
ধূ ধূ নীল জলাভূমি, দিগন্তরেখায় মিশে গেছে আকাশ মাটি আর সমুদ্র। বেশ ধীর গতিতে ক্যামেরা প্যান করছে। আদিগন্ত নীল আকাশ, জল, আর সবুজ ঘাসজমির কানাকানি দেখতে দেখতে প্রথমে আমরা বুঝতেই পারি না, দূরে কখন যেন অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে একটি বা দুটি নৌকার আকৃতির কিছু। স্ক্রীনে ততক্ষণে টাইটেল পড়ে গেছে – কক্সবাজার, ২০১৮। আমরা যারা বাঙালি অথচ বাংলাদেশে থাকি না, তাদের কাছে এই কক্সবাজার নামটি নানান বিচিত্র অনুষঙ্গ নিয়ে আসে – আমার ক্ষেত্রে যেমন মনে পড়ে যায় শক্তি চট্টপাধ্যায়ের কক্সবাজারে সন্ধ্যা কাব্যগ্রন্থের কয়েক লাইন। “নিরবয়ব মূর্তি তার, নদীর কোলে জলাপাহার / বনতলের মাটির ঘরে জাতক ধান ভানছে”। কিন্তু নীলাভ এই আলো যতই কবিতার অনুষঙ্গ নিয়ে আসুক না কেন, শব্দের ট্র্যাকে ততক্ষণে আমরা শুনতে পাই, শুরু হয়ে গেছে অশুভ এক ইঙ্গিত। মন্দ্র সপ্তকে গম্ভীর ধ্বনিতে চলতে থাকা আবহ সঙ্গীত আমাদের জানিয়ে দেয় খুব দ্রুত কিছু না কিছু অঘটন ঘটতে চলেছে।

বাংলাদেশের ‘চরকি’ নামক প্ল্যাটফর্মে গতবছর মুক্তি পাওয়া মাইসেল্ফ অ্যালেন স্বপন (২০২৩) সিরিজটি শুরু হয় খানিকটা এইভাবে। ফুটতে থাকা ভাতের হাঁড়ির একটিমাত্র চাল টিপলেই যেমন চাল থেকে ভাত হয়েছে কীনা বোঝা যায়, তেমনই, শুরুর এই দুই তিনটে শটেই সিরিজের নির্মাতারা বুঝিয়ে দেন, চিত্রগ্রহণ, সম্পাদনা, অভিনয় ইত্যাদি চলচ্চিত্রের প্রাথমিক ক্রাফটের দখলে উন্নতমানের মুড নির্মাণে তাঁরা অত্যন্ত দক্ষ। সিরিজ শুরু হচ্ছে – শুধু গল্পে বা সংলাপেই ঘটনার বর্ণনা নয়, বরং শব্দ এবং দৃশ্য সম্বলিত চিত্রভাষা ব্যবহারের দক্ষতায় ঘনিয়ে আসা বিপদের ইঙ্গিতে দর্শকেরা টানটান হয়ে বসেন। নৌকা থেকে লাফ দিয়ে নামে একটি চরিত্র, ক্যামেরা মিড শটে তাকে ফলো করতে করতেই পিছন থেকে নৌকার অন্য যাত্রীদের কথাবার্তা শোনা যায়। কলকাতা কিংবা ঢাকার প্রমিত বাংলায় অভ্যস্ত দর্শকের জন্য স্ক্রীনে সাবটাইটেল আসে – একটু চমকে উঠলেও আমরা বুঝতে পারি, পিছনের সমস্ত কথা হচ্ছে চট্টগ্রামের ভাষায়, যার অধিকাংশটাই আমাদের পক্ষে বুঝে ওঠা সম্ভব নয়।
এই লেখায় আমরা মাইসেল্ফ অ্যালেন স্বপন সিরিজটির বিশেষ একটি দিক নিয়ে কথা বলব – কিন্তু সেটা করার জন্য আমাদের সিরিজের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ স্পয়েলারটি দিয়ে দিতেই হবে। তাই যাঁরা সিরিজটি এই লেখা পড়ার আগে দেখেননি, তাঁরা লেখাটি এরপর থেকে পড়লে কাহিনির অত্যন্ত জরুরি একটি উন্মোচন সম্পর্কে আগে থেকে জেনে যাবেন। তাই আগে সিরিজটি দেখে নিয়ে তারপর লেখার বাকি অংশে এগোলে পাঠক এবং লেখক – উভয়ের জন্যই সুবিধের হয়।
