৃতির ছবিঃ চিত্রনির্মাতা পায়েল কাপাডিয়ার সাথে কথোপকথনে কাউন্টার শট

    পায়েল কাপাডিয়া বর্তমান ভারতবর্ষের একজন উল্লেখযোগ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট চিত্রনির্মাতা। ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইন্সটিটিউট অফ ইন্ডিয়ার(FTII) ডিরেকশন অ্যান্ড স্ক্রিনপ্লে রাইটিং-এর প্রাক্তনী পায়েল আফটারনুন ক্লাউডস (২০১৩), আ নাইট অফ নোয়িং নাথিং (২০২১), দা লাস্ট ম্যাংগো বিফোর দা মনসুন (২০১৫)-এর মতো একাধিক ছবি তৈরি করেছেন। সারা দেশ জুড়ে চলতে থাকা উগ্র হিন্দুত্ববাদের  উত্থানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং এফটিআইআই-এর দিনরাত্রি নিয়ে তৈরি ডকুমেন্টারি ছবি আ নাইট অফ নোয়িং নাথিং-এর জন্য ২০২১ সালে কান ফিল্ম ফেস্টিভালে গোল্ডেন আই অ্যাওয়ার্ড জেতেন এই পরিচালক। এর আগেও ২০১৭ সালে কান ফিল্ম ফেস্টিভালে দেখানো হয়েছিল পরিচালকের আফটারনুন ক্লাউডস। ইমেজের দুনিয়ায় হাবুডুবু খেতে থাকা বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে পায়েল ইমেজ ও সাউন্ড নিয়েই নানাবিধ পরীক্ষানিরীক্ষা করে যেতে চান। কাউন্টার শট-এর সাথে কথোপকথন সূত্রে প্রকাশ্যে আসে ইমেজ নির্মাণের খুঁটিনাটি সম্বন্ধে পায়েলের গভীর অনুসন্ধিৎসার পরিচয়- “ইদানিং ছবি বানানোর এই পদ্ধতিটা আমাকে ভীষণভাবে টানছে। হাইব্রিড একটা কিছুর ধারণা যেখানে ফিকশান ও নন ফিকশান খুব সহজে এসে মিশতে পারে- এই ভাবনায় আমি বেশ উত্তেজিত বোধ করছি”।

    পায়েল কাপাডিয়ার সাথে আমাদের এই কথোপকথন ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন আমাদেরই পত্রিকার সহ সম্পাদক লাবণ্য দে। ওঁর কথায়-

    অনুবাদকের কথাঃ

    এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে কাপাডিয়া একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চিত্রনির্মাতা এবং ওঁর কাজ আমাদের সিনেফিল সত্তাটিকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছে। আ নাইট অফ নোয়িং নাথিং(২০২১) কেবল একটি ছবিই নয়- বরং আমাদের ছাত্রাবস্থার এক জীবন্ত দলিল। যে সময় আমাদের ভেঙেছে, গড়েছে, ভাবিয়েছে এবং নতুন এক সত্তার নির্মাণে সাহায্য করেছে।

    পায়েলের সাথে হওয়া ইমেল কথোপকথন বাংলায় অনুবাদ করবার অভিজ্ঞতা মনে রেখে দেওয়ার মতো। এই ছবি এবং কাপাডিয়ার সাথে কথাবার্তা আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে আমার যাদবপুরের ছাত্রাবস্থার দিনগুলিতে যেখানে অ্যাডমিশান টেস্ট তুলে দেওয়ার বিপক্ষে, ইউনিয়ন ভেঙে কাউন্সিল করবার বিপক্ষে আর দেশজুড়ে এনআরসি সিএএ এর প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছিলাম আমরা- মাটি কামড়ে পড়েছিল আমাদের রাতজাগা বন্ধুর দল। অনুবাদ করতে গিয়ে প্রতিটা লাইন নিয়ে বারবার বসতে বসতে আরেকবার সেই রাতগুলোকে বেঁচে নিচ্ছিলাম যেন। আরেকবার ছবিতে আর কথায় আর ইনকিলাব শব্দের গর্জনে যাপন করে নিচ্ছিলাম আমাদের উঠতি বয়সের স্বপ্ন, স্মৃতি আর ভঙ্গুরতাগুলোকে।   

    কাউন্টার শটঃ সম্প্রতি The Circle -এর ইউটিউব চ্যানেলে স্ক্রিনিং হয়েছে আপনার ২০১৫ সালের ছবি দা লাস্ট ম্যাংগো বিফোর দা মনসুন। এখান থেকেই কথাবার্তা শুরু করা যাক যাক। অফস্ক্রিনে সমুদ্রের ঢেউ-এর আওয়াজ দিয়ে আঠারো মিনিটের এই এক্সপেরিমেন্টাল ফিল্মটির সূত্রপাত। স্ক্রিনে আমরা দেখি একা একজন মহিলাকে, খুব তৃপ্তি করে তাঁর ঘরে বসে আম খাচ্ছেন। ক্রমশ বোঝা যায়, হয়তো আমরা তাঁর স্বপ্নের মধ্যে রয়েছি। মহিলার স্বপ্নে তাঁর স্বামী মহিলাটিকে নিজের প্রিয় খাবার রান্না করে দিতে বলেন। যদিও ছবিটি কোনো একরৈখিক ন্যারেটিভ অনুসরণ করেনা- তাই একে এমন একরৈখিক প্লটলাইনে বেঁধে ফেলাও খুবই কঠিন। এখন এই ছবিটা আপনার কাছে কীভাবে এলো সেই ব্যাপারে একটু জানতে চাই। টুকরো টুকরো ছবি এবং ভাবনা জুড়তে জুড়তে এই কাজের সূত্রপাত, নাকি সম্পূর্ণ ভাবনাটি আগে আসে এবং তারপর সেই ভাবনার সাথে সাযুজ্যপূর্ণ শব্দ এবং ইমেজ মিশিয়ে দেন? 

    পায়েল কাপাডিয়াঃ ছবিটা তৈরি হয় ২০১৪-এ। আমার অন্যান্য কাজের মতোই এটাও আগে থেকে খুব ভেবেচিন্তে শুরু করিনি। আমার এক বন্ধু তখন তামিলনাড়ুর গুদালুর এ শোলা ট্রাস্ট এ কাজ করছিলো। ওখানে ক্যামেরা ট্র্যাপে যেসব ছবি উঠতো, ও সেগুলো আমাকে পাঠাতে থাকতো। ছবিগুলো ছিলো মূলত নাইট ভিশান এ শ্যুট করা বন্য জন্তুদের। তার আগে আমি এই ধরনের কাজের সাথে খুব একটা পরিচিত ছিলাম না, তাই ওই ইমেজগুলো আমাকে ভীষণ কৌতূহলী করে তুলেছিলো। বৈজ্ঞানিক ইমেজগুলোয় কি অদ্ভুত এক কাব্যিক দ্যোতনা! ভয়ঙ্কর সব জন্তু জানোয়ারদের বনের মধ্যে এমন নিরীহ অসহায় অবস্থায় দেখাটা আমাকে বেশ নাড়া দিয়ে গেছিলো। ইতিমধ্যে আমার দিদিমার ক্রমশ স্মৃতিভ্রংশ হতে থাকে। স্বপ্নে উনি বহু বছর যাবৎ মৃত স্বামীকে দেখতে পান। ঠিক আগেরদিনের কথা মনে রাখতে না পারলেও, বহুকাল আগের অতীতের ঘটনা তাঁর বেশ স্পষ্ট মনে পড়ত, যেহেতু সেগুলো বিশেষ কিছু স্মৃতির সাথে জড়িয়ে ছিল। স্বপ্ন আর স্মৃতিগুলোকে নিয়ে আমি দিদিমাকে ডায়েরী লেখার উস্কানি দি- যাতে করে এখন যা ঘটছে সেগুলোকে আবার পরে ভুলে না যান। ক্যামেরা ট্র্যাপ এর ফর্ম আর স্মৃতি- এই বিষয় দুটোর মধ্যে আমি একটা সংযোগ খুঁজে পাচ্ছিলাম। তাই তখন থেকেই ক্যামেরা ট্র্যাপের ফর্মের মধ্যে দিয়ে বর্তমান ও অতীতের স্মৃতিকে ডকুমেন্ট করবার পরিকল্পনা শুরু করে দিই। 

    কাউন্টার শটঃ দা লাস্ট ম্যানগো বিফোর দা মনসুন -এ জঙ্গলের এক জোরালো উপস্থিতি রয়েছে। ছবিতে দুজন সরকারী কর্মচারী বন্য জন্তুদের পর্যবেক্ষণের জন্য জঙ্গলে একটি ক্যামেরা লাগিয়ে আসে। এবং এরপর দুজনের অ্যাডভেঞ্চার ছাপিয়ে ক্যামেরার এক স্বয়ংক্রিয় অস্তিত্ব প্রকাশ পায়। এই সিকোয়েন্সটি কীভাবে আপনার মাথায় এলো? 

    পায়েল কাপাডিয়াঃ শোলা ট্রাস্ট ওয়েবসাইট ও আরো কিছু জায়গা থেকে পড়া এ অঞ্চলের জঙ্গলে হাতি আর স্থানীয় মানুষের সংঘর্ষের গল্পগুলো থেকেই আমার ছবির শুরু। প্রকৃতিকে রোমান্টিসাইজ করবার একটা ঝোঁক আমাদের মধ্যে রয়েছে, কিন্তু প্রকৃতির মধ্যেই রয়েছে সবথেকে হিংস্র শক্তি। প্রকৃতির এই বিভীষিকাকে ওই দুজন মানুষের মধ্যে দিয়ে আমি ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছি। 

    পোস্টারঃ দা লাস্ট ম্যাংগো বিফোর দা মনসুন

    কাউন্টার শটঃ আপনার ভিডিও ফুটেজগুলোর মধ্যে বেশ কিছু অ্যানিমেটেড শট রাখা হয়েছে, কখনো কখনো শটগুলোকে সুপারইমপোজ-ও করা হয়েছে, যা আমাদের অমিত দত্ত, মেহদি জাহান এবং আরো অনেকের সাম্প্রতিক কাজের কথা মনে করায়। এই নির্দিষ্ট ফিল্ম এবং এর থিম-এর সাপেক্ষে অ্যানিমেটেড শট ব্যবহার করবার কোনো বিশেষ নান্দনিক কারণ ছিল কি?

     
    পায়েল কাপাডিয়াঃ
    ২০১৩-তে আমার সর্বপ্রথম ছবি ওয়াটারমেলন ফিশ অ্যান্ড হাফ ঘোস্ট থেকেই আমি ফিল্মে হাতে আঁকা ছবি আর অ্যানিমেশান ব্যবহার করা শুরু করি। এইভাবে ফিল্মে কাজ করা আমার পছন্দের। ফিল্ম এমনই এক মিডিয়াম, যেখানে বিভিন্ন ইমেজ স্তরে স্তরে বিন্যস্ত- বিভিন্ন জিনিসের কোলাজ বুনতে বুনতে এক সম্পূর্ণতার দিকে পৌঁছানোর মতো। এটা অনেকটা কাঁথা বোনার মত, যেটা কিনা অনেকগুলো ছোটো ছোটো কাপড়ের টুকরো দিয়ে বোনা হয় যাদের মধ্যে কোনো যোগসূত্র থাকে না, কিন্তু সবগুলো টুকরোকে একসাথে আনা মাত্র একটা বড়োসড়ো ছবি ফুটে ওঠে। 

    কাউন্টার শটঃ শেষ এক দশক জুড়ে গোটা ভারতবর্ষে উগ্র হিন্দুত্ববাদী ক্ষমতার উত্থানের প্রতিক্রিয়ায় যেসব ছাত্র আন্দোলনগুলো হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এই উত্থানের প্রভাব নিয়ে আপনার ২০২১-এর ছবি আ নাইট অফ নোয়িং নাথিং। উচ্চপদগুলির গেরুয়াকরণ, ভর্তুকি কমিয়ে দেওয়া, ভিন্নমত গ্রহণে অক্ষমতা এবং যেকোনো বিকল্প প্রতর্কের প্রতি আক্রমণের মতো বিষয়গুলি আপনার ছবি জুড়ে রয়েছে। আবার একইসাথে ছবিটির ন্যারেটিভ ভীষণ ব্যক্তিগত ও আন্তরিক। আমরা ছবিতে এত সব ঘটনা সম্বন্ধে জানতে পারছি ছবির ‘এল’ নামক চরিত্রের ভয়েসওভারের সূত্রে, তার চিঠিপত্র থেকে সাম্প্রতিক ইতিহাসের এই বিশেষ সময়ের একটা প্রবেশদ্বার উন্মুক্ত হয়ে যাচ্ছে আমাদের সামনে।ঠিক কোন বিষয়টি আপনাকে ইতিহাস এবং ব্যক্তিগত স্মৃতিকে মিলিয়ে এই ন্যারেটিভ তৈরিতে উস্কানি দিয়েছিলো? 

    পায়েল কাপাডিয়াঃ ২০১৬ থেকে আমি আর রণবীর(ছবিটির আলোকচিত্রশিল্পী ও সম্পাদক) এফটিআইআইকে কেন্দ্র করে  আমাদের রোজকার জীবন আর চারিপাশের বন্ধুবান্ধবদের শ্যুট করা শুরু করি। আমরা তখন ওখানেই পড়ছি। বেশীরভাগটাই আমাদের চেনা পরিসর বলে আমরা খুবই ক্যাজুয়াল এবং ইন্টিমেট পদ্ধতিতে শ্যুট করছিলাম। ছোট্ট একটা ক্যামেরা আর সাউন্ড রেকর্ডারের মধ্যে স্মৃতিগুলোকে ধরে রাখছিলাম কিন্তু আদপে ছবিটা যে কি দাঁড়াবে সেটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এই ডকুমেন্টেশানের মধ্যে দিয়ে সোচ্চার হচ্ছিলো আমাদের বন্ধুদের আর একটা উঠতি সময়ের স্বপ্ন, স্মৃতি আর ভঙ্গুরতার ইমেজ। 

    এসবের বেশ কয়েক বছর পরে আমাদের অন্যান্য বন্ধুরা তাদের নিজের নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে তোলা বেশ কিছু ফুটেজ আমাদেরকে দেয়। আমাদের মতোই ওরা জানতো না ওই ফুটেজগুলো নিয়ে ঠিক কি করা যেতে পারে। তখন উত্তাল সময়- সারা দেশ জুড়ে তখন প্রতিরোধ আর প্রতিবাদ মিছিল। কেবল জ্বলজ্যান্ত সময়কে খোদাই করে রাখবার তাগিদ থেকেই ওরা এই কাজ করছিলো। বন্ধুদের থেকে ধার করে, পরিবারের পুরোনো কাগজপত্র ঘেঁটে এবং ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়ে যাওয়া ভিডিওগুলো থেকে আমরা এরকম আরো অনেক ফুটেজ খুঁজছিলাম। যেই সময়কে দেখতে দেখতে আর বাঁচতে বাঁচতে আমরা এগিয়ে চলেছিলাম- ইমেজের পর ইমেজ জড়ো করে আমরা সেই সময়ের স্মৃতির আর্কাইভ তৈরি করে রাখছিলাম। ইতিমধ্যে আমাদের তোলা ফুটেজগুলো দেখে মনে হচ্ছিলো ওইগুলো ও যেন কোথাও থেকে ‘হঠাৎ করে খুঁজে পাওয়া গেছে’। এই সমস্ত আপাত সম্পর্কহীন ‘found footage’ সুলভ ইমেজগুলোকে জুড়ে আমরা একটি ন্যারেটিভ তৈরির দিকে অগ্রসর হতে থাকি। 

    এই ‘found footage’ ফিল্ম বানানোর আইডিয়া নিয়ে আমার লেখক ও ফিল্মমেকার বন্ধু হিমাংশু প্রজাপতির সাথে যোগাযোগ করি। এফ টি আই আই তে আমরা একসাথে পড়তাম। আমাদের মাথায় একটা গপ্পো দানা বাঁধছিলো- যার মধ্যে এই আপাত সংযোগহীন ভিডিও ফুটেজগুলোকে একসূত্রে গাঁথা যায়। 

    আ নাইট অফ নোয়িং নাথিং(২০২১)

    কাউন্টার শটঃ আমাদের মনে হয়েছে যে আ নাইট অফ নোয়িং নাথিং -এ ইমেজ তৈরির টেক্সচার, ছবির টোন, ফিকশানাল ন্যারেটিভ দিয়ে নন ফিকশানাল ন্যারেটিভ গাঁথা- সমস্তটাই আপনার ছবি তৈরির আগেকার ঘরানার থেকে চোখে পড়বার মতো আলাদা। এই ছক ভেঙে বেরিয়ে আসাটা কি আপনার পূর্ব পরিকল্পিত নাকি ছবি বানাবার প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে উন্মোচিত হয়? 

    পায়েল কাপাডিয়াঃ আগের ছবিগুলোর তুলনায় এই ছবিটার শৈলী অনেক অর্গ্যানিক ভাবে তৈরী হয়েছে। খুব সাধারণ ক্যামেরা আর অল্পসংখ্যক লোকজন নিয়ে শ্যুট করছিলাম বলে ইমেজগুলোয় একটা বিশেষত্ব দেখা দিচ্ছিলো। বিভিন্নজন তাদের ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী এবং উদ্দেশ্য মাথায় রেখে এই ইমেজগুলো রূপ দিচ্ছিলেন, তাই থেকেই হয়তো স্টাইলটা এতখানি বদলে গিয়েছে।
    ইদানিং ছবি বানানোর এই পদ্ধতিটা আমাকে ভীষণভাবে টানছে। হাইব্রিড একটা কিছুর ধারণা যেখানে ফিকশান ও নন ফিকশান খুব সহজে এসে মিশতে পারে- এই ভাবনায় আমি বেশ উত্তেজিত বোধ করছি।   

    কাউন্টার শটঃ ছবির মধ্যে বিয়ের ভিডিও ফুটেজ রাখবার কথা আপনি কখন ভাবলেন? এটি কি ছবির চিত্রনাট্যের মধ্যেই ছিলো?

    পায়েল কাপাডিয়াঃ সত্যি কথা বলতে কি, আমাদের কাছে শুরুতে কোনো চিত্রনাট্য ছিলো না- ফিল্মমেকিং এবং ছবি সম্পাদনার প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়েই ছবির গল্প এবং কাঠামো ক্রমশ একটা আকার নিচ্ছিল। CAMP আর্টিস্ট কালেকটিভের ওয়েবসাইট Pad.ma থেকে আমরা কিছু ৮মিলিমিটার ফিল্ম আর্কাইভের সন্ধান পাই। আমাদের বন্ধু মুকুলের যে স্বপ্ন আমরা রেকর্ড করেছিলাম- তার সাথে এই ফুটেজগুলো ভারী সুন্দর খাপ খাচ্ছিলো। তখনই ঠিক হলো এই সাউন্ড এবং ইমেজকে ছবিতে একসাথে মন্তাজের মতো করে ব্যবহার করা হবে।

    কাউন্টার শটঃ এই ছবিতে আপনার ব্যবহার করা ইমেজের টেক্সচারটি আমাদেরকে খুবই নাড়া দিয়ে যায়। একদিকে, এই ইমেজগুলোর মধ্যে ১৬ মিলিমিটার ইমেজের একটা লুক রয়েছে- যা এককালের ৩৫ মিলিমিটার স্ট্যান্ডার্ড ফিল্ম লুকের প্রায় বিকল্প একটা অবস্থানে ছিল। বলা বাহুল্য এই অবস্থানটি যে রাজনৈতিক, যেভাবে দর্শনশাস্ত্রে রাজনীতি শব্দটাকে ব্যবহার করা হয়। অপরদিকে, অনেক ফিল্মমেকার(যেমন জোনাস মেকাস) এই টেক্সচারটি ব্যবহার করেছেন তাদের ব্যক্তিগত মোড এর ছবি ‘ডায়েরী ফিল্ম’ বানাতে গিয়ে, যার সাথে আপনার ছবিটির এক ইন্টারেস্টিং যোগসাজশ রয়েছে। আবার ডিজিটাল আসবার পর আমরা হোম-ভিডিও লুক এর ইমেজে আকন্ঠ ডুবে রয়েছি- ইন্টারনেট ছেয়ে গিয়েছে এইসব ইমেজে। আপনি কি এগুলোর কোনোটির দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন? আপনি ঠিক কীভাবে ভাবছিলেন এবং যদি সম্ভব হয়- প্রোডাকশনের সময় কীভাবে এই ধরণের টেক্সচার তৈরি করেছিলেন, তা যদি একটু বলেন।   

    পায়েল কাপাডিয়াঃ আমরা ১৯৬০ এর দশকের ফরাসি নিউ ওয়েভ ছবি এবং পুরোনো সোভিয়েত সিনেমা দ্বারা ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত ছিলাম।  বিশেষত ক্রিস মার্কারের ছবি! ওই ছবিগুলোর স্মৃতিকে উস্কে দেওয়ার জন্যই আমরা 1.33 আসপেক্ট রেশিও-এ গ্রেনি স্টাইলে ক্যাম্পাসের ছবি তুলতে চেয়েছিলাম। এই স্টাইলটার একটা টেমপ্লেট তৈরি করতে রণবীর কিছু বেসিক ফিল্টার ব্যবহার করে। এরপর আমরা কালার গ্রেডার লিওনেল কপ এর সাথে কাজ করি। কপ একজন সত্যিকারের শিল্পী- চিত্রকারের মতো ওনার কালার গ্রেডিং। ওনার সাহচর্যে এই লুকটা আনতে অনেকটা সুবিধে হয় আমাদের। 

    আ নাইট অফ নোয়িং নাথিং (২০২১)

    কাউন্টার শটঃ ফিল্মের কাঠামোটি খুবই আলগা- ইমেজের সিকোয়েন্স ঠিক কার্যকারণ সম্পর্ক মেনে তৈরি নয়। ‘L’-এর ভয়েস ন্যারেটিভটার মোটামুটি একটা কাঠামো দেয়। শব্দকে ভীষণই খোলামেলাভাবে ব্যবহার করতে দেখা যায়- শব্দে মিশে থাকে ঘন্টা, ঝিঁঝিঁ পোকা, হাওয়া, বৃষ্টি এবং দূরের বজ্রপাতের আওয়াজ। সাউন্ড ডিজাইনের এই ভাবনাটি কিভাবে আপনার কাছে এলো তা জানতে আমরা বেশ আগ্রহী। 

    পায়েল কাপাডিয়াঃ যেসব শব্দ কেবল বর্ণনা করে তাদের থেকেও আমি সেইসব শব্দগুলোর সাথে কাজ করতে বেশী উৎসাহী যা মনের মধ্যে থেকে কোনো ভাবনা বা অনুভূতিকে উসকে দেয়। সাউন্ড ডিজাইন তৈরি করার সময় সাউন্ডের সাথে সর্বদা ইমেজের সামঞ্জস্য না থাকলেও আমরা চাইছিলাম সাউন্ডের যেন নিজস্ব একটা ন্যারেটিভ থাকে। আশা ছিলো মন্তাজের ফর্মের মতো এই আপাত সংযোগহীন সাউন্ড এবং ইমেজের ঘাতপ্রতিঘাতে দর্শকের মনে নতুন আরেক ইমেজ জন্ম নেবে।

    কাউন্টার শটঃ ফিল্মটির বিস্তারের জন্য এফ টি আই আই-এর স্পেসটি ভীষণ জরুরি ছিলো। আন্দোলনের ফুটেজ, দেওয়াল-লিখন, স্লোগান, পোস্টার, গ্রাফিতি এবং সামগ্রিক স্পেসটির আবহ এই প্রজেক্টের মধ্যে গেঁথে থাকা এক ইউটপিক কল্পনাকে ব্যক্ত করে। প্রথমেই মাথায় আসে ইন্ডিয়ান নিউ ওয়েভের ইতিহাস- যার ইতিহাস এই স্পেসের ইতিহাসের সাথে সম্পৃক্ত। এফ টি আই আই-কে নিয়ে এমন ফিল্ম বানানোর ভাবনা ঠিক কীভাবেএলো এবং কোন অভিজ্ঞতা আপনাকে এই প্রতিষ্ঠানের এমন নিবিড় পোর্ট্রেট তৈরিতে উদ্বুদ্ধ করলো এবং সেটা ঠিক কীভাবে- সেই নিয়ে যদি কিছু বলেন। 

    পায়েল কাপাডিয়াঃ এফ টি আই আই-এর মতো স্পেস তৈরি করা হয়েছিলো যাতে দেশের যেকোনো মানুষ – কারোর আর্থিক, সামাজিক পরিস্থিতি যাই হোক না কেন – সে যেন ছবি বানানোর সুযোগ পায়। ছবিতে এই বিষয়টা নিয়ে কথা বলার ভীষণ প্রয়োজন ছিলো। এফ টি আই আই এর একদম গোড়ার দিকের শিক্ষক ঋত্বিক ঘটকের ছবি এবং মতাদর্শও ফিল্ম স্কুলের মতাদর্শ খুঁজে পেতে সাহায্য করেছিল। এখানে পড়াকালীন, আমাদের ক্যাম্পাসকে ডকুমেন্ট করবার একটা তাগিদ অনুভব করছিলাম। দিনের পর দিন চলতে থাকা স্ট্রাইক ব্যক্তিগতভাবে আমি মানুষটাকে এবং আমার রাজনৈতিক ভাবনাচিন্তাকে ভীষণরকমভাবে বদলে দিয়েছিলো। যে স্পেসটা আমাকে এইভাবে বদলে দিয়েছিলো তার প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করতে চেয়েছিলাম। আমাদের পাবলিক ইন্সটিটিউশানগুলো খোলামেলা চিন্তাভাবনা এবং মতবিরোধ করার মুক্ত পরিসর। অভ্যন্তরীণ নানাবিধ সমস্যা থাকা সত্ত্বেও এখানে নতুন ভাবনাচিন্তাকে ফুলের পাপড়ির মতো বেড়ে ওঠার সুযোগটুকু দেওয়া হয়- দেওয়া হয় প্রশ্ন করবার অবকাশ। হয়তো এই কারণেই এই স্পেসগুলোকে নিয়ে আমাদের সরকারের এতো ভয়! 

    আ নাইট অফ নোয়িং নাথিং (২০২১)

    কাউন্টার শটঃ আপনার এরপরের প্রজেক্ট কি? ভবিষ্যতে কি আপনার ন্যারেটিভ ফিচার বানানোর ইচ্ছে রয়েছে, চৌথি কুট এর মতো কিছু একটা?

    পায়েল কাপাডিয়াঃ হ্যাঁ, ঘটনাচক্রে এই মুহূর্তে আমি একটি ফিকশান ফিল্মেরই কাজ করছি।  

    কাউন্টার শটঃ প্রাতিষ্ঠানিক ট্রেনিং না থাকা সত্ত্বেও যেসব ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্মমেকাররা মূলধারার বাণিজ্যিক ছবির ধাঁচার বাইরে ছবি বানাতে চান- তাদের জন্য আপনি কি পরামর্শ দেবেন? আমরা এই প্রশ্ন করছি কারণ আজকের দিনে ১৯৭০-৮০ এর মতো অল্টারনেটিভ সিনেমা নিয়ে চর্চার জন্য নিয়োজিত তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো সংগঠিত স্পেস নেই যেগুলো আমাদের নন মেন্সট্রিম, নন ইন্ডাস্ট্রিয়াল শিল্প মাধ্যমগুলো সম্বন্ধে উৎসাহিত করতে পারে। আবার উল্টোদিকে, আমরা প্রতিটা সেকেন্ডে চারিদিক থেকে ইমেজের আক্রমণে যেভাবে জর্জরিত হয়ে আছি, তা আমাদের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলোকে ক্রমশ অবশ করে দেয়। এই মুহুর্তে দাঁড়িয়ে একজন আর্টিস্ট এবং ফিল্মমেকার হিসাবে কিভাবে আমরা বেয়াড়ারকমের ছকভাঙা, কল্পনাপ্রবণ এবং একইসাথে শুশ্রূষার ইমেজের প্রতি সংবেদনশীলতা বজায় রাখবো?

    পায়েল কাপাডিয়াঃ আমি মানছি আমরা এখন সারাক্ষণ ইমেজ কনসিউম করে চলেছি। কিচ্ছু করবার নেই। বরং এই কারণেই ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্মমেকারদের উচিত আরো দৃঢ়ভাবে প্রচলিত রীতিনীতিগুলোকে চ্যালেঞ্জ করবার। তবে প্রযুক্তির দিকটা সস্তা হয়ে যাওয়ায় আমরা অনেকখানি স্বাধীনতা পেয়ে গেছি। খুব ভালো মোবাইল ফোন দিয়ে এখন আমরা ছবি বানিয়ে ফেলতে পারি। সুতরাং, সবথেকে জরুরি ব্যাপার হলো নিরন্তর অনুশীলনের মধ্যে থাকা এবং ছবি বানিয়ে চলা। যাই বানাবো তাই একটা সম্পূর্ণ ছবি হয়ে না উঠলেও দেখা যেতে পারে তাদের থেকে অন্য কোনো একটা কিছু হয়তো বেরিয়ে আসছে। সবসময় একদম শেষ টা ভেবে শুরু করাই ছবি তৈরির একমাত্র পদ্ধতি নয়! এই সূত্রে আমি সবাইকে গোদারের একটা প্রবন্ধ (https://www.diagonalthoughts.com/?p=1665 ) (এই প্রবন্ধটির বাংলা অনুবাদ) পড়তে বলবো যেখানে রাজনৈতিকভাবে কী করে ছবি বানানো যায় সেই নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। 

    আর নন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ছবির রুচি তৈরি করার জন্য- প্রথমত, এই মুহূর্তেবিশ্বজুড়ে ফর্ম নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করছে এমন যাবতীয় ছবিগুলো দেখতে থাকো। বিভিন্ন ফিল্ম ফেস্টিভালগুলোতে ছবির তালিকা অনুযায়ী অনলাইনে সেই ফিল্মগুলোর খোঁজ করো বা ফিল্মমেকারদের কাছে তাদের ছবির লিংক চেয়ে চিঠি লেখ। ফিল্মমেকারদের সাথে কিন্তু চাইলেই যোগাযোগ করা যায়!

    অন্যদিকে কেউ যদি এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে বুদ্ধিদীপ্তভাবে মূলধারার ছবি বানাতে চাও- সেটাও খুবই শক্ত কাজ, কিন্তু এই সময় দাঁড়িয়ে জরুরি। এবং কেবল জরুরিই না-  কাজটা অনেক বেশী শক্তও কেননা এই ধরনের ছবি বানানোয় অনেকগুলো বিষয় একসাথে মাথায় রাখতে হয়। ছবিগুলো যেহেতু অনেক বেশী সংখ্যক মানুষের কাছে ছড়িয়ে পড়ে- তাই এদের গুরুত্বও অধিক।  

    এই কাজটিতে কাউন্টার শট-এর পাশে থাকার জন্য বিশেষ ধন্যবাদ অভ্রদীপ গঙ্গোপাধ্যায়কে (কিউরেটর, theCircle)।

    উপরের সাক্ষাৎকারটি মূল ইংরেজিতে পড়তে ক্লিক করুন এখানে / Click here to read the conversation in English

  • আড্ডায় ওয়েস্টার্নঃ সঙ্গে অরূপরতন সমাজদার (পর্ব ২)

    আড্ডায় ওয়েস্টার্নঃ সঙ্গে অরূপরতন সমাজদার (পর্ব ২)

    সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন এখানে

    সায়ন্তন: আমার পরের প্রশ্ন ওয়েস্টার্নের রাজনৈতিক থিম নিয়ে। ওয়েস্টার্ন নিয়ে আলোচনা করতে গেলেই বারবার ম্যানিফেস্ট ডেস্টিনির প্রসঙ্গ চলে আসে। বিশেষ করে প্রথম দিকের একের পর এক ওয়েস্টার্ন ছবিতে সাম্রাজ্যবাদ আর ঔপনিবেশিক জবরদখলের প্রতি ঘোষিত সমর্থন আছে। তাহলে আজকের দিনে বসে – যখন আমরা এই ব্যাপারগুলো নিয়ে অনেক বেশি সচেতন – ওয়েস্টার্নের মত আপাতদৃষ্টিতে ভয়ানক প্রবলেমেটিক একটা জঁরকে কি আদৌ অ্যাপ্রিসিয়েট করা যায়? করলে কীভাবে করব? প্রশ্নটা যেকোনো মার্কিন জঁর নিয়েই করা যেত, কিন্তু আলোচনাটা যেহেতু ওয়েস্টার্ন নিয়ে – আর ওয়েস্টার্নে এই জবরদখলের গল্পকেই যেহেতু ওরিজিন মিথ হিসেবে তুলে ধরা হয় –

    অরূপরতন: এটা ওয়েস্টার্নের একটা প্রবলেমেটিক দিক, এখনই এর যুৎসই উত্তর দিতে পারব কিনা জানি না। আমার মাস্টার্স ডিসার্টেশনে আমি একটা আর্গুমেন্ট করেছিলাম – সেটা এখন করলে হয়তো আরো মাপজোক করে করতাম: এমনটা বলাই যায় যে আসলে সব আমেরিকান ছবিই ওয়েস্টার্ন, এধরণের হোলিস্টিক আর্গুমেন্ট মাথায় আসতেই পারে। যেমন লিন্ডা উইলিয়ামসের একটি বই, প্লেয়িং দ্য রেস কার্ড (২০০১, প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি প্রেস) -এ দাবি করা হয়েছে যে সব আমেরিকান ছবি আদতে মেলোড্রামা। এরকম হোলিস্টিক তর্ক গা-জোয়ারি করে চাপিয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু তার অনেক সমস্যা আছে। ওয়েস্টার্নের মৌলিক বিশেষত্ব হিসেবে যেগুলোকে ধরে নেওয়া হয়, যেমন আমেরিকান আইডেন্টিটির প্রাণ প্রতিষ্ঠা, একধরণের কমিউনিটি আর কিনশিপকে তুলে ধরা, সেগুলো ওয়েস্টার্ন নয় এমন অনেক ছবিতেই পাওয়া যাবে, তা বলে তাদের ওয়েস্টার্ন বলে দেওয়াটা একটু বাড়াবাড়ি। ওয়েস্টার্নকে আমরা একটা আলাদা ক্যাটিগরি হিসেবেই দেখব।  

    এবার তোর প্রশ্নে ফিরে আসি। আজকের দিনে যেকোনো ক্লাসিকাল আমেরিকান ছবি নিয়েই এরকম কূটপ্রশ্ন উঠবে, যে ছবিটা কেন দেখব – কলেজের ক্লাসরুমে যদি হিচককের কোনো ছবি দেখানো হয় তখন স্টুডেন্টদের মধ্যে কেউ বলতেই পারে এই ছবি দেখানোর দরকারটা কী। প্রশ্নটা যে সবসময় অন্যায্য তা নয়। যেমন আমার প্রায়শই মনে হয় – দ্য বার্থ অফ আ নেশনে  (ডেভিড ওয়ার্ক গ্রিফিথ, ১৯১৩) মত একটা ছবি, যাতে রেসিসম নিয়ে বিন্দুমাত্র রাখঢাক নেই, আজকের প্রেক্ষিতে তার রেলিভেন্স কোথায়? ছবিটার আঙ্গিকগত অর্জন নিয়ে কোনো প্রশ্নই উঠবে না, কিন্তু তার বাইরে গিয়ে বার্থ অফ আ নেশন -কে অ্যাপ্রিসিয়েট করা যায় কি? এখনকার সময়ে দাঁড়িয়ে যখন আমরা ঐ ছবিগুলো পড়ব, আমাদের এই সমস্যাগুলো সম্বন্ধে সচেতন থেকে পড়া দরকার। 

    আমার নিজের একটা হাইপোথিসিস আছে, সেটা বলি। প্রত্যেকটা আর্ট ফর্ম জন্মাবার সঙ্গে সঙ্গে তাকে ঘিরে প্রাসঙ্গিক কিছু প্রশ্নের উদ্ভব হয়। সেই প্রশ্নগুলোর প্রাসঙ্গিকতার একটা সময়সীমা থাকে, অর্থাৎ এমন নয় যে সব প্রশ্ন সবসময় রেলিভেন্ট থাকছে। যেমন, ‘সিনেমা কি আর্ট?’, ‘সিনেমা কি সিরিয়াসলি আলোচনা করার মত জিনিস?’ – এই প্রশ্নগুলো কি আজকে খুব রেলিভেন্ট? আজ থেকে একশো বছর আগে তামাম লোকজন এই নিয়ে লিখে তার মীমাংসা করে ফেলেছে বলে আমার বিশ্বাস। কিন্তু একটা সময়ে এর প্রাসঙ্গিকতা ছিল – তখন সিনেমা যে শিল্পমাধ্যম হয়ে উঠতে পারে, সেটা প্রমাণ করার জন্য কিছু ছবি তৈরি করার প্রয়োজন হয়েছিল। গ্রিফিথের বার্থ অফ আ নেশন সেরকমই এক ছবি। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে এই ছবিতে প্রমাণ করতে চাওয়া হয়েছে যে সিনেমা উপন্যাসের মতই জটিল ন্যারেটিভ বুনতে পারদর্শী একটা মিডিয়াম। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই প্রশ্নটা আমার কাছে ততটাও জরুরি নয়। 

    কিন্তু আমরা ইতিহাসের ঠিক কোন পয়েন্টে দাঁড়িয়ে আছি, কী করে এখানে এলাম, সেটা বুঝতে গেলে তো ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকানো ছাড়া গতি নেই, তাই না? যারা সিনেমা নিয়ে সিরিয়াসলি চর্চা করছে, তাদের ওপর এই দায়টা বিশেষভাবে বর্তায়। একই জিজ্ঞাসা নিয়ে বারবার আমাদের ফিরে যেতে হবে ইতিহাসের কাছে, নতুবা সবই ‘মন্দির উওহি বানায়েঙ্গে’ হয়ে যাবে, কার মন্দির, কার জমি – সেসব নিয়ে তর্ক করার আর জায়গাই থাকবে না। ইতিহাসকে না জেনে খরচার খাতায় ফেলে দিলে তো খুব মুশকিল। তাহলে তো লেনি রিফেনস্টালে হাতই দেওয়া যাবে না (রিফেনস্টাল একজন কুখ্যাত জার্মান পরিচালক, অ্যাডলফ হিটলারের স্নেহধন্যা, থার্ড রাইখের জন্য একাধিক প্রোপাগ্যান্ডা ছবি বানিয়েছিলেন), ব্যাপারটা এরকম নয় যে রিফেনস্টাল যা দেখিয়েছেন সে’ সব সত্যি। আমি মোটেই এরকম দাবি করছি না। আমার বক্তব্য হল – ছবিটা আগে মন দিয়ে দেখ, তার ফর্মটাকে দেখ; সিনেমার পক্ষে কতদূর কী করা সম্ভব সেটা সম্বন্ধে সবসময় সচেতন থাকা দরকার, যাতে অন্য কোনো ছবিতে স্বৈরতন্ত্রী বা ফ্যাসিস্ট প্রবণতা থাকলে সেটাকে চিনে নিতে ভুল না হয়। এই সূত্র ধরেই আমরা যেখানে আলোচনাটা শুরু হয়েছিল সেখানে ফিরে যাই। আমার ধারণা আমেরিকাকে বুঝতে গেলে ‘ওয়েস্টার্ন’-কে বুঝতেই হবে, না বুঝলে চলবে না। 

    এবার আর কোনো প্রশ্নের অপেক্ষা না করেই আমি নিজে একটা কথা পাড়ি – রিসেন্টলি ইউটিউব ঘাঁটতে ঘাঁটতে একটা ছবির ক্লিপ চোখে পড়ল। ছবিটা হচ্ছে, জুরাসিক পার্ক সিরিজের যে দ্বিতীয় ট্রিলজিটা রয়েছে – জুরাসিক ওয়র্ল্ড – তার শেষ পার্ট। ছবিগুলো ন্যাচারালি খুব খাজা! সে যাই হোক। শেষ ছবিটার নাম জুরাসিক ওয়র্ল্ড ডোমিনিয়ন (কলিন ট্রেভেরো, ২০২২) – তাতে, ঐ যা হয়, ডাইনোসরগুলো খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে পড়েছে, গোটা পৃথিবী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। রীতিমত ডাইনোসর অ্যাপোক্যালিপ্স যাকে বলে। গোটা মানবসভ্যতার অস্তিত্বই এখন খাদের ধারে ঝুলছে। ছবির একদম শুরুতে দেখাচ্ছে আলাস্কার মত একটা বরফঢাকা ল্যান্ডস্কেপ, চারদিক ধু ধু করছে, সেখানে ক্রিস প্র্যাট একটা ঘোড়ায় চড়ে ছুটছে, পরনে লেদারস্ট্র্যাপ, জিন্স, ব্রিচ ইত্যাদি, এবং ক্যাঙ্গারু গোছের কয়েকটা ঘাসখেকো ডাইনোসর ওর পাশে পাশে ছুটছে। ক্রিস প্র্যাটের হাতে একটা ল্যাসো, বোঝাই যাচ্ছে ওটা দিয়ে ডাইনোসরগুলোকে পাকড়াও করছে। এটা বুঝতে অসুবিধে হওয়ার কথা নয় যে গোটা আইকনোগ্রাফিটা ওয়েস্টার্ন জঁর থেকে ধার করা। 

    আরো দুটো উদাহরণ দিই। একটা লং রানিং সিরিজ রয়েছে, নাম দ্য ওয়াকিং ডেড  (ফ্র্যাঙ্ক ড্যারাবন্ট, ২০১০-), সেখানে গপ্পের নায়ক হলেন পুলিশের লোক। তিনি গুলি খেয়ে হাসপাতালে ভর্তি। ইতিমধ্যে জম্বি অ্যাপক্যালিপ্স হয়ে গেছে। জ্ঞান ফেরার পর তিনি আবিষ্কার করলেন চারপাশে কিছুই আর আগের মত নেই, মানুষ জম্বি হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মনে রাখতে হবে, আমাদের হিরো কিন্তু আমেরিকান সাউথের কোনো একটা স্টেটের শেরিফ – তার মাথায় হ্যাট, তাতে টিন স্টার লাগানো। যেহেতু জম্বি-অ্যাপোক্যালিপ্স, যথারীতি কোনো পেট্রোল পাম্প আস্ত নেই। সুতরাং তিনি কীসে চড়ে ঘুরছেন? ঘোড়া!

    আরেকটা ছবি – এটা নিশ্চয়ই অনেকে দেখেছে – ম্যাড ম্যাক্স: ফিউরি রোড  (জর্জ মিলার, ২০১৫) যেখানে একটা নিউক্লিয়ার অ্যাপোক্যালিপ্স ঘটে গোটা পৃথিবী শুকিয়ে খটখটে মরুভূমি হয়ে গেছে, তাতে গড়ে উঠেছে একটা টিরানিকাল রেজিম, একদল মানুষ সেখান থেকে পালিয়ে অন্য জায়গায় যাওয়ার চেষ্টা করছে – এই নিয়েই গল্প। এছাড়াও এরকম আরো কিছু ছবি, যেমন দ্য রোড (জন হিলকোট, ২০০৯), যেটা করম্যাক ম্যাকার্থির উপন্যাসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, বা দ্য বুক অফ ইলাই (হিউজ ভ্রাতৃদ্বয়, ২০১০) – এগুলো যদি পাশাপাশি ফেলে পড়া হয়, তাহলে দেখা যাবে সবকটার মধ্যে একটা অ্যাপোক্যালিপ্সের আইডিয়া রয়েছে। অ্যাপোক্যালিপ্সটা হয়তো সবসময় আমাদের দেখানো হচ্ছে না, কিন্তু অ্যাপোক্যালিপ্স-পরবর্তী এক পৃথিবী আমরা ছবিতে দেখতে পাচ্ছি। 

    এতদ্সত্ত্বেও প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া এই দুনিয়াকে কোনোভাবেই ডিসটোপিয়া বলা যাবে না, কারণ সবকটা ছবিতেই একটা কমন প্রোজেক্ট রয়েছে – তাদের লক্ষ হল সব প্রতিকূলতা জয় করে একটা নতুন সভ্যতা গড়ে তুলতে হবে। আবার নতুন করে একটা কমিউনিটি গজিয়ে উঠবে, সেটা হয়তো অন্য কোনো ক্রাইসিসের মুখে পড়বে – এভাবেই চলবে। আমরা আমেরিকান সিভিলাইজেশান বলে যদি কিছু চিহ্নিত করতে পারি, সিভিল ওয়ার থেকে নব্বইয়ের দশকের মধ্যে তাকে যে যে সমস্যাগুলোর মুখে পড়তে হয়েছে – যেমন সোশাল জাস্টিস রক্ষিত হচ্ছে না, নানান অপরাধবৃত্তি মাথা চাড়া দিচ্ছে…গত পনেরো কুড়ি বছরে তৈরি ছবিগুলোতে নতুন করে গড়ে ওঠা সভ্যতাকে এই প্রশ্নগুলোর মোকাবিলা করতে করতেই এগোতে হচ্ছে – এই সমস্যাগুলোকে ঝেড়ে ফেলে একটা ‘সুস্থ স্বাভাবিক’  সমাজ গঠনের দিকে- যেখানে all Americans are equal before the eyes of God. এটাই ম্যানিফেস্ট ডেস্টিনি। এই ছবিগুলো নিজেদেরকে যতই ডিসটোপিক বলে দাবি করুক না কেন, আক্ষরিক অর্থে এগুলো কিন্তু ইউটোপিয়া। সেখানে যতই শিশুমৃত্যু থাকুক, মহিলারা রেপড হয়ে যান, জলের কষ্টে মানুষ মরে গিয়ে তাকে শকুনে ঠুকরে খাক, আদতে এগুলো নতুন সভ্যতা গড়ে ওঠার বৃত্তান্ত – ভীষণই ইতিবাচক!