******

সিরিজ শুরুর কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমরা বুঝতে পেরে যাই – আমরা একটি গ্যাংস্টার জঁরের সিরিজ দেখছি। অ্যালেন স্বপন নামের বাংলাদেশের এক মাদক পাচারকারী হঠাৎই বিপদে পড়ে যায় সরকারি ভাবে পুলিশের রেড শুরু হতে। কক্সবাজারে তার নৌকো ভেড়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই বন্দুক হাতে উর্দিধারীরা ওই নৌকোর দিকে ধেয়ে যায় – আর স্বপন জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে পড়ে প্রাণ বাঁচানোর জন্য। পুলিশের রক্তচক্ষু থেকে পালিয়ে একের পর এক ফাঁড়া টপকে কীভাবে সে এক পোড়োবাড়ির মধ্যে আশ্রয় নেয়, সেই আখ্যান সিরিজে যারা দেখেছেন, নিশ্চয়ই তাঁদের স্মৃতিতে আছে – আমি ভাষায় বর্ণনা করে তার রস লঘু করে দিতে চাই না। প্রথম এপিসোডের প্রায় গোটাটাই এই পালাই-পালাই করতে করতে একদম শেষ মুহূর্তে আমরা হঠাৎ দেখি, এক আগন্তুক পুলিশে ফোন করে মৃত স্বপনকে ধরিয়ে দিতে চাইছে। দর্শককে চূড়ান্ত অবাক করে দিয়ে এই আগন্তুক যখন পিছন ফেরে, দেখা যায় সেও হুবহু স্বপনের মতোই দেখতে – শুধু পোশাক এবং চুলদাড়ির ছাঁচ আলাদা। দ্বিতীয় এপিসোডের শুরুতেই এই রহস্য সমাধান হয় – আমরা জানতে পারি স্বপনের এক যমজ দাদা আছে যে ঢাকা শহরেই একটি ছোটোখাটো ইনশিওরেন্স কোম্পানির ম্যানেজার। স্বপন বিপদে পড়ে কায়দা করে দাদাকে তার ডেরায় টেনে আনে – তারপর সুযোগ বুঝে দাদাকে খুন করে তার পোশাক দাদাকে পরিয়ে দেয়। পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে ড্রাগপাচারকারী অ্যালেন স্বপন তার দাদার ভেক ধরে, শামসুর রহমান নাম দিয়ে দাদার বাড়িতে এসে থাকতে শুরু করে।
এই অবধি সিরিজটি যাঁরা দেখেছেন, কিংবা আমার বলা গল্প অনুসরণ করে যাঁরা কল্পনা করে নিতে চাইছেন, তাঁদের এই সিরিজটিকে গ্যাংস্টার জঁর হিসেবে বুঝতে অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। সিনেমার ইতিহাসে গ্যাংস্টার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জঁর – গ্যাংস্টার বা ‘ক্রাইম ফিল্ম’ নামে ডাকা এই জঁরের ইতিহাসে ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলার বিখ্যাত গডফাদার ট্রিলজি থেকে শুরু করে মার্টিন স্করসেসের হালের দ্য আইরিশম্যান (২০১৯) – এই সবই সিনেফিলদের পছন্দের ছবির তালিকায় প্রথম সারিতে থাকবে। শুধুমাত্র আমেরিকান ছবিতেই নয়, আমাদের এদিকে, উপমহাদেশেও এই জঁরে বেশ উন্নতমানের কাজ হয়েছে হিন্দী মূলধারার ছবিতে – রামগোপাল ভার্মার সত্যা (১৯৯৮) কিংবা অনুরাগ কাশ্যপের একাধিক ছবি এই গোত্রে পড়ে। মাইসেলফ অ্যালেন স্বপন-ও শুরু থেকে উপরে বর্ণিত কাহিনি অবধি নিঃসংকোচে গ্যাংস্টার জঁরের মধ্যে থাকে – পুলিশের তাড়া খেয়ে পালাতে থাকা কুখ্যাত ড্রাগপাচারকারী ক্রিমিনাল, নির্দ্বিধায় দাদাকে খুন করে ফেলা নির্দয় নেগেটিভ চরিত্রকে কেন্দ্রে রেখে পোড়োবাড়ি, ক্রাইম সিন, হাসপাতাল, মর্গ ইত্যাদি স্পেসে সিরিজটি সুন্দর নিজেকে সাজাতে সাজাতে এগিয়ে চলে। কিন্তু এরপরেই সিরিজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মোড় আসে – এবং সেটিই আমাদের এই প্রবন্ধের মূল আলোচ্য বিষয়। তাই মূল প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে আমাদের সংক্ষেপে গ্যাংস্টার জঁর সম্পর্কে দুকথা জেনে নেওয়া যাক!