    দ্বিতীয়ত, একদম আইকনোগ্রাফির জায়গা থেকে যদি দেখি, এই ছবিগুলোর মুখ কিন্তু ওয়েস্টার্নের দিকে ফেরানো। একটু কাব্য করে বললে, যখনই আমেরিকাকে একটা নতুন সমাজ আর সভ্যতা গঠনের গল্প বলতে হচ্ছে, তখনই আবার lone rider, cowboy, Westerner – এই ফিগারগুলোকে ঐ চেনা ল্যান্ডস্কেপে ফিরিয়ে আনতে হচ্ছে। আমার ধারণা আশির দশকে যাকে ওয়েস্টার্নের demise বলা হচ্ছিল – যখন ওয়েস্টার্ন বলে ওয়েস্টার্ন তৈরি করা একরকম বন্ধই হয়ে গেল বলা যায়, সারা বছরে সাকুল্যে হয়তো দশটা ওয়েস্টার্ন তৈরি হত – তখন ওয়েস্টার্নের একটা ডিসপ্লেসমেন্ট ঘটছে অন্যান্য জঁরের ছবিতে। এটা ঠিক যে এখনকার ডিসটোপিক ছবিগুলোয় এমন অনেক বিশেষত্ব রয়েছে যেগুলো হাওয়ার্ড হক্স বা জন ফোর্ডের ছবিতে খুঁজলে পাওয়া যাবে না। যেমন কোনো ছবির নায়ক একজন কৃষ্ণাঙ্গ। বা ম্যাড ম্যাক্স: ফিউরি রোডের মত ছবি, যেখানে মুখ্য চরিত্রে রয়েছে একজন মহিলা (যদিও সে খুবই masculinised), কিন্তু তা সত্ত্বেও ওয়েস্টার্নের যে ইম্যাজিনেশন, সেটা প্রায় একইরকম থেকে যাচ্ছে। 

    অভিষেক:  গত কুড়ি বছরে টিভি আর ওয়েব সিরিজের দৌলতে খোদ ওয়েস্টার্নকে একভাবে ফিরে আসতে দেখা যাচ্ছে। তিনটে সিরিজের কথা মাথায় আসছে এই মুহূর্তে – ডেডউড (ডেভিড মিল্চ, ২০০৪-২০০৬), গডলেস (স্কট ফ্র্যাঙ্ক, ২০১৭) আর ওয়েস্টওয়র্ল্ড (জোনাথন নোলান আর লিসা জয়, ২০১৬-)। সিরিজ ফর্ম্যাটে যে ওয়েস্টার্ন ফিরে এল – তার গল্পেও কিন্তু একধরণের ‘সুস্থ সমাজ’ আর স্টেটহুডের দিকে যাত্রা, সমসাময়িক সোশাল জাস্টিস মুভমেন্টগুলোকে স্বীকৃতি জানানো, একটা Hobbesian পরিস্থিতিকে শৃঙ্খলায় আনা, আইনের শাসন চালু করা – এই জিনিসগুলো রয়েছে।

    অরূপরতন: আর এই সুস্থ সমাজ গঠনের চেষ্টা মানে কিন্তু সেই গতে বাঁধা আগের আমেরিকাতেই ফিরে যাওয়া – কখনোই কোনো সোশালিস্ট মডেল অফ সোসাইটি বা কমিউন গড়ে তোলার চেষ্টা নয়। সেটা ফ্যামিলি, চার্চ, কমিউনিটি, রিপাবলিক – এই সম্পর্কিত মূল্যবোধগুলোকে বজায় রেখেই হচ্ছে।

    অভিষেক: অর্থাৎ সভ্যতার ধ্বংসস্তূপ থেকে আবার সুস্থ সমাজ এবং রাষ্ট্রের দিকে যাত্রা – যেটা তুমি বলছ সাম্প্রতিক (তথাকথিত) ডিস্টোপিক ছবিগুলোর মূল থিম, সেটা ওয়েস্টার্ন থেকেই ধার নেওয়া, এবং নতুন ওয়েস্টার্ন সিরিজগুলোও সেটাকে আত্মস্থ কর‍ছে। কিন্তু ধরো- ক্লিন্ট ইস্টউডের মত একজন পরিচালক আশির দশকে ওয়েস্টার্নের ‘মৃত্যু’ ঘোষণা হওয়ার পরও ওয়েস্টার্ন বানাচ্ছেন, যেমন আনফরগিভেন (১৯৯২), তাঁর ওয়েস্টার্নে কিন্তু এই ইউটোপিয়ার লেশমাত্র নেই।

    অরূপরতন: এখানে খেয়াল কর, প্রথমত, ইস্টউডের আনফরগিভেন ঘোষিতভাবে ওয়েস্টার্ন। দ্বিতীয়ত, আনফরগিভেন-এর পরে কিন্তু ইস্টউড আর সেভাবে ওয়েস্টার্ন বানাচ্ছেন না। বানানো সম্ভবও নয় – কারণ আনফরগিভেন নিজেই যেন বলে দেয় যে ওয়েস্টার্নের মৃত্যু হয়েছে।

    আনফরগিভেন  আসলে এত রিচ একটা ছবি, এবং আমার এত পছন্দের ছবি – এটা নিয়ে বলতে শুরু করলে ঘন্টার পর ঘন্টা নানান খুঁটিনাটি নিয়ে কথা বলা যায়। তার আগে কয়েকটা অন্য কথা বলে নেওয়া যাক, যেগুলো ওয়েস্টার্নের ‘ডেমাইস’ এর প্রসঙ্গে চলে আসে। 

    বিভিন্ন যেসব কারণ দেখিয়ে ওয়েস্টার্নের ‘ডেমাইস’-কে ব্যাখ্যা করা হয়, তার অন্যতম হল ১৯৮০তে মুক্তি পাওয়া ফিল্ম হেভেন’স গেট।  পরিচালক মাইকেল কিমিনো। কিমিনো ইতিপূর্বে দ্য ডিয়ার হান্টার  (১৯৭৮) নামে একটা বাণিজ্যসফল ছবি বানিয়েছেন, যেটা আবার ক্রিটিকদেরও ভীষণ ভালো লেগেছে, দেশবিদেশের নামকরা জায়গা থেকে বিভিন্ন পুরষ্কার জুটেছে তার জন্য। এই ছবিটাই বলতে গেলে মেরিল স্ট্রিপের কেরিয়ার লঞ্চ করে দেয়। সবচেয়ে বড় কথা, অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডে সে বছর ডিয়ার হান্টার এক গুচ্ছ নমিনেশন পায় – হলিউড ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির তরফে এর চেয়ে বড় স্বীকৃতি আর হয় না। মাইকেল কিমিনোর আগে এতখানি সমাদর যে মার্কিন পরিচালকের কপালে জুটেছিল তিনি ফ্রান্সিস ফোর্ড কোপোলা। দ্য গডফাদার (১৯৭২) আর দ্য গডফাদার টু (১৯৭৪) বানিয়ে তিনি ইন্ডাস্ট্রির চোখের মণি হয়ে গেছিলেন – তারপর তো অ্যাপক্যালিপ্স নাও (১৯৭৯) করলেন, যেটা ইন্ডাস্ট্রির সাথে একরকমের গদ্দারিই বলা চলে। কারণ ছবিটার বাজেট ছিল পাহাড়প্রমাণ, কিন্তু রিলিস করার পর মুখ থুবড়ে পড়ল, চলল না। 

    কিমিনোর ডিয়ার হান্টার বেরোনোর পর ইন্ডাস্ট্রির মনে আশা জেগেছিল, তারা মনে করল বুঝি নতুন কোপোলা খুঁজে পেয়েছে – ফলে এবার সে যা চাইবে তাই হাসিমুখে তার হাতে তুলে দেওয়া হবে। কিমিনো বললেন যে তিনি ওয়েস্টার্ন বানাতে চান। যথারীতি স্টুডিও তাতে টাকা ঢালতে রাজি। সমস্যা হচ্ছে, টাকা হাতে পেলেই সবার মাথায় অ্যাপক্যালিপ্স নাও -এর ভূত চাপে। কিমিনোকে হয়তো শুরুতে দু’ মিলিয়ন ডলার দেওয়া হয়েছিল, কিছুদিন পর তিনি জানালেন যে তাঁর আরো চার মিলিয়ন চাই, সেই টাকা দেওয়া হলে পর বললেন আমার আরো ছ’ মিলিয়ন দরকার। এভাবে বাজেট বাড়তে বাড়তে শেষমেশ দাঁড়ালো পঁয়তাল্লিশ মিলিয়নের কাছাকাছি!

    হেভেন’স গেট দেখলেই বুঝবি – it’s a beautiful film! একেবারে ব্যারি লিন্ডন মার্কা (স্ট্যানলি কুব্রিক, ১৯৭৫)। তিল তিল করে পরম যত্নে তৈরি করা একেকটা ফ্রেম, সেখানে গাছের পাতায় কতখানি সূর্যের আলো পড়বে সেটাও মেপে মেপে করা। অর্থাৎ অসম্ভব self-indulgent একটা ছবি। ওয়াইওমিং স্টেটের দুই র‍্যাঞ্চ মালিকের মধ্যে একটা ক্যাটল ওয়ার নিয়ে গল্প। গোটা ছবিতে ম্যানিফেস্ট ডেস্টিনি, ইউরোপীয় সভ্যতা ইত্যাদি নিয়ে জট পাকাতে গিয়ে ঘেঁটে ঘ করেছে। তারপর যা হয় – ফ্লপ করল – একেবারে লাল সিং চাড্ডা মার্কা ফ্লপ। ছবির প্রোডিউসার ইউনাইটেড আর্টিস্টস্ ফতুর হয়ে গিয়ে দোকানের ঝাঁপ ফেলতে বাধ্য হল। ওয়েস্টার্ন জঁরটাও তখন সবার চোখের বিষ, কেউ আর তাতে টাকা ঢালতে রাজি নয়। ততদিনে হলিউড পেয়ে গেছে তার ফেভারিট ফর্মুলা – ব্লকবাস্টার ফিল্ম। নতুন যুগের মাচো হিরো কীরকম হবে, তারও একটা আদল পেয়ে গেছে হ্যারিসন ফোর্ডের মধ্যে – যিনি আর কিছুদিনের মধ্যেই ইন্ডিয়ানা জোন্স শুরু করবেন (১৯৮১ থেকে শুরু করে এখনও চলছে)। সভ্য দুনিয়ার বাইরে গিয়ে স্যাভেজ-দমনের প্রোজেক্টটা ইন্ডিয়ানা জোন্সের দৌলতে শুরু হবে নবকলেবরে।

    তবে হেভেন’স গেট একটা সিগনিফিকেন্ট জিনিস করেছিল। ধর, যদি জিজ্ঞেস করা হয়, ওয়েস্টার্নের মূল জায়গাটা কী? What makes western different from the other genres? – তার উত্তর কী হবে? আমি বলব, ফ্রন্টিয়ার মিথ। এই মিথটার একটা প্রয়োজন আছে জঁরে, হয় মিথটাকে গড়তে হবে, বলবৎ করতে হবে, পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে, অথবা তার খোলনলচে বদলে দিতে হবে। একদম নির্বাক যুগের ওয়েস্টার্ন, যেমন জন ফোর্ডের আয়রন হর্স (১৯২৪), সেই থেকে শুরু করে ক্লিন্ট ইস্টউডের ছবি অবধি সব ওয়েস্টার্ন কিন্তু এই ফ্রন্টিয়ার মিথ নিয়েই কাজ করছে। আয়রন হর্স  এই মিথটাকে নির্মাণ করতে সাহায্য করেছিল – যে দেখ, কিছু দুঃসাহসী লোক, যাদের চালচুলো কিছুই নেই, তারা স্রেফ শরীর আর মনের জোরে লড়ে যাচ্ছে বন্য প্রকৃতি আর স্যাভেজদের সঙ্গে – এদেরকে হারিয়েই তারা বপন করবে সভ্যতার বীজ। এর অনেক পরে যখন স্যাম পেকিনপা, বাড বেটিকার, ক্লিন্ট ইস্টউড – প্রমুখ ছবি করতে এলেন, তখন তাঁরা আবার বলতে শুরু করলেন, ‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়!’ (হাসি) কিন্তু সবকটা ন্যারেটিভেই ফ্রন্টিয়ার মিথটা কেন্দ্রে রয়েছে। 

    হেভেন’স গেট যেটা করে বসল – সে ওয়েস্টার্ন বানাতে গিয়ে বানিয়ে ফেলল একটা সুদৃশ্য পিরিয়ড পিস। ওয়েস্টার্ন আর পিরিয়ড পিস – এই দুটোকে গোলালে চলবে না – দ্য গুড, দ্য ব্যাড, অ্যান্ড দ্য আগলি  (সের্জিও লিওনি, ১৯৬৬) -কে যেভাবে আমরা ওয়েস্টার্ন বলে থাকি – গন উইথ দ্য উইন্ড-কে (ভিক্টর ফ্লেমিং, ১৯৮০) কিন্তু একইভাবে ওয়েস্টার্ন বলতে পারি না, যদিও দুটোই সিভিল ওয়ারের পটভূমিতে তৈরি। পিরিয়ড পিস অতীতের গল্প বলে, সেটা দাঁড়িয়ে থাকে একধরণের নিঁখুত ইতিহাসসম্মত প্রোডাকশন ডিসাইনের ওপর, যেখানে খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে একটা পিরিয়ডের পুনর্নিমাণ করা হয়, সেইরকম দেখতে প্রপ, বাড়ি ঘর, সংলাপ, উচ্চারণভঙ্গি – যেমন ধর, মুঘলে-আজম (কে. আসিফ, ১৯৬০), পাকিজা (কামাল আমরোহী, ১৯৭২), যোধা আকবর (আশুতোষ গোয়াড়িকর, ২০০৮) – এধরণের ছবিতে যেটা হয়ে থাকে। আর পিরিয়ড পিস কথাটা কিন্তু অ্যাকাডেমিক নয়, পুরোদস্তুর ইন্ডাস্ট্রিয়াল টার্ম। আমেরিকাতে এরকম হাজার হাজার পিরিয়ড পিস তৈরি হয়েছে, কখনো সিভিল ওয়ার নিয়ে, কখনো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে। আঙ্কল টমস কেবিন নিয়ে ছবি তৈরি হলে সেটাকে নিশ্চয়ই কেউ ওয়েস্টার্ন বলবে না, বলবে পিরিয়ড পিস। 

    হেভেন’স গেট একটা টার্নিং পয়েন্ট, কারণ খুব অদ্ভুতভাবে ছবিটা ওয়েস্টার্নটাকে পিরিয়ড পিস করে তুলল। এটা আমি প্রস্তাব হিসেবে রাখছি, কেউ আমায় কাউন্টার করতেই পারেন। ওয়েস্টার্নে মিথলজি জিনিসটা খুব ফান্ডামেন্টাল ভূমিকা পালন করত। কিন্তু হেভেন’স গেটের পর পপুলার রিসেপশনে একটা বড়রকমের পরিবর্তন আসে, এমনকি বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়লেও ছবিটা দর্শকমনে স্থায়ী ছাপ রেখে দেয়। এরপর থেকে ওয়েস্টার্ন বলতে মানুষ বুঝবে স্রেফ ওয়েস্টে ঘটে যাওয়া অতীতের গল্প। এরই মধ্যে দেখা যাবে এর পাশাপাশি ওয়েস্টার্নে একমাত্র ক্লিন্ট ইস্টউডের কেরিয়ারটাই চলছে, যদিও তিনি এর পরবর্তী সময়ে খুব বেশি ওয়েস্টার্ন বানাবেন না।

    এরপর টুকটাক কিছু ছবি হয়েছিল, যেমন সিলভারাডো (লরেন্স কাসডান, ১৯৮৫), ডান্সেস উইথ উলভস  (কেভিন কস্টনার, ১৯৯০), টুম্বস্টোন (জর্জ পি কসমাটোস আর কেভিন জারে, ১৯৯৩), ওয়ায়েট আর্প (কাসডান, ১৯৯৪) ইত্যাদি- সেগুলো দেখলেই বুঝতে পারবি – মাই ডার্লিং ক্লেমেন্টাইনে (জন ফোর্ড, ১৯৪৬) যে মিথের ব্যাপারটা ছিল, সেটা এখানে সম্পূর্ণ হাওয়া হয়ে গেছে*। ক্লেমেন্টাইন দেখলেই বোঝা যায় যে ওয়ায়েট আর্প, ক্ল্যান্টন ব্রাদার্স, ডক হলিডে – এই সব চরিত্রগুলো এবং প্লটের সংশ্লিষ্ট প্রেক্ষিতের বাইরেও একটা বৃহত্তর আমেরিকার ইতিকথা বলার চেষ্টা করা হচ্ছে – তার ইতিহাস, সমাজব্যবস্থা ইত্যাদি নিয়ে। পরবর্তীকালের ছবিগুলোয় আর সেই প্রজেক্টটা নেই। সেই মিথলজিটা অনুপস্থিত। এরা অনেক বেশি হিস্টরিকালি অ্যাকিউরেট – অথচ আমরা এটা দ্য ম্যান হু শট লিবার্টি ভ্যালেন্স  (ফোর্ড, ১৯৬২) থেকেই জানি, “When History becomes legend – print the legend.” এতদিন ওয়েস্টার্ন মাথা ঘামিয়েছে সেই ‘লেজেন্ড’টাকে নিয়ে।

    (আগামী পর্বে সমাপ্য)


    * ক্লাসিকাল ওয়েস্টার্ন বলতে যা বোঝায়, অর্থাৎ চল্লিশের দশক পর্যন্ত যেসব মার্কিন ছবির মাধ্যমে ওয়েস্টার্নের চলচ্চিত্রীয় আদলটি পাকাপোক্ত হয়েছিল দর্শকমানসে, তারই অন্যতম পরাকাষ্ঠা মাই ডার্লিং ক্লেমেন্টাইন। এই ছবিতে ওয়ায়েট আর্প, ডক হলিডে প্রভৃতি কিংবদন্তীসম চরিত্রকে নিয়ে ইতিহাস, কল্পনা, ও রটনার মিশেলে একটি জমজমাট গল্প ফাঁদা হয়। ভাগ্যান্বেষী বন্দুকবাজ ওয়ায়েট আর্প কীভাবে ওয়েস্টের একটি উপদ্রুত শহর টুম্বস্টোনের দায়িত্ববান টাউন মার্শাল হয়ে উঠল সেই বৃত্তান্ত, আর তার পাশাপাশি মৃত্যুপথযাত্রী ডক হলিডে ও তার খোঁজে সুদূর বস্টন থেকে ছুটে আসা ক্লেমেন্টাইন কার্টারের করুণ কাহিনি – এই টুকরো ঘটনাগুলিকে একসূত্রে গেঁথেই ছবি এগিয়েছে। এর সাথে অনিবার্যভাবে জড়িয়ে গেছে কমিউনিটি গড়ে ওঠার গল্প, অরাজকতার আগাছা উপড়ে অসভ্য ওয়েস্টে আইনের শাসন প্রবর্তনের ইতিকথা। পুনরায় নব্বইয়ের দশকে মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে ওয়ায়েট আর্প ও ডক হলিডের সাথে ক্ল্যান্টন ব্রাদার্সের কলহ নিয়ে হলিউডে একাদিক্রমে দুটি ছবি হয়েছিল, টুম্বস্টোন এবং ওয়ায়েট আর্প, অরূপদা যাদের নাম উল্লেখ করেছেন। ছবিগুলি একই চরিত্র এবং কিংবদন্তী নিয়ে তৈরি হলেও, ওয়েস্টের অতীতকে তারা যেভাবে পুনর্নির্মাণ করে, তার সাথে প্রায় পাঁচ দশক আগে তৈরি মাই ডার্লিং ক্লেমেন্টাইন-এর বিস্তর ফারাক। সে’জন্যই ওয়েস্টার্ন মিথ নিয়ে আলোচনা-প্রসঙ্গে ফোর্ডের সেই ছবির কথা উঠে এল।

    ছবি নির্দেশিকা: প্রচ্ছদের ছবিটি গডলেস নামক লিমিটেড সিরিজ থেকে নেওয়া হয়েছে।

    সাক্ষাৎকারের তৃতীয় পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন এখানে

  • বাংলাদেশের ছবি হাওয়া ও একটি উপকথার পুনর্কথন

    বাংলাদেশের ছবি হাওয়া ও একটি উপকথার পুনর্কথন

    এই শীতের মরশুমেও হাওয়া সত্যিই গরম। চতুর্থ বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উৎসবে হাওয়া (২০২২)  ছবিটি দেখতে নন্দনে উপচে পড়লো দর্শক। হলের বাইরে ঘন্টা চার পাঁচ ধরে লম্বা লাইন, কর্তৃপক্ষকে রিপিট শো এর আয়োজন করবার বন্দোবস্ত করতে বাধ্য করা- সম্প্রতি কোনো বাংলা ছবিকে ঘিরে এমন ঘটনা বিরল। কোভিডে, বাড়ির মধ্যে বসে থাকতে থাকতে আমরা যখন কম্পিউটার আর ল্যাপটপ থেকে মোবাইলের ছোট্ট চারকোণা ফ্রেমে সেঁধিয়ে গেছি, সিনেমা তখন আরো বেশী বেশী করে ওটিটি নির্ভর হয়ে গেছিলো। ওটিটির জন্যই ছবি তৈরি, ওটিটির মাধ্যমেই ছবি দেখা। একুশ শতকের ছবি নির্মাণ ও ডিস্ট্রিবিউশানের জন্য ওটিটিকে ব্যবহার করবার সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনোরকম উন্নাসিকতা না রেখেও বলা যেতে পারে- ছবি মূলত বড়ো পর্দায় দেখবার জন্যই। সম্প্রতি কলকাতার ফিল্মস্কুল সত্যজিৎ রায় ফিল্ম এন্ড টেলিভিশান ইন্সটিটিউটের বড়ো পর্দায় সের্জিও লিওনির ক্লাসিকাল স্প্যাঘেটি ওয়েস্টার্ন ওয়ান্স আপোন এ টাইম ইন দা ওয়েস্ট (১৯৬৮) দেখবার অভিজ্ঞতা ছিলো অপার্থিব। ভিন্ন শহর থেকে আসা জিল (অভিনেতা ক্লদিয়া কার্দিনাল) রেলগাড়ি থেকে নেমে প্রবেশ করেন ওয়েস্টের প্রান্তরে- তাঁর ঘোড়াগাড়ি ধুলো উড়িয়ে চলে যায় মাউন্টেন ভ্যালির রাস্তায়… আর এনিও মরিকনের সুরের সাথে সাথে ক্যামেরা উঠে আসে এক্সট্রিম লং শটে। এই দৃশ্য একাধিকবার ডিজিটাল স্ক্রিনে দেখেও সেই মুগ্ধতা হয়নি, যে মুগ্ধতা হয়েছিলো ওই পর্দাজোড়া অসীমের সামনের বসে। আমি বলতে পারি হারমোনিকার মুখের ভাঁজে থাকা প্রতিশোধের আগুন অথবা একটি শিশুকে হত্যা করবার ঠিক আগের মুহুর্তে হিংস্র হেনরি ফন্ডার থুতু ফেলার এক্সট্রিম ক্লোজ আপ যে দ্যোতনায় সেদিন বুকের মধ্যে হাহাকার ফেলেছিলো- তা কখনোই ল্যাপটপের স্ক্রিনে দেখা পূর্ব অভিজ্ঞতার সাথে সমানুপাতিক না। এখন এই কথা বলামাত্র পাঠক ভাবতে পারেন টেলিভিশান ফিল্ম বা আমাজন প্রাইমে রিলিজ পাওয়া ওয়েবসিরিজের চাইতে হল রিলিজ পাওয়া ছবির প্রতি একধরণের পক্ষপাতিত্ব করছি আমি। এমন মনে হওয়া অসঙ্গত না। তবে এক্ষেত্রে আমি বলতে চাইবো, কথাটা পক্ষপাতিত্বের নয়, কথাটা হলো অভিজ্ঞতার তারতম্যের। হলের সমস্ত আলো নিভে গেলে সামনের বিপুল পর্দায় যখন ছবি চলতে শুরু করে- আর শব্দে গমগম করতে থাকে চারপাশ, সিনেফিলরা জানেন- এই রোমাঞ্চ অপরিসীম। ঘরের এককোণে বসে কানে হেডফোন গুঁজে ছোটো স্ক্রিনে এই রোমাঞ্চ বোধ হয় সম্ভব না। সম্ভব হলে আরো মাসখানেক অপেক্ষা করে বাংলাদেশের এই ছবি বাড়িতেই দেখে নিতেন দর্শকেরা, ঘন্টার পর ঘন্টা ঠায় রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে লাইন দিতেন না। হাওয়া-র সমস্ত দর্শক একবার ভেবে দেখুন তো, ঐ সুবৃহৎ সমুদ্দুর ও মাঝদরিয়ায় একদল মাঝি আর একজন রহস্যময়ী মহিলাকে ঘিরে তৈরি হওয়া গপ্পো থামিয়ে থামিয়ে মোবাইলের মধ্যে দেখলে কি এই একই শিহরণ হতো আমাদের? যদিও সিনেমা হলের যৌথ স্পেকটেটারশিপের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গটি এক্ষেত্রে বাদ রাখা হলো।

    তবে যে ভয়ঙ্কর সময়ে একপ্রকার নিরুপায় হয়েই আরো বেশী ওটিটি নির্ভর হয়ে পড়েছি আমরা- হলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেঁধিয়ে গিয়েছি ছোট্ট স্ক্রিনে, ঠিক সেইসময়েই সমুদ্রের মাঝখানে নৌকা করে পৌঁছে হাওয়া ছবির শ্যুট চলছে। সালটা ২০২০- কোভিডের জন্য তখন বড়ো হলে ছবি আবার আগের মতো করে ফিরবে কিনা এ নিয়ে অনিশ্চিত অনেকেই। সেই অনিশ্চিত অসহায়তার মধ্যে মেজাবুর রহমান সুমন কি অপরিসীম আত্মবিশ্বাসে বড়ো পর্দার এই ছবির কাজ শুরু করে দিয়েছিলেন… সুদক্ষ অভিনেতা ও ছবির সাথে যুক্ত থাকা অন্যান্য সিনেশিল্পীদের নিয়ে কক্সবাজার থেকে পাড়ি দিয়ে ফেলেছিলেন মাঝদরিয়ায়। 

    অভিনেতাদের নানান সাক্ষাৎকার থেকেই জানা যায়, প্রায় ৪০-৪৫ দিনের একটানা শ্যুট ছিলো এই ছবির। এবং বেশীরভাগ শুটিংন-ই মধ্য সমুদ্রে- নৌকার মধ্যে। একজন বাদে ছবির চরিত্রদের প্রত্যেকেই যেহেতু মাঝি, তাদের মেক আপ-ও সেইভাবেই প্রয়োজন ছিলো। ট্যান পড়ে যাওয়া চামড়া- পান খেয়ে ক্ষয়ে যাওয়া দাঁত -ধুলোবালি মাখা অপরিষ্কার ত্বক ইত্যাদি। জানা যায়, প্রথম কদিন অভিনেতাদের চেহারা জেলে চরিত্রদের চেহারার মতো করবার জন্য দুই তিন ঘন্টা মেক আপের প্রয়োজন হতো। তবে ওই পরিবেশে একটানা থাকতে থাকতে তাদের শরীর ও ত্বক ক্রমশ অমনটাই হয়ে যায়।  দীর্ঘ সময় ধরে মেক আপ আর প্রয়োজন হয়নি অনেকেরই- অল্প মেক আপ বা প্রায় মেক আপহীন ভাবেই শ্যুট করতে পারতেন অভিনেতারা। এই ছবির জন্য অনেকটা মেথড অ্যাক্টিং এর মতো করে অভিনেতাদের ট্রেন করা হয়। শ্যুট শেষ হয়ে গেলেও সেটে তাদের নিজ নিজ চরিত্র হয়েই থাকতে বলা হতো। একটানা মাঝদরিয়ায় পড়ে থাকতে থাকতে তাদের শরীরের রং, শরীরী ভাষা এবং গলার স্বর ক্রমশ বাস্তবের মাঝিমাল্লাদের মতোই বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে থাকে। চঞ্চল চৌধুরীর এক সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায় অভিজ্ঞ এই অভিনেতাকে তাঁর নিজস্ব স্টারডম থেকে বেরিয়ে আসতে বলেছিলেন পরিচালক। কেবল তাই নয়- শ্যুট শেষের পরে বাকি সময়টাও যাতে তিনি অন্যান্য মাঝিদের মতো করেই বোটের সকলের সাথে থাকেন এমন কড়া নির্দেশ ছিলো পরিচালকের। এই ছবিতে স্টারডম ও তার রিসেপশান নিয়ে কিছু ভিন্ন বক্তব্য আছে আমার, তা অন্য আরেকটি প্রবন্ধে খোলসা করে বলবার ইচ্ছা রয়েছে। তবে অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী যে পরিচালকের এই নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন তা বলাই বাহুল্য।

    একটি মাছধরা নৌকা, তাকে ঘিরে একদল মাঝি ও মাছের জালে ধরা পড়া একটি মেয়ের গল্প হাওয়া। নৌকা ক্রমশ মাঝদরিয়ায় এগোতে থাকে এবং একের পর এক রহস্যময় জটিলতার সম্মুখীন হতে থাকে মাঝিরা। হাওয়া র গল্প এটুকুই। যদিও এটুকু বলা হলে কিছুই বলা হয়না- কারণ যেকোনো শিল্পেই কি বলা হচ্ছে- তার সাথে, কিভাবে বলা হচ্ছে- এই বিষয়টা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে। মাঝসমুদ্রে কেবল এক নৌকাকে ঘিরে তৈরি হওয়া মূলধারার কাহিনী যে এতোটা নিপুণ ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে বাংলা ভাষায় বলা যেতে পারে- তা বাংলাদেশের ছবি না দেখে থাকলে কলকাতার বাঙালি হয়ে বিশ্বাস করাটা খানিক কঠিন হতো। মেজবুর রহমান সুমন ও টিমের প্রত্যেককে বাঙালি সিনেফিলদের আশ্বাস যোগানোর জন্য অভিনন্দন। অভিনন্দন বাংলাদেশ ফেস্টিভাল কর্তৃপক্ষকেও- কলকাতায় বসে নিজের ভাষায় এমন বিশ্বমানের পপুলার ছবি দেখবার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য।  

    মাঝিমাল্লাদের জীবনে মিথ বা উপকথা একটি অত্যন্ত জরুরী উপাদান। বলা যেতে পারে তাদের জীবনকে কেন্দ্র করে থাকে এই মিথ। মিথ তাদের কাছে কেবল মিথ ই নয়- তা বিশ্বাসযোগ্য সত্য। তাদের দুনিয়ায় ডাঙার নিয়ম খাটেনা। সমুদ্রের মাছধরা নৌকায় মেয়ে মানুষ ওঠা নিষেধ- উঠলে বিপদ হয় এমন বিশ্বাস কক্সবাজারের জেলেদের। তাই নৌকায় একজন মহিলা জল থেকে উঠে আসার পর থেকেই বোঝা যায় বিপদ আসন্ন, সবকিছু আর আগের মতো মসৃণ থাকবে না। মিথে যা বলা আছে- তা খাটতে বাধ্য, তার অন্যথা হবেনা কিছুতেই। যুগ যুগ ধরে প্রচলিত থাকা মিথ একধরণের জনজাতির জীবনের অংশ হয়ে যায়। তারা এই মিথকে পরম্পরা ধরে এমনভাবে বিশ্বাস করতে থাকে যে তাদের ধারণাবিশ্বে বাস্তব আর মিথিকাল এলিমেন্টের কোনো পার্থক্য থাকে না- তারা পরস্পরের সাথে মিলেমিশে থাকে ওতপ্রোতভাবে। এই প্রসঙ্গে হিমাচলের এক প্রত্যন্ত গ্রামের অভিজ্ঞতা বলতে ইচ্ছে করে। মূল শহর থেকে অনেক উপরে এক বিস্তীর্ণ ধূ ধূ ভ্যালির উপর চুপচাপ বসে আছি- দূরে পাইন বার্চের সারি। এমন সময় দূর থেকে এক বছর বারো তেরোর মেয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমার দিকে এগিয়ে আসে, আঙুল দিয়ে দেখায় পাহাড়ের ওই ঢালের এক ঝর্না। অনেক দূরের ঐ ঝর্নাকে কেমন সাদা সরু সুতোর মতো লাগছিলো- অদ্ভুত রহস্যে তা আমাকে আকৃষ্ট করায় তাকে বললাম ওখানে নিয়ে যেতে। তা শুনে মেয়েটি আঁতকে উঠে জানায়, এখন মাঝদুপুর, যেতে যেতে বিকেল হয়ে যাবে, তাই সে এখন যাবেনা। আমি অবাক হয়ে তাকাতে মেয়েটি জানালো ওখানে বিকেলের পর থেকে স্বর্গের পরীরা স্নান করতে আসে, তাই সেই সময় ওখানে যাওয়া নিষেধ- গেলে বিপদ হয়। শহরে ফিরে এই গল্পকে বেশ অবিশ্বাস্য মনে হলেও শহর থেকে কয়েকশো মাইল দূরে ভ্যালির ওই ধূ ধূ প্রান্তরে সেদিন বুকটা ছ্যাঁত করে উঠেছিলো। ওই জায়গায় বসে সমস্ত বৈজ্ঞানিক যুক্তিক্রম ছাপিয়ে এক লহমার জন্য হলেও এই মুখে মুখে ফেরা কিসসাকে সত্যি বলে মনে হয়েছিলো। সাহস পাইনি আমি সেদিন একা একা ওই ঝোরার প্রান্তে যাওয়ার। এইরকম নানান গল্প, উপকথা, কিসসা ও মিথ আমাদের গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। একেকটি অঞ্চল ও তার আদি বাসিন্দারা যেমন মিথগুলোকে সৃষ্টি করেছে- আবার বছরের পর বছর ধরে এই মিথই নির্মাণ করে রেখেছে জনজাতির বিশ্বাসের ভিত্তিপ্রস্তর, ধারণ করেছে তাদের অঞ্চলের ইতিহাস। সুতরাং জালে মাছের পরিবর্তে একজন জ্যান্ত মহিলা ওঠা মাত্রই বুঝতে পারা যায় ন্যারেশানটিকে আর বাস্তবের প্যারাডাইমে দেখলে চলবে না। ন্যারেশানটি ততক্ষণে মিথ হয়ে গিয়েছে বা মিথ এসে ভর করেছে ন্যারেশানের অন্দরে। একদিকে মধ্যসমুদ্রে পড়ে প্রাণে বেঁচে থাকা অসম্ভব- অপরদিকে, নৌকায় মেয়েমানুষ অর্থাৎ বিপদ অবশ্যাম্ভাবী। সুতরাং নৌকায় মহিলা চরিত্র গুলতির আবির্ভাবের পর থেকেই বোঝা যায় ন্যারেশানটি ক্রমশ বাস্তব থেকে দূরে চলে যাচ্ছে, যেমন তীর থেকে ক্রমশ দূরদূরান্তের সমুদ্রে ভেসে যাচ্ছে নৌকা- আর গল্পটি রিয়েলিটির পরিসর থেকে বেরিয়ে ক্রমশ ফ্যান্টাসির দিকে এগোচ্ছে- এগোচ্ছে রূপকথার দিকে। নৌকাটি ক্রমশ দিগ্বিদিক হারিয়ে ফেলে সমুদ্রের গভীরে চলে যেতে থাকবে- আর আস্তে আস্তে রিয়েলিটির সমস্ত কিছু অগ্রাহ্য করে গল্পটি রূপকথার হয়ে উঠবে, মিথ এসে ক্রমশ গ্রাস করে নিতে থাকবে বাস্তবের চরিত্র ও প্রেক্ষাপট।

    এখানে মনে রাখা দরকার যেকোনো রূপকথার গল্পই কিন্তু আগে থেকে আমাদের জানা থাকে। ঘুমন্তপুরীতে থাকা রাজকন্যাকে উদ্ধার করবে যে রাজপুত্তুরই- এ সকলেরই জানা। তাও অপেক্ষা কেবল কীভাবে উদ্ধার করবে সেই নিয়ে- কতো জঙ্গল পাহাড় সমুদ্র নদী পেরিয়ে কতো দৈত্য দানোর সাথে কঠিন লড়াই করে রাজকুমার এসে নিয়ে যাবে কন্যাকে- তা জানতেই উদগ্রীব হয়ে থাকে রূপকথার পাঠক। পাঠক জানেন, রাজপুত্তুর জিতবেই- তবু মনে হয় তার রাজকুমারীকে উদ্ধার করবার বিজয়গাথা প্রত্যেকবার নানারকম ভাবে দেখি, শুনি, পড়ি। অর্থাৎ রূপকথা বা কিসসায় শেষে কি ঘটছে তা জানা থাকে বলেই আগ্রহ বেশী থাকে কিভাবে ঘটছে তার ওপর- রোমাঞ্চও সেখানেই। সমস্ত বাধা পেরিয়ে যখন রাজকন্যা ও রাজপুত্তুরের ‘and they lived happily ever after’ এ এসে পৌঁছাই আমরা- বইয়ের পাতা বন্ধ করি দিই  অথবা সিনেমাহলের পর্দায় নেমে আসে গাঢ় অন্ধকার।

    এক তুমুল বৃষ্টিবাদলার রাতে মাঝিদের জালে ওঠেন এক সুন্দরী মহিলা। প্রথমে তাকে মৃতদেহ ভেবে ভুল করলেও পরে বোঝা যায় সে জীবন্ত একজন মানুষী। এইখান থেকেই ন্যারেশান ক্রমশ কিসসায় প্রবেশ করতে থাকে। মহিলাটি যে ঠিক বাস্তবের চরিত্র নয় তা শুরু থেকেই স্পষ্ট রেখেছেন পরিচালক। সেই কারণেই অন্যান্য চরিত্রদের নোনা জলে, সমুদ্রের রুক্ষ হাওয়া আর কাঠফাটা রোদ্দুরে ত্বকের পালিশ, চুলের পেলবতা নষ্ট হয়ে গেলেও মহিলা চরিত্র গুলতির চেহারা থাকে একেবারে অপরিবর্তনীয় ও আলাদা করে চোখে পড়বার মতো সুন্দর। সে যে ঠিক বাস্তবের নারী নয়- রিয়েলিজমের সংজ্ঞায় তাকে ধরা যাবেনা, তা তার প্রথম অ্যাপিয়ারেন্স থেকেই খোলসা করে দিয়েছেন পরিচালক। ক্রমশ একের পর এক অলৌকিক ঘটনা ঘটতে থাকে যাতে করে তার অতিমানুষী অস্তিত্ব স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে ওঠে। একসময় বোঝা যায় সে নৌকায় এসছে এই নৌকা ডোবাতে এবং নৌকার চান মাঝিকে মারাই তার মূল লক্ষ্য। পিছনে রয়েছে পিতৃহত্যা ও তাকে কেন্দ্র করে এক দীর্ঘ প্রতিশোধের গল্প। বেদের মেয়ে গুলতি- প্রতিশোধের আগুনে তার দুই চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে। দর্শক হিসাবে মনে হতে থাকে এ গল্প যেন খুব চেনা। বিশেষত গুলতি যখন মাঝসমুদ্দুরের মাঝে তার মৃত প্রেমিককে জড়িয়ে শুয়ে থাকে- আর বড়ো বড়ো ঢেউ এর আঘাতে ভেসে যায় ভেলা… স্পষ্ট হয়ে ওঠে বেহুলা লখিন্দরের রেফারেন্স। অদ্ভুতভাবে চান মাঝির সাথে চাঁদ সওদাগরের নামটি রেসোনেট করায় এই রেফারেন্স আরো জোরদার হয়। মেজবুর রহমান সুমন অত্যন্ত সুনিপুণভাবে চান মাঝির সাথে ঠিক সাতজন জেলেকে রেখেছেন যারা একে একে বিবিধ দুর্ঘটনায় মারা পড়েন। ভেবে দেখুন- চাঁদ সওদাগরের সাত ছেলেকে একে একে জাহাজ ডুবিয়ে মেরেছিলেন মনসা দেবী। মিথ- হয়ে ওঠে আরো প্রাসঙ্গিক। ছবির চরিত্র ইবা যখন গুলতিকে ছবির মধ্যেই জিজ্ঞাসা করে- “এটা কি কিসসা?”, গুলতি উত্তর করে- “হ”। গুলতির কথার সূত্রে আসে ভীষণ রাগী এক দেবীর কথা, বেদেনিদের কথা, সাপেদের কথা। উল্লেখযোগ্য এই- হাওয়া ছবিটি কিন্তু কখনোই কোনো একটি বিশেষ টেক্সটের এডাপ্টেশান হয়ে উঠতে চায়নি, বরং অত্যন্ত সুচতুরভাবে গল্পের অবতলে রেখে দিয়েছে মঙ্গলকাব্যের রেফারেন্স। উপকথা বা ফেয়ারিটেল এ যেমন কি কি ঘটবে তা গল্পের শুরু থেকেই একরকম জানা থাকে মানুষের- তেমন এই গল্পের পরিণতি যে কি তা একটা সময়ের পর স্পষ্ট হয়ে যায়। বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে মাঝিমাল্লারদের মিথ। সমুদ্রের যে মিথ ঘিরে থাকে তাদের- তাই সাপের লেজের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে চরিত্রদের ভূত, বর্তমান ও ভবিষ্যত। আমরা জানি মৃত লখিন্দরকে নিয়ে ভাসতে ভাসতে দেবতাদের নাচেগানে সন্তুষ্ট করে তার প্রাণ ফিরিয়ে আনবেন বেহুলা। ছবির শেষ শটে গুলতি তার মৃত প্রেমিকের দেহ জড়িয়ে থাকে আর নৌকা ভেসে যায় ঢেউ এর ধাক্কায়। এরপর হয়তো প্রেমিক প্রাণ ফিরে পাবে- শান্ত হবে মনসার রাগ। চান মাঝি আর কারোর সাথে বদমেজাজ দেখাবেন না, অনুগত থাকবেন দেবীর। নাঃ, হাওয়া-তে এমন কিছুই আর বলা নেই। তবে পর্দা অন্ধকার হয়ে যাওয়ার পর এইটে আমরা ভেবে নিতেই পারি- এইটে ঘটতেই পারে পর্দার রিয়েলিজমের বাইরের স্পেসে। অত্যন্ত বুদ্ধিমান চিত্রনির্মাতা মেজবুর রহমান সুমন দর্শকদের জন্য, কিসসার শ্রোতাদের জন্য সেই কল্পনার স্পেস দিয়ে গেছেন ছবির শেষ দৃশ্যের মিজ-অন-সিন এ।    

    এখন এই মিথের রেফারেন্স স্বরূপ মিজ-অন-সিন এর ব্যবহার বারংবার দেখা গেছে সারা ছবিটি জুড়ে। গভীর রাতে সকলে ঘুমিয়ে পড়বার পর গুলতি সমুদ্রে ডুব দিয়ে আসে। স্নান শেষে সে তার ভিজে শাড়ি মেলে দেয়, পা দুলিয়ে দূর সমুদ্রের দিকে চোখ মেলে থাকে সে। আর সমুদ্রের হাওয়ায়, বোটের মেদুর আলো আঁধারিতে ভাসতে থাকে তার লম্বা শিফনের শাড়ি। শব্দে একধরণের আনক্যানি- যা থিম মিউজিকের মতো বারংবার ফিরে আসে গুলতির নানান  অ্যাপিয়ারেন্সেই। ক্যামেরা লং শটে দেখতে থাকে এই দৃশ্য। চুল মেলে নৌকার উপরে বসে আছে সুন্দরী এক কন্যা- প্রবল হাওয়ায় উড়ছে তার সদ্য মেলা গোলাপি কাপড়। মাঝদরিয়ায় আকাশ আর দরিয়ার ঘননীল মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে। এমন এক মিজ-অন-সিন এর নির্মাণ বা এই বিশেষ ইমেজটি রূপকথার গল্পের দ্যোতক হয়ে আসে। রূপকথার রাজকন্যার এই আইকনোগ্রাফির ব্যবহার গুলতির চিত্রায়ণে বারংবার ফিরে এসছে। বিভিন্ন সময় ক্যামেরা গুলতিকে এমনভাবে ফ্রেম করেছে, যাতে করে তার চরিত্রের মধ্যে থাকা ফেয়ারিটেল এলিমেন্টগুলি প্রকট হয়। মিথের রেফারেন্স হয় আরো স্পষ্ট। 

    ন্যারেশান থেকে গুলতি একসময় উধাও হয়ে যায়। তার সশরীর উপস্থিতি আর টের পাওয়া যায়না। তবে তার অন্তর্ধানের পরেও সে যে অশরীরে ন্যারেশানের একেবারে কেন্দ্রেই রয়ে গেছে এবং মিথের নিয়মমতো ন্যারেশানকে নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে তা ছবিটির কিছু মিজ-অন-সিনে অত্যন্ত সুচতুরভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। এই সূত্রে আমি দুইটি মিজ-অন-সিনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করবো। বোটের ঘটনাক্রম যখন ক্রমশ অস্বাভাবিক থেকে অস্বাভাবিকতর বা bizarre হতে থাকছে- ক্যামেরা কয়েকবার বোটের উপর থেকে সোজা চলে যায় বোটের অবতলে।
    ১। বোটে আর গুলতি নেই, কিন্তু বোটের নীচে সমুদ্রের মধ্যে ভাসছে বোটে আটকে পড়া ছেঁড়া কাপড়ের টুকরো। তা ঠিক কিভাবে ওইখানে আটকে পড়লো তা সঠিকভাবে বোঝা না গেলেও এই দৃশ্য হাওয়ায় উড়তে থাকা গোলাপি শাড়ির মিজ-অন-সিন কে মনে করায়। ২। নৌকার উপরে জটিল অলৌকিক ঘটনাক্রম চলছে। ইতিমধ্যে, রাতেরবেলা ঠিক নৌকার নীচেই ঘুরতে দেখা যায় একটি বড়ো মাছকে। মাছটি আর কোথাও যায়না- নৌকাটিকে আবর্তন করে তার চারিপাশেই ঘুরতে থাকে। এই মাছই যেন নৌকার ঘটনাক্রমকে নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে। সাউন্ডে শোনা যায় সেই আনক্যানি মিউজিক। এই দৃশ্য ও শব্দ নির্মাণ দর্শককে মনে করিয়ে দেয় রূপকথার গুলতির কথা- যে মাছ হয়েই সমুদ্র থেকে উঠে এসেছিলো।

    রূপকথার এই ভীষণ নায়িকা হঠাৎ করে যেমন এসেছিলো, তেমন হঠাৎ করেই উধাও হয়ে যায় একদিন। তবু তার স্মৃতি আচ্ছন্ন করে রাখে ন্যারেটিভকে।

    মিথের প্রসঙ্গে এতো কথাই যখন হলো, তখন এই সূত্রে আরেকটি ছোট্ট সমালোচনার প্রসঙ্গ এনে লেখাটির শেষ টানা যাক। মিথ বা পুরাকথা তো প্রচলিত কথা- মুখে মুখে ফেরা মানুষের গানের মতো। অর্থাৎ, মিথ এর মূল গল্প আমাদের সকলেরই জানা। জানা বলেই একই গল্পের পুনর্কথন এতো উদ্বেলিত করে আমাদের। একই গাথা বারবার শুনতে ইচ্ছে করে- প্রত্যেক পুনর্কথনে উন্মোচিত হয় নতুন পরিসর। এখন চেনা গল্প বা চেনা কিসসা যদি মিথ এর কেন্দ্রে থাকে- তাহলে বোঝাই যাচ্ছে আসলে এই গল্প আছে একটি জনজাতির কালেকটিভ আনকসাস[1] এ। এক যুবার বাঁশির আওয়াজে রাতের আঁধারে উন্মত্ত কোনো যুবতী যদি ঘর ছেড়ে ছুটে বেরিয়ে যায়- ভারতীয় পাঠকদের স্বভাবতই মনে আসবে রাধা কৃষ্ণের রেফারেন্স। একইভাবে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে এরকম আরো কতো কতো মিথ। লায়লা-মজনু, শিরিন-খসরু, রাম-সীতা অথবা ত্রিস্তান-ইসল্টে। মিথ অর্থাৎ যে গল্প চোখে আঙুল দিয়ে বলে দিতে হয়না প্রতিবার- বরং, এই গল্প এক জনজাতি বা পরিসরের কালেক্টিভ স্মৃতিতে আছে বলে সামান্য রেফারেন্সেই এর আঁচ পাওয়া যায়। সমুদ্রে, জেলেদের মহল্লায় এমন অনেক মিথ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। এইসব মিথগুলি আঞ্চলিক। হাওয়া এমনই একটি মিথকে কেন্দ্রে রেখে গঠিত যেখানে মাছ হয়ে সমুদ্র থেকে উঠে আসে এক মেয়ে- তার পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিতে। মেয়েটি বোটে আসবার পর থেকেই যে আবহাওয়া খানিক অস্বাভাবিক- এমনটা ছবির শুরু থেকেই প্রকাশ পাচ্ছিলো। ছবির মিজ-অন-সিন, দৃশ্যগঠন- সমস্তটার মধ্যেই যে মিথিকাল এলিমেন্ট প্রকাশ পাচ্ছিলো তা শুরুর পর্বেই ব্যাখ্যা করেছি। বহু সমালোচক (এই সূত্রে আনন্দবাজার পোর্টালের একটি লেখা উল্লেখযোগ্য[2]) সমুদ্রের মাঝে গুলতির পরিপাটি চেহারা, লিপস্টিক লাগানো ঠোঁট ও কাজলের সমালোচনা করেছেন। সমালোচকের মতে, সমুদ্রের মাঝখান থেকে উঠে আসা গুলতির এই মেক আপ অস্বাভাবিক। কিন্তু গুলতি তো বাস্তবের চরিত্র নয়। প্রথম থেকেই চিত্রনির্মাতা স্ক্রিনে তার বেশভূষার নির্মাণ দিয়ে তা বুঝিয়ে দিয়েছেন। গুলতির পরিপাটি সৌন্দর্য- তার তাকানো- পোশাক পরিচ্ছদ আর তাকে কেন্দ্র করে মিজ-অন-সিন এর নির্মাণ- এই সমস্তকিছুর মধ্যেই চিত্রনির্মাতা সাজিয়ে রেখেছেন রূপকথার উপাদান। তবে এই সাজানো অত্যন্ত নুয়ান্সড(nuanced), যাতে দর্শকের স্মৃতিতে হানা দেয় এই যোগসূত্র – সরাসরি তার উল্লেখ না করে দিয়েও। আমার মতে গুলতির পিতৃহত্যার স্মৃতি ও সেই সংক্রান্ত প্রতিশোধের গল্প সংলাপে সরাসরি না বলে দিয়ে তাকে ন্যারেটিভের মধ্যে আরেকটু আড়াল করে বলা যেতে পারতো। সেক্ষেত্রে দর্শকেরই অবকাশ থাকতো সেই আড়াল থেকে তাকে আবিষ্কার করবার। গুলতির রহস্য ও তার অতীতের সমস্তটা তার মুখ দিয়ে বলানোর জন্য গল্পের বাঁধুনি খানিক দুর্বল হয়ে যায়। মিথ যেহেতু চেনা, যেহেতু তা কালেকটিভ মেমরির অংশ, সেই মেমরিকে উদ্দেশ্য করে কেবল ইঙ্গিতটুকু ছুঁড়েও থেমে থাকা যেতো। এতে করে চেনা পুরাকথার কথন হতো মায়াবী, জটিল ও আরো অনেকটা রহস্যময়।

    তথ্যসূত্র

    1.কালেকটিভ আনকনশাসঃ সুইৎজারল্যান্ডের মনরোগ বিশেষজ্ঞ ও সাইকোঅ্যানালিস্ট কার্ল ইউং (Karl Jung) এর একটি ধারণা। ওনার লেখা The Structure of Unconscious(1916) প্রবন্ধটিতে প্রথম এই ধারণাটির উল্লেখ করেন।

    2. https://www.anandabazar.com/entertainment/review-of-chanchal-chowdhury-starrer-bangladeshi-film-hawa-dgtl/cid/1380596

  • হাওয়া : একুশ শতকের নতুন বাংলা ছবির সূচনাবিন্দু?

    হাওয়া : একুশ শতকের নতুন বাংলা ছবির সূচনাবিন্দু?

    এতক্ষণে সবাই নিশ্চই হাওয়া (২০২২) ছবিটির কথা জেনে ফেলেছেন। নন্দনে পরপর শোয়ে রেকর্ড পরিমাণ ভিড় – ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, আজ অবধি নন্দনে কোনো ছবিতে দর্শকদের দীর্ঘ লাইন নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এত বেশী পরিমাণ নিরাপত্তাকর্মীর প্রয়োজন পড়েছে বলে স্মরণকালের মধ্যে দেখিনি। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সাধারণত নন্দন ১-এ প্রদর্শিত সব ছবির জন্যই লাইন পড়ে – কিন্তু তাই বলে সোমবার সকাল দশটার শো দেখার জন্য ভোর ছটা থেকে মানুষজন লাইন দিচ্ছেন – এমনটা বাংলা তো দূরের কথা, কোনো ছবির জন্যই কলকাতার বুকে হয়েছে বলে আমার অন্তত জানা নেই। কলকাতার মানুষ দুহাত ভরে গ্রহণ করেছেন বাংলাদেশের ছবিটিকে  – যে কোনো সিনেপ্রেমীর জন্যই এ খুব আনন্দের বিষয়।

    এ লেখায় আমি হাওয়া ছবিটির জনপ্রিয়তার রহস্য অনুসন্ধান করতে বসবো না, সে কাজে আমার চেয়ে যোগ্য মানুষ অনেক আছেন। আমি শুধু একটা বিষয়ে নজর ঘোরাতে চাইব। হাওয়া একটি বিশেষ ধরণের মূলধারার ছবি – যে ধরণের ছবিকে বিশ্বায়নপরবর্তী আন্তর্জাতিক মার্কেট মূলত ইন্টারনেটের সাহায্যে সারা বিশ্বে জনপ্রিয় করে তুলেছে। অর্থাৎ শোলে (১৯৭৫)কিংবা বেদের মেয়ে জোসনা (১৯৮৯)জাতীয় ছবি, যা একটা সময় পর্যন্ত উপমহাদেশের মার্কেট নিয়ন্ত্রণ করত, তাদের চেয়ে আকারে ইঙ্গিতে দৃশ্যে শব্দে হাওয়া ভীষণ, ভীষণ আলাদা। আত্মীয়তা যদি টানতে হয়, টানা যেতে পারে সমকালীন হলিউডি ছবির সঙ্গে, (ছবিটি দেখার পর প্রায় আমার সমবয়সী এক দর্শক তাঁর বন্ধুকে বলছিলেন, যেন হলিউডের ছবি দেখলাম) যে বিষয়ে পরে খানিক আলোচনা করার ইচ্ছে রয়েছে। আপাতত ছবিটির অত্যন্ত জরুরী কিছু অর্জনের কথা বলা যাক। 

    ছবিটি দেখতে বসে পশ্চিমবঙ্গের দর্শক হিসেবে সবার আগে যে কথা মনে হয় – ছবির ভাষার উপর এই মানের  দখল এই মুহূর্তে এপার বাংলায় মূলধারার কোনো চলচ্চিত্র পরিচালকেরই আছে বলে মনে হয় না। একটা গল্প – তাকে দৃশ্য আর শব্দের ভাষায় কীভাবে নির্মাণ করতে হয়, কীভাবে ঘটনার বুনোট জুড়ে জুড়ে সিঁড়ি ভাঙার মতো করে ক্লাইম্যাক্সের দিকে এগিয়ে যেতে হয়, কীভাবে কিছু মোটিফ বারবার ফিরিয়ে এনে মোক্ষম সময় মোচড় দিয়ে তাকে অর্থবহ করে তুলতে হয় – এসব কাজ হাওয়া-র নির্মাতারা অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে করেছেন। ধরে নিচ্ছি পাঠকদের অনেকেই ছবিটি দেখেছেন – মনে করুন নৌকোর নোঙরটির ব্যবহার। শুধুমাত্র নোঙরের সঙ্গে ক্যামেরা জুড়ে জলের ভিতরে ঢুকিয়ে দেওয়ার কারিগরি চমকই নয়, বরং ছবিতে বারবার নোঙর ফিরে আসে একটি মোটিফ হয়ে – মোটিফ অর্থাৎ কাহিনীর বুননে এমন কিছু উপাদান যা একাধিকবার ফিরে এসে গল্পের বুনোটকে শক্তিশালী করে তুলবে তো বটেই, সম্ভব হলে তা পাল্টে যাবে অর্থের দিক থেকেও। ছবিতে বারবার নোঙরটিকে দেখানো যে অকারণে নয় (যেমনটা এপারের নিরানব্বই শতাংশ ছবির বেলায় হয়) -, তা বোঝা যায় যখন ছবির শেষে নোঙর আলগা হয়ে গিয়ে জলের নীচের মাটির সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে ফেলে গোটা নৌকোটি, ফলত চরিত্ররা অনিবার্য ধ্বংসের মুখোমুখি হয়। শৈলীর একটি উপাদানকে (নোঙরের ক্লোজ শট) এইভাবে ছবির অর্থের সঙ্গে সংযুক্ত করে ফেলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ – হাওয়া-র নির্মাতারা যা সার্থক ভাবে করেছেন। একই কথা বলা যায় ছবিটির মুখ্য এবং একমাত্র মহিলা চরিত্র গুলতির একটি নির্দিষ্ট কাজকে – সে যখন হাওয়ায় তার ভেজা শাড়ি শুকোতে দেয়। হাওয়ায় উড়ন্ত শাড়ির শটগুলি অর্থের দিক থেকে চরিত্রটির রহস্যময় সেনসুয়ালিটি, কাহিনীর পুরাণধর্মীতা এবং আঙ্গিকের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ মোটিফ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যথারীতি শেষে যার অনুপস্থিতি দৃশ্যমান হয় চাঁদের আলোয় প্রায় একই অ্যাঙ্গেল থেকে দেখা অন্য একটি ছেঁড়া কাপড়ের ব্যবহারে। এরকম উদাহরণ আরও অনেক দেওয়া যায় – কিন্তু আপাতত যা বলার – হাওয়া ছবিটি অত্যন্ত মুন্সিয়ানা এবং যত্নের সঙ্গে বানানো সমকালীন বাংলাভাষার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মূলধারার কাজ। 

    শুধুমাত্র আঙ্গিকগত সৌষ্ঠবই নয় – আমি নজর ঘোরাতে চাইব ছবিটির (এবং বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ছবির) দুটি বিশেষ দিকে। প্রথমত, হাওয়া জুড়ে রয়েছে এক বিশেষ ধরণের শারীরিকতা, যা বাংলা ভাষার সিনেমায় এত তীব্রভাবে চট করে উঠে আসে না। এখানে বলা প্রয়োজন – শারীরিকতা বলতে আমি যৌনতার কথা বলতে চাইছি না – নারী শরীরের খোলামেলা প্রদর্শনের সঙ্গে ছবির সাবালকত্বের হাস্যকর তুলনা করে কিছু বছর আগে বাংলা ছবি অবশেষে সাবালক হয়ে উঠল বলে দাবি করছিলেন কলকাতার বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবিরা। কিন্তু এত কিছু থাকতে হঠাৎ নারীর (প্রায়) নগ্ন শরীরই কেন সিনেমাকে রাতারাতি সাবালক করে দেবে, এর উত্তর তাঁরা কেউ দেননি। হাওয়া ছবিটির সাবালকত্বে এই ধরণের কোনো ফাঁকিবাজি নেই, বরং আছে দীর্ঘকাল ধরে নিষ্ঠাভরে কাজ করে যাওয়ার প্রকাশ। প্রান্তিক মানুষের ইমেজ মূলধারার ছবিতে বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা দীর্ঘদিন ধরেই হয়ে আসছে – কিন্তু টালিগঞ্জের বাংলা ছবির গা থেকে যে উগ্র শহরকেন্দ্রীক গন্ধ ছাড়ে, যা শুরু হয় সাউথ সিটির পারফিউম এবং শেষ হয় বৈঠকখানার বিয়ারের বোতলে (মাঝে মাঝে কেউ কেউ দাবি করেন গ্রাম দেখাচ্ছি, অতএব দারুণ ছবি বানালাম) – সেইসব আবর্জনার সামনে হাওয়া প্রান্তিক মানুষের শরীরের জ্বলজ্যান্ত, দগদগে রূপ প্রকাশ করে যা দর্শককে, আধুনিক চলচ্চিত্রতত্ত্বের ভাষা ধার করে বলা যায়, প্রায় visceral একটি অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে নিয়ে যায়। ইদানীংকালের পশ্চিবঙ্গের বাংলা সিনেমায় গ্রামে গিয়ে শহুরে অভিনেতারা অভিনয় করতে শুরু করলেই কী বিশ্রীরকম মেকি লাগতে শুরু করে, তা জানার জন্য ছবিগুলো একবার চালিয়ে দেখলেই হয়। হাওয়া ছবিতে চঞ্চল চৌধুরী সহ জেলেনৌকার প্রত্যেক মাঝির চরিত্রে অভিনয় করা পুরুষ অভিনেতাদের শরীরী ভাষায় ফুটে ওঠে এই visceral অভিজ্ঞতার উপাদান। নিজেদের বাচন, কন্ঠস্বর, শরীরী ভাষা – সব মিলিয়ে অভিনেতারা তাঁদের সাধারণ নিয়মমাফিক শারীরিকতা ভেঙে দিয়ে ভিন্ন পরিসরের মানুষ হয়ে উঠতে চান। চলচ্চিত্রে বাস্তববাদ বলতে আমরা যা বুঝি, তারই নতুন এক ধরণের রূপ এই বিশেষ গোত্রের আঞ্চলিক বাস্তবতাবাদ – যেখানে নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চল, তার মানুষ, তাদের ভাষা, বাচন-কে সিনেমা তার সমস্ত যান্ত্রিকতা অবলম্বন করে ধরে রাখতে চায়, কিন্তু একই সঙ্গে তার এক পা দেওয়া থাকে অতিবাস্তব fable বা রূপকথাধর্মীতায়। বাস্তব এবং অতিবাস্তব জুড়ে থাকে হাত ধরাধরি করে – বাস্তবকে ছাপিয়ে যাওয়ার উপাদান হিসেবেই জমি প্রস্তুত করে সুক্ষ্ম, নিঁখুত ডিটেল সম্বলিত অঞ্চলের বাস্তবতা। সারা পৃথিবীর আন্তর্জাতিক ছবির মানচিত্রে এই ভিন্ন ধরণের বাস্তববাদী ছবি উঠে আসছে, যেখানে ধ্রুপদী বাস্তবতার যৌক্তিক কাঠামোর পরিবর্তে জরুরী হয়ে উঠছে এই ধরণের নিবেদিত আঞ্চলিকতা। আমরা আপিচাটপং ভীরাসেথাকুল কিংবা পেদ্রো কোস্তা জাতীয় পরিচালকদের ছবির কথা মনে করতে পারি (হাওয়া-কে এঁদের ছবির সঙ্গে তুলনা করছি না, কেন করছি না লেখার বাকি অংশ থেকে আশা করি বোঝা যাবে) – ভারতবর্ষেও অন্যান্য ভাষার ক্ষেত্রে গুরবিন্দর সিং, সানাল কুমার সশীধরণ, হাওবাম পবন কুমার-দের ছবির পাশাপাশি বাংলাদেশের বেশ কিছু ছবি, যেমন নোনাজলের কাব্য (২০২০)র কথা বলা যেতে পারে, যাঁরা এই ভিন্ন ধরণের বাস্তব ছবির গোত্রে আন্তর্জাতিক সিনেমার মানচিত্রে নিজেদের ঠাঁই করে নিয়েছে। এই গোত্রের মধ্যে হাওয়া কে ফেললে আশা করি খুব ভুল হবে না। 

    দ্বিতীয়ত – বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে ছবিটির পরিসরের (স্পেস) ব্যবহার। পরিসর জিনিসটা সিনেমায় সবসময়েই খুব গুরুত্বপূর্ণ – ক্যামেরা/শব্দযন্ত্র দিয়ে যে মুহূর্তে এই পৃথিবীর ছবি/শব্দকে দেখা/শোনা শুরু হয়, সে মুহূর্তে চলচ্চিত্রে পরিসর বিষয়টি অন্য সমস্তকিছুর চেয়ে জরুরী হয়ে পড়ে। চলচ্চিত্রের ইতিহাস সাক্ষী – চলচ্চিত্রভাষার বাঁকবদলের সঙ্গে নতুন ধরণের পরিসরকে দেখতে চাওয়ার ডিজায়ার এবং সেই অনুযায়ী ছবির ভাষাকে গড়েপিটে নেওয়ার ওতপ্রোত সম্পর্ক রয়েছে। আমরা মনে করতে পারি ইতালিয়ান নিওরিয়ালিজম-র ধ্রুপদী উদাহরণকে, যেখানে স্টুডিও ছেড়ে  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ধ্বংসপ্রায় শহরের পথে ক্যামেরা নেমে আসতেই ধ্রুপদী বাস্তববাদী আঙ্গিক থেকে পরিচালকদের হ্যাঁচকা টানে বের হয়ে আসতে হয়। আমরা মনে করতে পারি পঞ্চাশ-ষাট দশকের প্যারিস শহর, যাকে নতুন ভাবে দেখার জন্য আগ্নেস ভার্দা – ফ্রাসোয়া ত্রুফো – জঁ-লুক গোদার – ক্লদ শ্যাব্রল – প্রত্যেকে নিজের নিজের চলচ্চিত্রের ব্যক্তিগতভাষা তৈরী করতে মনোযোগী হলেন। আমরা মনে করতে পারি লাতিন আমেরিকান সিনেমা, মনে করতে পারি ইস্ট ইউরোপিয়ান সিনেমা – এমনকি ইরানিয়ান নিউ ওয়েভের জগৎজোড়া খ্যাতির পিছনেও রয়েছে ইরানের শহরে-গ্রামে ক্যামেরা আয়েসে চলাচল করার মধ্যে দিয়ে নির্মাতারা যেভাবে ‘সিনেমাটিক স্পেস’ নামক আইডিয়াটিরই প্রতিসরণ ঘটান। হাওয়া ছবিটি নিজেকে যেভাবে সমুদ্রের মধ্যিখানে নিয়ে গিয়ে ফেলে দেয়, তা শুধুমাত্র নির্মাণগত দিক থেকেই চ্যালেঞ্জিং নয় (মাথায় রাখতে হবে এটি জাহাজ নয়, নৌকা – আর চলচ্চিত্রনির্মাণের সামান্য অভিজ্ঞতা থাকলেও যে কেউ বুঝবেন সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে শট নেওয়া, ক্যামেরাকে প্রায় জলের স্তরে নামিয়ে এনে ছবি তোলা কতখানি কঠিন একটি কাজ) – বরং সিনেমা এবং পরিসরের ধারণাটিকেই বেশ সম্প্রসারণ করে। একদিকে যেমন খোলা সমুদ্রের অসীম, অনন্ত বিস্তার – অন্যদিকে একই কারণে একটি মাত্র বোটে আটকে পড়ার ক্লসট্রোফোবিয়া – বিস্তার এবং বদ্ধতার এহেন যুগপৎ প্রয়োগ সিনেমার ভাষায় চট করে দেখা যায় না। ফরাসী দার্শনিক জিল দেল্যুজ সিনেমায় স্পেসের কথা লিখতে গিয়ে ‘any-space-whatever’ নামে একটি কনসেপ্টের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে পরিসর জিনিসটা কোনো নির্দিষ্ট অ্যাক্ট, কার্যকারণ সম্পর্কের বাইরে উন্মুক্ত শূণ্যতা হিসেবে বিরাজ করতে থাকে। অন্যান্য স্পেসের ধারণা থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে কিছু কিছু স্পেস স্বয়ংম্পূর্ণ হিসেবে ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চায়, যা কিনা, দেল্যুজের ভাষায়, “homogenous, de-singularizing space”। আমেরিকান দার্শনিক জেফ্রি বেল দেল্যুজের এই কনসেপ্টকে নিয়ে লিখতে গিয়ে উল্লেখ করেছিলেন সিনেমার পর্দায় মেট্রো স্টেশন, ওয়েটিং রুম, এয়ারপোর্ট টার্মিনাল জাতীয় পরিসরের আধিক্যের কথা, যা কিনা “a nomadic place, a point of transit between places of importance”। এই গুরুত্বপূর্ণ স্থান থেকে অন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চলার পথে পড়ে থাকা জরুরী কিন্তু অর্থহীন পরিসর, যা কিনা মূলত নাগরিক জীবনের প্রাত্যহিকতার অঙ্গ – দেল্যুজ একেই দেখান আন্তোনিওনির রেড ডেজার্ট জাতীয় ছবির পরিসরকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে। হাওয়া ছবিতে এই যাত্রা – point of transit-এর ধারণাটি ভিন্ন মাত্রা পায় – নাগরিক পরিসর না হয়েও,  আক্ষরিক অর্থেই ছবিটি এক অনন্ত যাত্রার কথা বলে যার কোনো শুরু কিংবা শেষ নেই (যেখানে ছবিটিকে রূপকথা হয়ে ওঠার প্রচেষ্টার সঙ্গেও জুড়ে দেওয়া যায়)। দেল্যুজের চিন্তায় খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল movement নামক ধারণাটি, যেখানে তিনি একটি বিন্দু থেকে অপর বিন্দুতে চলমানতার সময় বিন্দুর পরিবর্তে চলমানতার ধারণাটিকেই (the act of moving itself)  বেশী গুরুত্ব দিতেন। অর্থাৎ সাধারণ বুদ্ধিতে মুভমেন্ট বলতেই আমরা যেমন কতটা পথ পেরোলাম তার হিসেব কষতে বসি, দেল্যুজের ভাবনায় পথ পেরোনোর হিসেব আর মুভমেন্ট এক নয়। বরং মুভমেন্ট এই হিসেবের অতিরিক্ত একটি ক্রিয়া, যার থাকাটাই এই ‘moving itslef’কে ইঙ্গিত করে। হাওয়া ছবির সামুদ্রিক জলজ পরিসর (এক ফরাসী সমালোচক যাকে aquatic বলে উল্লেখ করেছেন) এই মুভমেন্টের ধারণার নিরিখে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ছবির অন্যতম প্রধাণ চরিত্র গুলতিকে ইবা যখন জিজ্ঞেস করে, সে যা বলছে তা সত্যি নাকি রূপকথার গল্প(কিসসা)? গুলতি বলে হ্যাঁ, এ তো কিসসাই। ছবির শেষ শটটি – যেখানে টপ অ্যাঙ্গেল থেকে নৌকোটিকে ভেসে যেতে দেখতে দেখতে যখন শুধু জল পড়ে থাক,  তারপর একই শটে ক্যামেরা মাথা তোলে, প্রত্যাশিত ভাবে নৌকোটিকে দূরে ভাসতে দেখার কথা – আমরা তা আর দেখতে পাই না। ছবির মাঝে মাঝেই যেমন সমুদ্রের বেশ কিছু অটোনমাস শট উঠে আসছিল – শেষেও নৌকোটি উধাও হয়ে গিয়ে শুধুমাত্র জল পড়ে থাকতে দেখা যায়। এহেন ‘অবাস্তব’ একটি দৃশ্যপটের ব্যবহারে একদিকে যেমন ছবিটির কিসসা হয়ে ওঠার পথ সার্থক হয় – অন্যদিকে তেমনই আখ্যানকে ধারণ করে রাখা ‘any-space-whatever’ সামুদ্রিক পরিসর, মাঝে মাঝে অটোনমাস হয়ে ওঠা সামুদ্রিক পরিসর ছবির শেষে আক্ষরিক অর্থেই একমাত্র স্বয়ংক্রিয় এজেন্ট হয়ে ওঠে। গন্তব্য বা সূচনা-শেষের বিন্দুর বদলে পড়ে থাকে শুধুই যাত্রা (movement) – আর যা কিনা ধারণ করে থাকে বিপুল এই দরিয়া। পরিসরের আখ্যান, এ ছবির নিরিখে দরিয়ার আখ্যান দরিয়ার মধ্যেই বিলীন হয়ে যায়। ছবিটিতে স্পেসের এই অত্যন্ত সার্থক ব্যবহার বিরাট এই দরিয়ায় মানুষের তুচ্ছতা, ক্ষুদ্রতার বোধকে আন্ডারলাইন করে এই গ্রহ, বিপন্ন জলবায়ু এবং সাধারণ মানুষের অসহায়তার মাত্রাকে আরও একবার মনে করিয়ে দেয়। 

    কিন্তু এত কিছু অর্জন সত্ত্বেও কয়েকটি কথা না বললে সত্যের অপলাপ হবে। হাওয়া ছবিটির একটি বড় অংশ জুড়ে আছে টক্সিক ম্যাসকুলিনিটির স্পেকট্যাকল, যা উপমহাশের প্রাত্যহিক দৈনন্দিনতার একটি বড় অংশ। বলা বাহুল্য – ছবিটি এই উগ্র পৌরুষকে সমালোচনা করার জন্যই বানানো – সমুদ্রের মাঝে পুরুষ মাঝিদের নৌকোয় হঠাৎ একটি যুবতী মেয়ে উঠে পড়লে যে ধরণের গন্ডগোল হওয়া সম্ভব, তার সবকিছুই ছবিটি দেখাতে দেখাতে যায়। আমাদের উপমহাদেশ নাম না জানা হাজার হাজার নির্ভয়া আর আসিফার দেশ – এহেন পরিসরে, ছবির চরিত্র গুলতি নিজের মুখেই বলে, পুরুষের নারীশরীর ছিঁড়ে খেতে চাওয়ার চাহিদা শুধুমাত্র মেয়ে জন্মালেই টের পাওয়া যায়। শিল্পের পরিসরে টক্সিক ম্যাসকুলিনিটির সমালোচনা উঠে আসা নতুন কিছু না – দস্তয়ভস্কির ক্লাসিক সাহিত্য থেকে শুরু করে মার্টিন স্করসেসের ছবি ট্যাক্সি ড্রাইভার – ম্যাসকুলিনিটির সমালোচনাই কাজগুলির মূল উপজীব্য। এই ধরণের শিল্পকর্ম সাধারণত টক্সিসিটি বাড়াতে বাড়াতে অবধারিত উন্মাদনা আর ধ্বংসের পথে এগোতে থাকে। হাওয়া ছবিটির ক্ষেত্রেও আখ্যানগতি আলাদা কিছু নয়। কিন্তু – এখানেই জরুরী একটা কিন্তু – ছবির শেষ পয়তাল্লিশ মিনিট যেখানে আতঙ্কিত হয়ে হাত পা পেটের ভিতর ঢুকে যাওয়ার কথা ছিল, সেখানে (দুইবার নন্দন ১-এ দেখার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি) দর্শককুল বেশ উৎফুল্ল হয়ে হাততালি বাজাতে, সিটি মারতে থাকেন। নৌকাভর্তি লোক অলৌকিক শক্তির প্রভাবে একের পর এক খুন হয়ে যাচ্ছে – এ দেখে যদি দর্শকের মজা লাগতে থাকে, তাহলে শুধুমাত্র দর্শককে দোষ দেওয়াটা বোকামি – বুঝতে হবে ছবির মধ্যেই একধরণের সেফ খেলার ইঙ্গিত আছে যা সীমানা নির্ধারিত বিনোদনের বাইরে নিজেকে নিয়ে যাওয়াটা খুব একটা সমীচিন বোধ করে না। এ লেখার শুরুতে ইন্টারনেট মারফৎ আন্তর্জাতিক সিনেমার বাজারের কথা বলছিলাম – সমকালীন হলিউডি সায়েন্স-ফিকশন থেকে থ্রিলার – সবকিছুই কমবেশী ডিস্টোপিক – ডিস্টোপিয়াকে একধরণের প্লেজারের মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলার কাজ খুব সফলভাবেই হলিউড করে ফেলেছে। যা দেখে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে যাওয়ার কথা ছিল, তা দেখে হাসি পাচ্ছে (যেখানে ছবিটি কোনো অর্থেই কমেডি নয়) – এই বাস্তবতা এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক মূলধারার ছবির নিশ্চিত ব্যবসায়িক সফলতার বাস্তবতা। হাওয়া-র ক্ষেত্রে নানান সম্ভাবনা ছিল, যা এই নিরাপদ প্লেজারের গন্ডী ছেড়ে অনেক দূর উড়ান দিতে পারত। কিন্তু যে কারণেই হোক (মূল কারণটা আন্দাজ করা কঠিন নয়) – নির্মাতারা এই গন্ডী অতিক্রম করতে আগ্রহ দেখাননি। 

    অন্যদিকে আরেকটা জরুরী বিষয় – যা বিশ্বায়নপরবর্তী ছবির বাজার নিয়ে ভাবতে বসে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় থাকে না। আন্তর্জাতিক মূলধারার ছবি নিয়ে কথা বলছিলাম একটু আগে – সেখানে শুধুমাত্র হলিউড নয়, বরং এশিয়ার পূর্ব প্রান্তের একাধিক দেশের নাম করা যায় যাদের এই ধরণের ছবি বাঙালী সিনেফিলদের কাছে খুব জনপ্রিয়। হাওয়া  ছবিটিকে নিয়ে একটু ঠান্ডা মাত্রায় ভাবতে বসলে মনে হয়, বাংলা ভাষায় নির্মিত ছবির দুনিয়ায় নিশ্চই ছবিটি জরুরী একটি ইন্টারভেনশন – কিন্তু আন্তর্জাতিক ছবির মানচিত্রেও কি ছবিটি তাই? অবধারিত ভাবে সেই কূটতর্কটি উঠে আসে – জন্ম থেকেই কি সিনেমা একটি আন্তর্জাতিক মাধ্যম নয়? লুমিয়ের ব্রাদার্স প্যারিসে ছবি দেখানোর এক বছরের মধ্যে সারা বিশ্বে চলমান চিত্রের প্রদর্শনী শুরু হয়ে গিয়েছিল – একই সঙ্গে ছবি করছিলেন ডি ডবলিউ গ্রিফিথ এবং হীরালাল সেন, কয়েক বছর পরে, ঋত্বিক ঘটক এবং জঁ-লুক গোদার। তাহলে বাংলা সিনেমা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এখনও কেন বারবার আমাদের বলতে হয়, ‘বাংলা’ ভাষায় এত ভালো ছবি হয়নি? ভাবটা এই – যেন বাংলা সিনেমা আন্তর্জাতিক সিনেমার চেয়ে বিচ্ছিন্ন একটি জগত, সেখানে নতুন কিছু করা মানেই সংশ্লিষ্ট ছবিটির কেল্লাফতে। ভারতবর্ষের ভার্নাকুলার এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ভাষার নির্মিত একটি ছবি – যা ভাষার ভৌগোলিক হিসেবেই ট্রান্স-ন্যাশনাল – তাকে কেন সবসময় আলাদা করে বিশেষ কিছু মাপজোক মেনে নিয়ে ভালো হয়ে উঠতে হবে? সন্দেহ নেই – এই প্রশ্নের মধ্যেই বাংলা সিনেমার সাম্প্রতিক দীনতার সংজ্ঞা লুকিয়ে আছে – তবুও – বারবার কেন আমাদের আঞ্চলিকতার গন্ডিতেই ছবির প্রশংসা করতে হয়? তাহলে হাওয়া জাতীয় ছবিতে যা দেখছি তা কি সিনেমার ভাষায় চেনা জিনিস, শুধুমাত্র মুখের ভাষাটা নিজের? লেখার শুরুতে উল্লিখিত ঐ তরুণী যেমন বললেন, বাংলা ভাষার হলিউডি ছবি? 

    এর উত্তর এক্ষুণি দেওয়া সম্ভব নয় – আমরা প্রশ্নটাকে রেখে যেতে পারি মাত্র। তবে এই জাতীয় দুর্বলতা কিংবা অস্বস্তিগুলো মেনে নিয়েও বলতেই হয় – আপাতত হাওয়া  ছবিটি দুই বাংলা একসাথে জয় করে নিয়েছে। খুব শিগগিরি পশ্চিমবঙ্গ থেকে এই ধরণের ছবি তৈরী হবে বলে মনে হয় না – (ব্যক্তিগত ভাবে আমার মত, মূলধারায় এইধরণের ইন্টারভেনশন করা ব্যতিক্রমী ছবি বানাবার চেয়েও বেশী কঠিন) এপারের নির্মাতারা আত্মতুষ্টির পাহাড়ে উঠে আইসক্রিম খেতে ব্যস্ত আছেন। বাংলাদেশ আমাদের আরও বেশী করে এইরকম ছবি দিক। হাওয়া যেন পরিণতি নয়, বরং সূচনাবিন্দু হয়। 

    তথ্যসূত্র

    ১) চলচ্চিত্রতত্ত্বে visceral শব্দটির ব্যবহার বহুদিন ধরেই হয়ে আসছে। মূলত সেই ধরণের স্পেকটেটোরিয়াল (দর্শকের) অভিজ্ঞতাকেই visceral বলা হয়ে থাকে যেখানে চলচ্চিত্রের ইমেজ, মূলত ভায়োলেন্সের মাধ্যমে দর্শকদের প্রায় শারীরিক সেনসেশন ঘটাতে থাকে। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে লুই বুনুয়েলের বিখ্যাত ছবি আন শিয়েন আন্দালু (১৯২৯)-র কথা, যার চোখ কেটে নেওয়ার দৃশ্য প্রসঙ্গে আমেরিকান চলচ্চিত্রতাত্ত্বিক স্টিভেন শিভারো এই শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। তাঁর The Cinematic Body বইয়ের ৫৩ নম্বর পাতায় এই আলোচনা পাওয়া যাবে। 

    ২) “Any-space-whatever” নামক কনসেপ্টটি জিল দেল্যুজের সিনেমা সংক্রান্ত প্রথম বইতে আছে। 

    Gilles Deleuze (2013), “The Affection-Image: Qualities, Powers, Any-Space-Whatevers”, Cinema 1: The Movement-Image. Bloomsbury Academic, page 115-138. 

    জেফ্রি বেলের লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯৭ সালের ফিল্ম-ফিলোজফি জার্নালে। 

    Jeffrey Bell (1997) “Thinking with Cinema: Deleuze and Film Theory” Film-Philosophy 1.1 

    ৩) https://kinoculturemontreal.com/hawa/ এই লিংক থেকে রিভিউটি পড়া যাবে। 

    ৪) এই প্রসঙ্গে চঞ্চল চৌধুরী-র স্টারডমের প্রশ্নটা জরুরী, যা এই লেখার মধ্যে আলাদা করে ব্যাখ্যা করা কঠিন। এক কথায় বলা যায়, ছবির শেষের দিকে দর্শকের উচ্ছ্বাস প্রত্যক্ষ করে মনে হয়, তা যত না ‘চান মাঝি’ নামক চরিত্রের জন্য, তার চেয়ে অনেক বেশী চঞ্চল চৌধুরী নামক স্টার-অভিনেতার জন্য – যেখানে তিনি দীর্ঘদিন কমেডি জাতীয় ছবিতে অভিনয় করেছেন। এই প্রসঙ্গে সিনেমায় ন্যারেটিভ এবং স্পেকট্যাকল – এই দুই নিয়েই আলোচনা করা দরকার যা এই স্বল্প পরিসরে সম্ভব নয়। 

  • তেহরান শহরের ভাষ্যঃ ক্রাইম অ্যান্ড সেলফ পানিশমেন্ট

    তেহরান শহরের ভাষ্যঃ ক্রাইম অ্যান্ড সেলফ পানিশমেন্ট

    ইরানের চিত্রপরিচালক জাফর পানাহি ২০১০ সাল থেকে গৃহবন্দী। রাষ্ট্রের নিষেধ ছবি বানানোয়, সাক্ষাৎকার দেওয়ায় বা ছবি সম্পর্কিত কোনোকিছুর সাথে সরাসরি যুক্ত থাকায়। তার মধ্যে থেকেও উনি বানিয়ে চলেছেন একের পর এক ছবি। ছবি বানানোর সিদ্ধান্তই যেখানে রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধ করবার মতো- সেখানে ছবিগুলো হয়ে ওঠে পানাহির যুদ্ধক্ষেত্র। এমন অবস্থায় মাসখানেক আগে তিনি চিত্রনির্মাতা মহম্মদ রাসুলুফ ও মোস্তাফা আল আহমুদের অন্যায় গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ করতে গেলে তাঁকেও পাঠানো হয় জেলে। বহু বছর যাবদ ইরান দেশের মধ্যে আটকে থাকা পানাহি এখন তিনি বন্দী হলেন সরাসরি ইরানের জেলে।

    এটি পানাহির ২০০৩ সালের একটি সাক্ষাৎকার- অপেক্ষাকৃত কম চর্চিত ক্রিমসন গোল্ড বানানোর পর। তখনো তিনি রাষ্ট্রের হাতে বন্দী হননি- তখনো তিনি ক্যামেরা নিয়ে সোচ্চারে দাপিয়ে বেড়াতে পারছেন ইরানের রাস্তাঘাট। তবু তাঁর ছবিতে, কথায় প্রকাশ পাচ্ছে রাষ্ট্রের দাপট- ক্রাইম ও সেলফ পানিশমেন্টের ভাষ্য। বর্তমানে মাহসা আমিনির রাষ্ট্রীয় হত্যার প্রতিবাদে সরব ইরান- রাস্তার মোড়ে মোড়ে আজাদী- মেয়েরা হিজাব খুলে পুড়িয়ে দিচ্ছে জ্বলন্ত আগুনে। মনে রাখতে হবে এ লড়াই কেবল মাহসা আমিনির জন্যই নয়- এ লড়াই ইরানের সমস্ত মেয়েদের জন্য যাদের কথা বারবার উঠে এসছে পানাহির কথায় ও ছবিতে। ইরানের মেয়েদের উপর নেমে আসা ভায়োলেন্স ও তাদের সোচ্চার প্রতিবাদের এই পরিস্থিতিতে পানাহিকে নিয়ে আরো বেশী বেশী করে কথা বলার প্রয়োজন। এ লড়াই এখন আর কেবল মেয়েদেরই নয়- এ লড়াই সমগ্র ইরানের স্বাধীনচেতা মানুষের লড়াই যারা প্রত্যেকেই রাষ্ট্রের অনুশাসনের হাতে বন্দী- ঠিক পানাহির মতোই।

    “এ এক অদ্ভুত সময়। আমরা না ওরা- পক্ষ বেছে নাও। বিষয় হলো, এই কথা যে কেবল জর্জ বুশ-ই বলছেন তা নয়। আজ আমার দেশেও এমন কথা উঠছে। ছকের বাইরে সামান্য কয়েক পা ফেললেই কন্ঠরোধ করতে উঠেপড়ে লাগছে রাষ্ট্র- নামের পাশে সেঁটে দিচ্ছে লেবেলঃ সমাজবিচ্ছিন্ন- ঘৃণ্য- অর্থপিশাচ- দ্বিচারী- পাষন্ড।
    আমেরিকা আমার আঙ্গুলের ছাপ নিয়ে রাখে, আমার দেশপ্রেমকে ধূলিসাৎ করতে পরিয়ে রাখে হাতকড়া- কারণ আমি ইরান দেশের চিত্রনির্মাতা। আর নিজের দেশ ইরান আমাকে বিশ্বাস করেনা, আমাকে বারবার প্রশ্নের  সামনে ফেলে- কারণ আমি একজন সমাজসচেতন চিত্রনির্মাতা”।
    -জাফর পানাহি

    রিচার্ড পর্টনঃ আমি যদ্দুর জানি ক্রিমসন গোল্ড (২০০৩) ছবিটি এক সত্যিকারের ঘটনার উপর নির্মিত। মূল ঘটনাটির সাথে ফিল্মের গল্পে কতোটা মিল রয়েছে এবং কতোটা নেই- সেই নিয়ে আপনি কি কিছু মন্তব্য করতে চান?

    জাফর পানাহিঃ ফিল্মের সাথে গল্পের মিল কেবল এখানটায়- যেখানে লোকটি সোনার দোকান লুট করতে ঢোকে। আমি ইরানের সামাজিক বাস্তবতার ছবি ধরতে চাইলেও ছবিটি একপ্রকার সত্যি ও মিথ্যের(ফিকশান) খেলা। 

    পর্টনঃ ছবির বেশ খানিক ডিটেইলিং নিশ্চই আপনার করা- যেমন হোসেইনের চরিত্রায়ণ। হোসেইন- ছিনতাইবাজ এবং একইসাথে একজন পিৎজা ডেলিভারীম্যান। পিৎজা ডেলিভারীর প্রয়োজন না পড়লে এই চরিত্রটিকে হয়তো বড়োলোকদের পাড়ায় দেখাই যেতো না। 

    পানাহিঃ যে লোকটা আসলে দোকান লুট করতে এসেছিলো- তার পেশা সম্পর্কে আমি একেবারেই নিশ্চিত ছিলাম না। গল্পে এই পেশার উল্লেখ একপ্রকার অজুহাত বা ন্যারেটিভ এক্সকিউজ বলতে পারেন- যার উপর ভর করে ন্যারেটিভটি খুব সহজেই সমাজের বিভিন্ন স্তরে যাতায়াত করতে পারে এবং দেখতে পারে সেখানে কি কি ঘটছে। হোসেইন এখানে অনুঘটক মাত্র। ওর জন্যেই আমরা শহরের দক্ষিণপ্রান্ত থেকে উত্তরপ্রান্তে অবাধ যাতায়াত করতে পেরেছি। 

    পর্টনঃ এই ছবির চিত্রনাট্য যেহেতু আব্বাস কিয়ারোস্তামির লেখা- ফিল্মের কতোটুকু ওনার ভাবনা এবং কতোটুকু আপনার? নাকি আগাগোড়া চিত্রনাট্যই যোগসাজসের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে?

    পানাহিঃ সেদিন আব্বাসের ফটোগ্রাফি এগজিবিশান। আমি আর আব্বাস গাড়িতে বসে আছি। উনি বললেন- “তুমি ঐ ছেলেটির গল্প শুনেছো যে সোনার দোকানে লুটপাট করে নিজেই নিজের মাথায় গুলি চালিয়ে দেয়?” আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই এগজিবিশান ছেড়ে বেরিয়ে আসি। খানিক ভাবনাচিন্তার পর আব্বাসকে ফোন করে বলি এই গল্পটা থেকে একটা দারুন ছবি হতে পারে যদি ছবির শুরুটা এই ছিনতাই এর দৃশ্য দিয়ে শুরু করা যায়। এরপর থেকে আমাদের ছবি নিয়ে বহু আলোচনা হয়। আমরা পাঁচ থেকে ছয়বার ইরানের উত্তরপ্রান্তে যাই। ইতিমধ্যে আব্বাস ছবিটির চিত্রনাট্য লিখে ফেলেন। তবে স্বভাবতই শ্যুটের সময় হুবহু সেটাকে মেনে চলা হয়নি- গল্পের কিছু অংশে বদল এসছেই। 

    আব্বাস কিয়ারোস্তামি ও জাফর পানাহি

    পর্টনঃ এখানে ফিল্মের কাঠামোটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। ডাকাতি দিয়ে শুরু এবং ঐ একই ডাকাতির দৃশ্য দিয়ে শেষ করবার সিদ্ধান্ত ফিল্মটির একটি শক্তিশালী জায়গা। এবং আপনি একটু আগেই বলছিলেন যে এই ভাবনাটা মূলত আপনারই ছিলো। বেশীরভাগ জায়গায় আমরা হোসেইনের চোখ দিয়েই সমস্ত ঘটনাকে দেখতে থাকি- ছবিটির এই দৃষ্টিভঙ্গীর জায়গাটা অনস্বীকার্য।

    পানাহিঃ একদমই ঠিক ধরেছেন আপনি। এই কারণেই গোটা ছবি জুড়ে আমরা হোসেইনের সাথে সাথেই থাকি। হোসেইন যা দেখেনা- দর্শকও তা দেখেনা। 

    পর্টনঃ আপনি ছবিটি শুরু করতে চেয়েছিলেন ডাকাতির দৃশ্যের স্ট্যাটিক শট দিয়ে- এবং সেটা হোসেইনের পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে। 

    পানাহিঃ একদমই তাই। আমি আমার সমস্ত ফিল্মে একজন মানুষের পয়েন্ট অফ ভিউ এর উপরেই জোর দিয়ে থাকি। উদাহরণস্বরূপ একাধিক চরিত্র সম্বলিত দা সার্কেল (২০০০) ছবিটির কথা বলা যেতে পারে। একজন চরিত্র ও তার পয়েন্ট অফ ভিউকে ছেড়ে নতুন চরিত্রে প্রবেশ করার সাথে সাথে আগের পার্স্পেক্টিভকে ছেড়ে আসে ছবিটি। 

    পর্টনঃ আমি লক্ষ্য করেছি আপনার ছবিগুলো খুব সরল সাধারণ ধারণার(কনসেপ্ট) মধ্যে দিয়ে শুরু হলেও তারা তাদের প্রাথমিক স্তরেই নতুন ভাবনাচিন্তার রসদ রেখে যায়।  

    পানাহিঃ একদমই তাই। আপনি দা হোয়াইট বেলুন (১৯৯৬) এবং দা মিরর (১৯৯৭) এর কথাই ভাবুন। ছবি দুটিতে ক্যামেরা কিন্তু ছোটো ছেলেমেয়েগুলোর আইলাইন এবং পয়েন্ট অফ ভিউ ছেড়ে কদাচিৎ দূরে সরে যায়। অবশ্যই ওদের জগতটা বড়োদের জগতের মতো প্রকান্ড নয়। দেখবেন ছবিতে আইলাইন খানিক উঁচুতে উঠে বড়োদের জগতে প্রবেশ করলেই বাচ্চাগুলো হারিয়ে যায়। সরল দৃষ্টিভঙ্গী উধাও হয়ে গেলেই দুনিয়া হয়ে ওঠে আরো কঠিন। ঝুলি থেকে বেরিয়ে পড়ে কঠিন নির্মম সত্য।   

    পর্টনঃ আমি পড়েছি আপনি আলফ্রেড হিচককের ছবি থেকে ভীষণরকমের অনুপ্রাণিত। এবং হিচকক টাইট ফোকাস পয়েন্ট অফ ভিউ নিয়ন্ত্রণের মাস্টার।

    পানাহিঃ হ্যাঁ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন আমি হিচককের সমস্ত ছবি দেখে ফেলেছিলাম। ছবি বানানোর শুরুর দিকে আমি অন্ধভাবে ওনার সম্পাদনার শৈলীকে অনুসরণ করতাম। তবে ওনার মতো করে ছবি বানিয়ে ফেলবার পর একটি বিষয় আমি বুঝতে পারি। ছবি বানানোর কৌশল অত্যন্ত তীক্ষ্ণ হলেও তাদের মধ্যে কোথাও গিয়ে মানবতার অভাব দেখা দিচ্ছে। এমন হৃদয়হীন বাস্তবরহিত ছবি তো আমি বানাতে চাইনি। এরপর আমি ছবির কৌশলের নৈপুণ্যের থেকেও বাস্তবের চিত্র তুলে ধরার প্রতি বেশী মনোযোগী হলাম। আমার কাছে ক্যামেরার গুরুত্ব আর আগের মতো রইলো না। বুঝতে শিখলাম সঠিক গল্প এবং গল্পের ধারণা থাকলে টেকনিকাল জাঁকজমকের জায়গাটা কতোটা গৌণ হয়ে পড়ে। হিচকককে আবিষ্কার করবার পর আমি আবার বুনুয়েল, গোদার এবং নিওরিয়েলিস্ট ছবিকরিয়েদের থেকেও অনুপ্রাণিত হতে থাকলাম।

    পর্টনঃ এই সূত্র ধরে আমি বলবো, আপনার ছবির আঙ্গিকে ক্লাসিকাল স্টাইল এবং একধরণের নিওরিয়ালিস্ট প্রবণতার মধ্যে একটি টেনশান বা টানাপোড়েন চলতে থাকে। 

    পানাহিঃ এটা একেবারেই যে ছবি দেখছে তার দৃষ্টিভঙ্গীর উপর নির্ভর করছে। আমার কাজ ছবি বানানো। এখন সমস্ত ছবি পরিচালকের ছবিতেই তাদের পূর্ববর্তী ছবিকরিয়েদের প্রভাব রয়েছে আবার একইভাবে পরবর্তী ছবি করিয়েদের ছবিতে বর্তমান পরিচালকদের প্রভাব থাকবে। এখন অন্য পরিচালকদের থেকে প্রভাবিত হওয়ার অর্থ এই নয় যে তাদের স্টাইলকে টুকে ফেলা হচ্ছে- বরং তাদের কাজ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নির্মিত হচ্ছে নিজস্ব ছবি বানানোর ভাষা ও শৈলী। 

    পর্টনঃ আপনার অন্যান্য ছবিতে যেভাবে প্রচুর মহিলা চরিত্রদের দেখা যায়- ক্রিমসন গোল্ডে তেমন দেখা যায় না। কিন্তু ছবির মধ্যে মহিলাদের নিয়ে বহু কথাবার্তা ও চর্চা হতে থাকে। এটা কি তাদের পরোক্ষভাবে দেখবার কোনো স্ট্র্যাটেজি? এবং আমি এর সাথে জানতে চাইবো ছবির অত্যন্ত ধনী চরিত্র পোরাং-এর এই সাংঘাতিক মিসোজিনির উৎসটাই বা কি।

    পানাহিঃ হ্যাঁ- আমার মনে হয় আপনি স্ট্র্যাটেজির বিষয়টা ঠিকই ধরেছেন। পোরাং তার কাছে আসা মহিলাটিকে বেশ্যা বলে চিহ্নিত করে- কিন্তু বলাই বাহুল্য মহিলাটি বেশ্যা নন যেহেতু তার বিবাহের সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করে পোরাং। ইসলাম ধর্মের নিয়ম অনুযায়ী ছেলে ও মেয়েদের ঘনিষ্ঠতার পূর্বেই বিবাহের প্রয়োজন। পোরাং দীর্ঘকাল আমেরিকায় থাকবার দরুন ইরানের এই ধর্মীয় নিয়মটি ঠিক বুঝে উঠতে পারেনা।

    পর্টনঃ আপনার ছবি মূলত তেহরানের শহুরে জীবনকে কেন্দ্র করে তৈরি। শ্রেণী বিভাজনের ব্যাপারটির উপর নির্দিষ্টভাবে ফোকাস করার জন্যই কি আপনার এই প্রেক্ষাপটটি বাছবার প্রয়োজন ছিলো? 

    পানাহিঃ কেবল শ্রেণী বিভাজনের সূত্র ধরে দেখা হলে ছবিটিকে একভাবে দেখা হবে- এবং এই দেখার পরিপ্রেক্ষিতটি বেশ সীমিত। কেননা আমি লক্ষ্য করেছি প্রাচ্যের লোকজন ধনী গরীবের বৈষম্যের থেকেও হোসেইনের অপমানিত হওয়ার জায়গাটি নিয়ে বেশী চিন্তিত। উঁচু শ্রেণীর মানুষদের নিয়ে হোসেইনের বিশেষ কোনো সমস্যা ছিলো না। সে চাইলে, ধনী লোকটির বাড়িতেও ডাকাতি আসতে পারতো। কিন্তু দোকানের মালিক তাকে ফ্যান্সি গয়নার দোকানে ঢুকতে বাধা দিলে সে অত্যন্ত অপমানিত বোধ করে। আসলে আমি একমাত্র সমাজের শ্রেণীবিভাজন নিয়ে কথা বলবো বলেই ছবিটি করেছি এমন নয়- বরং আমি দেখাতে চেয়েছি প্রত্যেক শ্রেণীরই কিছু নিজস্ব সমস্যা রয়েছে।  

    পর্টনঃ অর্থাৎ, সোনার দোকানীর অপমানই হোসেইনের এই ব্রেকডাউনের মূল কারণ  হিসেবে কাজ করেছিলো…

    পানাহিঃ  অবশ্যই সেটা ওর ব্রেকডাউনের একটা অন্যতম জরুরী কারণ। তবে এইটিই একমাত্র নয়। এর সাথে হোসেইনের সামাজিক জীবন জড়িয়ে থাকতে পারে। এবং এর জন্য অন্যান্য কারণ থাকাও অসম্ভব নয়। আসলে ইরানের ছবি যেকোনো বিষয়েরই নির্দিষ্ট উত্তর না দিয়ে তাকে দর্শকদের ভাবনার জন্য খুলে রাখতে চায়। যাতে নিজেদের জীবনবোধ এবং বোঝাপড়ার ক্ষেত্র থেকে দর্শকেরা নিজেদের মতো ভেবে নিতে পারে- তৈরি করে নিতে পারে নিজস্ব ভার্শান। এইটিই বোধ হয় হলিউড ছবির সাথে ইরানি ছবির মূল পার্থক্য।

    ক্রিমসন গোল্ড (২০০৩)

    পর্টনঃ ছবির শেষে এসে এই ওপেন এন্ডেড ন্যারেটিভ এর ধরণটি আরো স্পষ্ট হয়ে যায়। ধনী লোকটির বাড়িতে হোসেইনের ঘুরে বেড়ানো আর তারপরেই দোকানে চুরি করবার সাথে কোনো আপাত সংযোগ খুঁজে পাওয়া যায় না। দর্শককেই ঠিক করে নিতে হয় ঠিক কি ঘটেছিলো এই দুই সিকোয়েন্সের মাঝখানে। 

    পানাহিঃ হ্যাঁ আসলে আমার মনে হয়না ন্যারেটিভের এক পর্যায় থেকে অপর পর্যায় পৌঁছোনোর কোনো নির্দিষ্ট কারণ ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে বলে। ধনী লোকটির বাড়ির পুলে ঝাঁপ দিয়ে হোসেইনের নিজেকে শুদ্ধ মনে হয় এবং তারপরেই সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে দোকানে ডাকাতি করবার। কিন্তু সে জলে ঝাঁপ দেওয়ার পরেই ডাকাতি করতে গেলো কেন- এর কোনো উত্তর হয়না।

    পর্টনঃ এই শুদ্ধিকরণের ব্যাপারটি নিয়ে একটু বলবেন? জলে ডুব দিয়ে হোসেইন নিজেকে শুদ্ধ মনে করলো কেন বলছেন?

    পানাহিঃ জল শুদ্ধতার প্রতীক। জলে ঝাঁপ দেওয়ার পর হোসেইনের মনে হলো সে পুরোনো গ্লানি থেকে মুক্ত শুদ্ধ নতুন এক মানুষ। এবং এই নতুন মানুষটি নতুন সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম। এই বিষয়টি যেমন ধর্মীয় প্রেক্ষিত থেকে সত্য- তেমন সত্য ভৌগলিক অধর্মীয় প্রেক্ষিত থেকেও। জল থেকে উঠে হোসেইন কোনোকিছু স্পর্শ অবধি করেনা, কেবল অপেক্ষা করতে থাকে সূর্যোদয়ের। মূল চিত্রনাট্যের একটি জায়গায় ছিলো গয়নার দোকানি তার নাতিকে স্কুলে দিয়ে এলে হোসেইন তার পিছু নিচ্ছে। এই দৃশ্যটি শ্যুট করা হয়, কিন্তু গোটা ছবির নিরিখে একে অপ্রয়োজনীয় মনে হওয়ায় পরে আমি বাদ দিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।  

    পর্টনঃ আপনি আপনার ছবির জন্য বেশীরভাগ সময়েই অপেশাদার অভিনেতাদের দিয়ে অভিনয় করান। হোসেইন এর চরিত্রে যিনি অভিনয় করেছেন আমি যদ্দুর জানি তিনি স্ক্রিৎজোফ্রেনিক ছিলেন।

    পানাহিঃ হ্যাঁ। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই আমি অপেশাদার অভিনেতাদের নিয়ে কাজ করে থাকি। হোসেইনের চরিত্রের অভিনেতা বাস্তবেও একজন পিৎজা ডেলিভারিম্যান। ওনাকে ছবিটি করবার কথা বলায় উনি প্রথমে রাজি হননি। আমরা মাসখানেক অপেক্ষা করে ওনার ভাইয়ের সাথে কথা বলি যিনি নিজে একজন ডাক্তার। শেষপর্যন্ত উনিই হোসেইনকে এই চরিত্রে অভিনয় করবার জন্য রাজি করান। 

    পর্টনঃ এমন মানসিক ভারসাম্যহীন লোকের সাথে কাজ করাটা নিশ্চই খুব সহজ ছিলো না?

    পানাহিঃ ভীষণ ভীষণ শক্ত ছিলো। ওনার বিবিধ সমস্যার জন্য মাঝেমাঝেই ছবির শ্যুটিং বন্ধ করে দিতে হতো। এক এক সময় পরিস্থিতি এতোটাই হাতের বাইরে চলে যায় যে আমি দুই তিনবার ছবির প্রজেক্টটিকে বাতিল করবার কথা অবধি ভেবে ফেলেছিলাম। কিন্তু আবার সেই ভাবনায় জল ঢেলে আমি নতুন উদ্যমে শ্যুট শুরু করি। এই করতে করতে একটা সময় বুঝতে পারলাম ওনাকে কয়েকটি দৃশ্যে রাখা কিছুতেই সম্ভব হচ্ছেনা- তা মূলত ওনার অসুস্থতার জন্যেই। আমি ঠিক করি যে আমরা যদি ওর পয়েন্ট অফ ভিউ এর ওপর পুরোপুরি মনোনিবেশ করি, সেক্ষেত্রে মাঝেসাঝে দর্শকের ওঁকে না দেখলেও চলবে। হোসেইনের জন্য আমরা ফিল্মের দৃশ্যগুলিকে ধারাবাহিকভাবে শ্যুট করছিলাম। এতে করে আদপে ওর পয়েন্ট অফ ভিউ পেতে সুবিধাই হয়েছে। 

    পর্টনঃ আপনি কি সাধারণত স্ক্রিপ্টের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই শ্যুট করেন?

    পানাহিঃ হ্যাঁ, কেননা বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই আমার ছবিতে অপেশাদার অভিনেতারা কাজ করে থাকেন। সিকোয়েনশিয়ালি শ্যুট না করলে তাদের চরিত্রের মধ্যে থাকতে অসুবিধে হয়। তবে লোকেশান শ্যুটিং বা রি-শ্যুটিং এর ক্ষেত্রে সবসময় সিকোয়েন্সের পর সিকোয়েন্স বজায় রেখে শ্যুট করা সম্ভব হয়না।

    পর্টনঃ পেশাদার অভিনেতাদের দিয়ে কাজ করালে নিশ্চই শ্যুটিং স্টাইল খানিক ভিন্নপ্রকার হতো। 

    পানাহিঃ তা তো হতোই। এইক্ষেত্রে বেশীরভাগ সময় আমরা অভিনেতাদের সম্পূর্ণ চিত্রনাট্য হাতে দিইনা। তাই তারা বুঝে উঠতে পারেনা তাদের পরেরদিন ঠিক কি করতে হবে। দর্শকের মতো অভিনেতারাও গল্পটিকে অনুসরণ করতে থাকে। তবে অপেশাদার অভিনেতাদের মধ্যে একমাত্র হুসেনের ক্ষেত্রেই আমি সম্পূর্ণ চিত্রনাট্যটি আগেভাগে দিয়ে রেখেছিলাম। আসলে ওর অসুস্থতার জন্য আমি ভয়ে ভয়ে থাকতাম- আমার মনে হতো কোনো একটা যুক্তি খাড়া করে ও ছবি ছেড়ে চলে যাবে। তাও আগে থেকে হাতে স্ক্রিপ্ট পেয়ে গেলে হয়তো সে শান্ত থাকতে পারে। যদিও চিত্রনাট্যটি আদপেই হোসেইনের পছন্দ হয়নি। 

    পর্টনঃ শ্যুটে আপনি যে লাইনগুলো দিতেন- হোসেইন কি সেগুলোর ওপরেই কাজ করতো নাকি সেগুলোকে নিজের মতো করে ইম্প্রোভাইজ করে নিয়েছিলো?

    পানাহিঃ কখনো কখনো স্ক্রিপ্টে যা যা লাইন ঠিক তাই তাই সে ব্যবহার করতো আবার কখনো কখনো সম্পূর্ণটা ভুলেও যেতো। ওর এই খামখেয়ালী ব্যবহারকে আমরা চরিত্রের মধ্যে নিয়ে আসবার চেষ্টা করছিলাম। 

    পর্টনঃ ‘ক্রিমসন গোল্ড’ নামটি থেকে খুব বেশী কিছু স্পষ্ট হয়না। আপনি কি ফিল্মের এই টাইটেলটি নিয়ে কিছু বলতে চান?

    পানাহিঃ ছবিটা দেখবার পর দর্শক যাতে ‘ক্রিমসন গোল্ড’ নামটা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করে তার জন্যই মূলত এই টাইটেলের ব্যবহার। ভেবে দেখুন হোয়াইট বেলুন ছবিটিতেও কিন্তু কোথাও সাদা রঙের বেলুন দেখতে পাওয়া যায় না। কোনো কোনো সময় আমার ফিল্মের টাইটেল গুলো ব্যঞ্জনাধর্মী হয় আবার কোনো কোনো সময় তা হয়না। ‘গোল্ড’ অর্থাৎ স্বর্ণ সম্পত্তির প্রতীক আবার ‘ক্রিমসন’ অর্থাৎ লাল রঙ প্রতীক রক্তের। দর্শককে তাই আগেভাগেই বলে রাখা হচ্ছে, ছবিটির গল্পে বিত্ত এবং রক্ত- এই দুইই আশা করতে পারেন। 

    ছবিটির একটি পোস্টার

    পর্টনঃ ধনী লোকটির বাড়িতে গিয়ে কিছু লাল দাগ দেখে হোসেইন প্রথমে তা রক্ত ভাবলেও পরে বোঝে যে ওইগুলো আসলে নেল পালিশের দাগ। এইটিও কি দর্শকের সাথে মশকরা করবার জন্যই করেছেন?

    পানাহিঃ একদমই তাই!

    পর্টনঃ আপনার ছবি দেখে মনে হয় বন্ধ দরজার ওপারে কি চলছে তার সম্বন্ধে নানান ভাবনাচিন্তা উসকে দিয়ে আপনি মজা পান। যেমন একটি দৃশ্যে হোসেইন এবং ধনী লোকটিকে আমরা বন্ধ দরজার এপার থেকে ছায়ার মধ্যে দিয়ে দেখি, আবার একইভাবে অন্য এক দৃশ্যে হোসেইন এবং সেনাবাহিনীর ছেলেটি বন্ধ জানলার কাচে এক হাউজপার্টির ছায়া দেখতে থাকে। যে পার্টি ইরানে বে আইনী- তা নিয়ে দুজনের মধ্যে কিছু কথাবার্তা হয়। অর্থাৎ, আপনার ছবিতে প্রাইভেট এবং পাবলিক এই স্পেস দুটির মধ্যে ফাটল ধরানোর চেষ্টা নিশ্চই এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জায়গা।

    পানাহিঃ ইরানের জীবনে এটি একটি সত্যিকারের সমস্যা। ছেলেমেয়েদের পার্টি করতে চাওয়া মানে নিজেদের বাড়ি বয়ে বিপদ ডেকে আনা। এখানে হোসেইন ন্যারেটিভ ডিভাইস হিসাবে কাজ করে যার মাধ্যমে আমরা এই সমস্যাটিকে মেলে ধরবার সুযোগ পাই। ফ্ল্যাটের নীচে দাঁড়িয়ে থাকা হোসেইন এবং সেনার ছেলেটির চাইলেও এই পার্টিতে ঢুকতে পারবেনা। তারা কেবল বাইরে দাঁড়িয়ে দেখতে পারবে- কেননা ওরা জানে ওই জগতটা ওদের জন্য নয়। 

    পর্টনঃ সেইটা কি মূলত ওদের সামাজিক অবস্থানের জন্য? 

    পানাহিঃ কিছুটা তো অবশ্যই তাই। তাছাড়াও ইরানের চিত্রপরিচালকেরা ওইধরনের পার্টির দৃশ্য ভিতর থেকে শ্যুট করবার অনুমতি পান না। তাই আড়াল করে পর্দার ছায়ার মধ্যে দিয়ে শটগুলি নেওয়া হয়েছে। পার্টি করাই ইরানে একপ্রকার ক্রাইম। 

    পর্টনঃ কিন্তু ইরানে তো এমন পার্টি হয়েই থাকে!

    পানাহিঃ হ্যাঁ হয়ে থাকে। তবে তার উলটো পিঠ-ও রয়েছে। মাত্র দু হপ্তা আগের ঘটনা বলি। শহরের এক যুগল পার্টি করে ফিরছিলো। ফেরার রাস্তায় পুলিশ তাদের পিছু নেয় এবং পার্টি করবার অপরাধে সটান গুলি করে। ছেলেটি মারা যায়। 

    পর্টনঃ সেক্ষেত্রে আপনার সত্যিকারের পার্টি শ্যুট করতে না পারবার সীমাবদ্ধতা নান্দনিক একটি সম্ভাবনার দিক খুলে দেয়। আয়রনিকালি, একে আমরা ‘এস্থেটিক অ্যাডভান্টেজ’ বলতে পারি। এই অ্যাডভান্টেজ-এর জন্যই বোধ হয় ছবিটির নাটকীয় প্রভাব অনেক বেশী বলিষ্ঠ ও আবেদনপূর্ণ হয়ে ওঠে। 

    পানাহিঃ ঠিকই ধরেছেন। যদি কোনো ছবির প্রয়োজনে প্রেমিক প্রেমিকার ঘনিষ্ঠতা ব্যক্ত করতে হয়- আমি তা সরাসরি স্ক্রিনে না দেখাতেই অধিক স্বচ্ছন্দ বোধ করবো। দরজার ভিতর প্রেমিক প্রেমিকা থাকলে ক্যামেরাকে রেখে দেবো বন্ধ দরজার এপারে। আমার মতে, এর সিনেম্যাটিক প্রভাব অনেকখানি বেশী।  

    (তেহরানের ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট এবং ক্রিমসন গোল্ড (২০০৩) ছবিটিকে কেন্দ্র করে জাফর পানাহির সাথে রিচার্ড পর্টনের সাক্ষাৎকার।)

    উৎসঃ Cinema Scope No 17(January 12, 2003): 9-13, Reprinted by Permission of Andrew Tracy, Managing Editor, Cinema Scope.
    Jafar Panahi Interviews, Edited by Drew Todd, University Press of Mississippi/Jackson)

  • হোয়াট ইজ্ টু বি ডান / জঁ-লুক গোদার

    হোয়াট ইজ্ টু বি ডান / জঁ-লুক গোদার

    [১৯৬৮ সালের মে মাসে ফ্রান্স শহরের ছাত্র আন্দোলন সংস্কৃতির আর পাঁচটা ক্ষেত্রের মতোই সিনেমারও সর্বস্ব ধরে ঝাঁকুনি দিয়েছিল। প্রচলিত মূলধারার ছবির বিকল্প বিষয় এবং আঙ্গিক অনুসন্ধান করাই শুধু নয়, বরং স্বতন্ত্র বিকল্প পরিসর, যেখানে চলচ্চিত্রনির্মাণ থেকে শুরু করে প্রদর্শন পর্যন্ত গোটা প্রক্রিয়াটাই সংযুক্ত হয়ে গেছিল সেই যুগের বৈপ্লবিক রাজনীতির সঙ্গে। ষাটের দশকের শেষ প্রান্তে দাবানলের মতো সারা পৃথিবীতে যখন প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরূদ্ধে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ছে, তখন যে কোনো রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, কিংবা শৈল্পিক দলিলেই যে প্রতিসংস্কৃতি নির্মাণের নাছোড় আকাঙ্ক্ষা উপচে পড়বে, তা বুঝে ফেলা খুব কঠিন কাজ নয়। 

    বলা বাহুল্য, জঁ-লুক গোদার একমাত্র চিত্রপরিচালক নন, যিনি এই বিকল্প সংস্কৃতি নির্মাণের রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু গোদারের নামটা এই প্রসঙ্গে অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য – কারণ একমাত্র না হলেও গোদার বৈপ্লবিক ছবি করিয়েদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত চিত্রপরিচালক, যিনি ১৯৫৯ থেকে ১৯৬৭ পর্যন্ত পনেরোটি পূর্ণদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র নির্মাণ করেও (যার মধ্যে অধিকাংশই প্রথম সারির আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পুরষ্কারপ্রাপ্ত) প্রথাগত চলচ্চিত্র নির্মাণের পথ থেকে সরে আসলেন। ১৯৬৭ সালে নির্মিত উইকেন্ড ছবিটির শেষ টাইটেলে দেখানো হয় ‘ফিন দে সিনেমা’ – এন্ড অফ সিনেমা! অতএব সক্রিয় মাওবাদী রাজনীতিতে অংশগ্রহণকারী জঁ-লুক গোদার বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে সিনেমার সমাপ্তি ঘোষণার স্পর্ধা দেখান (কারওর মনে পড়তে পারে ১৯৬৮ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসব বন্ধ করে দেওয়ার সময় চিৎকার করে বলা তাঁর কথাগুলো – ‘স্টুপিড লোকজন! আমরা এখানে ছাত্র ধর্মঘট আর সলিডারিটি নিয়ে কথা বলছি, আর তোমরা ক্লোজ আপ ট্র্যাকিং শট নিয়ে পড়ে আছো!’)

    ১৯৬৮র কান চলচ্চিত্র উৎসবে জঁ-লুক গোদার, সঙ্গে দেখা যাচ্ছে ফ্রাসোঁয়া ত্রুফোকেও।

    ১৯৬৮ সালেই সহকর্মী জঁ পিয়ের গোরা-কে নিয়ে গোদার তৈরী করেন যিগা ভের্তভ গোষ্ঠী, যা প্রখ্যাত সোভিয়েত ফিল্মমেকারের নাম থেকে অনুপ্রাণিত। প্রাভদা (১৯৭০), উইন্ড ফ্রম দ্য ইস্ট (১৯৭০), স্ট্রাগলস ইন ইটালি (১৯৭০) জাতীয় ছবিগুলো চলচ্চিত্রভাষার দিক থেকে মূলধারার ছবির উদ্দেশ্যে আক্রমণাত্মক তো বটেই – কিন্তু তার চেয়েও জরুরি তার রাজনৈতিক আঙ্গিক – তারা চলচ্চিত্র হওয়ার থেকেও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে উৎসর্গীকৃত হতে যেন বেশী আগ্রহী (সংশ্লিষ্ট ম্যানিফেস্টোর ৩৫ নং পয়েন্ট দ্রষ্টব্য)। যে ম্যানিফেস্টো-টি (যার নাম লেনিনের বিখ্যাত বইয়ের নামে) আমরা কাউন্টার শট-এর পক্ষ থেকে তর্জমা করার জন্য বেছে নিয়েছি, সেখানে গোদার একদিকে যেন তাঁদের সেই পর্বের কাজের ব্লু-প্রিন্ট রচনা করার চেষ্টা করেছেন, যেখানে মার্ক্সবাদী বৈপ্লবিক প্রক্রিয়ায় চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রক্রিয়ার নাছোড় অনুসন্ধান জারি রয়েছে; অন্যদিকে মার্ক্সবাদের দান্দ্বিক কাঠামোকে আশ্রয় করে তিনি যেন চলচ্চিত্রতত্ত্বে অনুপ্রবেশ করার চেষ্টা করছেন, যেখানে অর্থনীতি এবং রাজনীতি ছবির আঙ্গিক নির্ধারণের প্রধানতম হাতিয়ার হয়ে উঠছে। 

    তারপর কেটে গেছে বহু যুগ, আক্ষরিক অর্থেই তার পরিমাপ পাঁচ দশক – অর্ধেক শতাব্দী। আর পাঁচটা বৈপ্লবিক গোষ্ঠীর মতোই যিগা ভের্তভ গোষ্ঠীও ভেঙে গেছে কয়েক বছরের মধ্যেই। জঁ-লুক গোদার আবার নিজেকে পাল্টে ফেলতে চেয়েছেন, চলচ্চিত্রভাষা নিয়ে নাছোড় পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে গেছেন জীবনের শেষ চলচ্চিত্র পর্যন্ত। কাউন্টার শট-এর পক্ষ থেকে আমরা যখন এই তর্জমা করার সিদ্ধান্ত নিই, তখনও জানতাম না পত্রিকা প্রকাশের দুই দিন আগে খবর পাবো, বৃদ্ধ গোদার, তাঁর নিজের ভাষায় ‘exhausted’ হয়ে স্বেচ্ছামৃত্যুর পথ বেছে নেবেন। কাউন্টার শট-এর সঙ্গে যুক্ত প্রায় প্রত্যেকের তো বটেই, এ পত্রিকার সম্ভাব্য পাঠকেরও বৃহৎ অংশ হয়তো এই শিল্পীর চিন্তা ভাবনায় জীবনের কোনো না কোনো সময় উত্তেজিত হয়েছেন – এবং সে উত্তেজনার প্রাথমিক ক্ষেত্রটা আবিষ্কার এবং অনুসন্ধানের পথে গ্রথিত। যখনই কেউ চলচ্চিত্রের চেনা পরিসরে খানিক ‘exhausted’ হয়ে গিয়ে অন্য কিছু অনুসন্ধান করতে চাইবেন, তিনি জানতে পারবেন তাঁর কাজের সঙ্গী কমরেড ছিলেন ৯২ বছরে স্বেচ্ছামৃত এক টগবগে তরুণ, যিনিও এই ঠিক একই কাজে – চলচ্চিত্রের নতুন ভাষার সন্ধান – আজীবন নিয়োজিত থেকেছেন। 

    আমাদের পত্রিকার ‘নতুন সিনেমার সন্ধানে’ বিভাগটিতে আমরা খতিয়ে দেখতে চাই – নিরন্তর সমালোচনামূলক (যার প্রতিশব্দ নিন্দে নয়) দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে চলচ্চিত্রের নতুন কোনো ভাষা খুঁজে পাওয়া সম্ভব কিনা। তাই সেই অনুসন্ধানের প্রথম লেখা হিসেবে রইল অর্ধশতাব্দী আগেকার এই ম্যানিফেস্টো – যা তার মতো করে সেই উত্তাল সময়ে ঠিক এই কাজটিই করেছিল। রাজনীতি আর সিনেমার মিশেলে কতটা সফল সেই নিরীক্ষা, মে ১৯৬৮ সফল না ব্যর্থ, উত্তর-বিশ্বায়নের যুগে পুঁজিবাদ আদৌ আর বিকল্প পরিসর তৈরী করার অবকাশ রাখে কিনা, সেইসব সামাজিক-রাজনৈতিক-তাত্ত্বিক তর্ক তো চলতে থাকবেই। আপাতত থেকে যাক বুলেটের মতো ৩৯ পয়েন্টের এই দলিল। ]

    যিগা ভের্তভ গোষ্ঠী নির্মিত ব্রিটিশ সাউন্ডস ছবির পোস্টার

    হোয়াট ইজ টু বি ডান!

    [মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত ‘আফটারইমেজ’ পত্রিকায় ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে লেখাটি প্রথম ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় প্রকাশিত হয়] 

    ১. আমাদের অবশ্যই রাজনৈতিক ছবি বানাতে হবে। 

    ২. আমাদের অবশ্যই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায়  ছবি বানাতে হবে। 

    ৩. ১ এবং ২ পরস্পরবিরোধী এবং দুনিয়ার দু’টি বিপরীত মতাদর্শের অন্তর্গত। 

    ৪. ১ দুনিয়ার ভাববাদী ও অধিবিদ্যক মতাদর্শের প্রতিনিধিত্ব করে।

    ৫. ২ দুনিয়ার দ্বন্দ্বমূলক ও মার্ক্সবাদী মতার্দশের প্রতিনিধিত্ব করে। 

    ৬. মার্ক্সবাদের সংগ্রাম ভাববাদের বিরুদ্ধে আর দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের ক্ষেত্রে যাবতীয় অধিবিদ্যক তার প্রতিদ্বন্দ্বী। 

    ৭. এই লড়াই প্রাচীনের সঙ্গে নবীনের; নতুন এবং পুরোনো চিন্তাধারার। 

    ৮. মানুষের সামাজিক অস্তিত্ব তাদের চিন্তার গতিপথ নির্ধারণ করে। 

    ৯. প্রাচীন এবং নবীনের মধ্যে চলতে থাকা দন্দ্ব হল সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যবর্তী দন্দ্বের প্রকাশ।  

    ১০. ১-এর বাস্তবায়নের অর্থ হল বুর্জোয়া শ্রেণীর অংশীদার হয়ে থেকে যাওয়া।

    ১১. ২-এর বাস্তবায়নের অর্থ সমাজের শ্রমজীবী সর্বহারা শ্রেণীর অবস্থান গ্রহণে সক্ষম হওয়া। 

    ১২. ১-এর বাস্তবায়নের অর্থ কোনো পরিস্থিতিকে বর্ণনা করা। 

    ১৩. ২-এর বাস্তবায়নের অর্থ নির্দিষ্ট পরিস্থিতির মূর্ত বিশ্লেষণ করা। 

    ১৪. ১-এর বাস্তবায়নের অর্থ ব্রিটিশ সাউন্ডস নির্মাণ করা। 

    ১৫. ২-এর বাস্তবায়নের অর্থ ইংলিশ টেলিভিশনে সেই ব্রিটিশ সাউন্ডস সম্প্রচারের জন্য সংগ্রাম করা। 

    ১৬. ১-এর বাস্তবায়নের অর্থ বস্তুজগতের নৈর্ব্যক্তিক নিয়মকানুন বুঝতে পারা, যাতে তাকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়। 

    ১৭. ২-এর বাস্তবায়নের অর্থ বস্তুজগতের নৈর্ব্যক্তিক নিয়মকানুন বুঝতে পারা, যাতে তাকে সক্রিয়ভাবে পরিবর্তন করা যায়। 

    ১৮. ১-এর বাস্তবায়নের অর্থ এই দুনিয়ার দৈন্য বিবৃত করা।

    ১৯. ২-এর বাস্তবায়নের অর্থ সংগ্রামরত মানুষকে দেখাতে পারা। 

    ২০. ২-এর বাস্তবায়নের অর্থ সমালোচনা এবং আত্ম-সমালোচনাকে হাতিয়ার করে ১-কে আক্রান্ত তথা ধ্বংস করা। 

    ২১. ১-এর বাস্তবায়নের অর্থ যাবতীয় ঘটনার ‘সম্পূর্ণ’ দর্শন নির্মাণ করা, যাকে সত্য বলে ধরে নেওয়া হয়। 

    ২২. ২-এর বাস্তবায়নের অর্থ আপেক্ষিক সত্যের নামে ক্রমাগত পূর্ণ হয়ে চলা এই পৃথিবীর ছবিকে ভঙ্গুরভাবে প্রদর্শন না করা। 

    ২৩. ১-এর বাস্তবায়নের অর্থ কোনো বিষয় কীভাবে ও কতখানি বাস্তব তা বলা। (ব্রেশ্‌ট) 

    ২৪. ২-এর বাস্তবায়নের অর্থ সমস্ত বিষয় বাস্তবিক কীরকম সেইটা বলা। (ব্রেশ্‌ট) 

    ২৫. ২-এর বাস্তবায়নের অর্থ শ্যুট করার আগেই ছবি এডিট করা, শ্যুটিং চলতে চলতে ছবি বানানো, এমনকি শ্যুটিং শেষ হয়ে গেলেও নির্মাণ প্রক্রিয়া জারি রাখা। (যিগা ভের্তভ) 

    ২৬. ১-এর বাস্তবায়নের অর্থ প্রযোজনার আগে ছবির বন্টনে মাথা ঘামানো।   

    ২৭. ২-এর বাস্তবায়নের অর্থ বন্টনের আগে ছবি প্রযোজনা করা, এমনভাবে প্রযোজনা করতে শেখা যেখান থেকেই বন্টনব্যবস্থা নির্ধারিত হয়, যেভাবে রাজনীতি অর্থনীতিকে নির্ধারণ করে। 

    ২৮. ১-এর বাস্তবায়নের অর্থ সেই ছাত্রদের ফিল্ম করা, যারা লেখেঃ ইউনিটি – স্টুডেন্টস – ওয়ার্কার্স। 

    ২৯. ২-এর বাস্তবায়নের অর্থ যে পরস্পর বিরোধী শক্তির মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালানো (লেনিন) যাতে জানা যায়, যে এই দুই আসলে এক।  

    ৩০. ২-এর বাস্তবায়নের অর্থ দৃশ্য (ইমেজ) আর শব্দ (সাউন্ড) দিয়ে সমাজের শ্রেণীসংঘাতকে পাঠ করা। 

    ৩১. ২-এর বাস্তবায়নের অর্থ উৎপাদন আর উৎপাদক শক্তির পারস্পরিক সম্পর্কের দ্বন্দ্বকে পাঠ করা 

    ৩২. ২-এর বাস্তবায়নের অর্থ কোনো মানুষ কোন অবস্থানে অবস্থিত, তা জানার স্পর্ধা রাখা; তার ইতিহাস, উৎপাদন ব্যবস্থায় তার অবস্থান সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান অর্জন করা, যাতে তাকে পরিবর্তন করা যায়।   

    ৩৩. ২-এর বাস্তবায়নের অর্থ বৈপ্লবিক সংগ্রামের ইতিহাস জেনে তার দ্বারা কৃতসংকল্প হওয়া। 

    ৩৪. ২-এর বাস্তবায়নের অর্থ বৈপ্লবিক সংগ্রাম ও তার ইতিহাসকে মন্থন করে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান নির্মাণ করা। 

    ৩৫. ২-এর বাস্তবায়নের অর্থ এ কথা উপলব্ধি করা যে চলচ্চিত্র নির্মাণ আসলে এক গৌণ কর্মকান্ড; বিপ্লবের সামগ্রিক ব্যাপকতায় তার ভূমিকা একটা ছোট্টো পেরেকের চাইতে বেশি নয়। 

    ৩৬. ২-এর বাস্তবায়নে দৃশ্য (ইমেজ) আর শব্দ (সাউন্ড) যেন কামড়ে ধরার জন্য দাঁত আর ঠোঁটের মতোই অপরিহার্য হয়ে ওঠে।   

    ৩৭. ১-এর বাস্তবায়নের অর্থ কেবল চোখ-কান খুলে সজাগ থাকা। 

    ৩৮. ২-এর বাস্তবায়নের অর্থ কমরেড কিয়াং জিং-এর রিপোর্ট পড়া। 

    ৩৯. ২-এর বাস্তবায়নের অর্থ বিপ্লবী হয়ে ওঠা।

    ছবি নির্দেশিকাঃ প্রচ্ছদের ছবি ফার ফ্রম ভিয়েতনাম (১৯৬৭) নামক অ্যান্থলজি ফিল্মের একটি ফ্রেম। ‘৬৮র কান চলচ্চিত্র উৎসবে গোদারের ছবিটি নেওয়া হয়েছে টু ইন দ্য ওয়েভ (২০১০) তথ্যচিত্র থেকে।