******
আমরা জানি, মূলধারার ছবির ইতিহাস নিয়ে কথা বলতে গেলেই জঁর জিনিসটা খুব দ্রুত সামনের সারিতে চলে আসে। জঁর একটি ফরাসী শব্দ, যারা ইংরেজী সমার্থক হিসেবে ‘কাইন্ড’ কিংবা বাংলা সমার্থক হিসেবে ‘ধারা’ শব্দটি (আমার ব্যক্তিগত পছন্দের শব্দ যদিও ‘গোত্র’) ব্যবহার করা যেতে পারে। চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞ ব্যারি কিথ গ্রান্ট জঁর বোঝাতে গিয়ে চমৎকার একটি সংজ্ঞা দিয়েছেন, যা সহজেই গোটা বিষয়টিকে এককথায় ব্যাখ্যা করে দেয় – ‘জঁর ফিল্ম সাধারণত সেই ধরণের পূর্ণদৈর্ঘ্যের বাণিজ্যিক ছবি যেগুলি একদিকে পুনরাবৃত্তি, অন্যদিকে সামান্য রদবদলের মাধ্যমে চেনা গল্প, চেনা চরিত্র এবং চেনা পরিস্থিতির মাধ্যমেই কাহিনির বিস্তার করে’১। অর্থাৎ থ্রিলার, হরর, গ্যাংস্টার, সায়েন্স ফিকশন মেলোড্রামা, মিউজিক্যাল, কমেডি – সিনেমার ক্ষেত্রে এই যে বিশেষ বিশেষ জঁর – আমরা জানি, তাদের নাম বললেই আমাদের চোখের সামনে এক ধরণের চেনা দৃশ্য, চেনা পরিসর, চেনা শব্দ এবং চেনা আইকোনোগ্রাফি; সঙ্গে একইধরণের চরিত্র, ঘটনার মোচড় ইত্যাদি ভেসে ওঠে। আমরা জানি থ্রিলার ছবি বললে সেখানে গোয়েন্দার উপস্থিতি প্রায় বাধ্যতামূলক। ওয়েস্টার্ন ছবি বললে পশ্চিম আমেরিকার ধূ ধূ প্রান্তর এবং বন্দুক হাতে ঘোড়ায় চড়া কাউবয় থাকতেই হবে। হরর ছবির ক্ষেত্রে বাস্তবের অতিরিক্ত অশরীরী কিছু প্রত্যাশা করতে আমরা অভ্যস্ত। জঁরের চেনা এলিমেন্ট বলতে এগুলোই – একদিক থেকে দেখলে ফরমুলার সঙ্গে এর খুব পার্থক্য নেই।
মূলধারার সিনেমার ইতিহাসে মূলত হলিউড স্টুডিও যখন থেকে সিনেমাকে মাস প্রোডাকশন – অর্থাৎ বৃহত্তর ইন্ডাস্ট্রির প্রোডাকশন ব্যবস্থা অবলম্বন করে একসঙ্গে অনেক সংখ্যায় উৎপাদন করা শুরু করে, তখন থেকেই জঁর ফিল্মের রমরমা। সহজ বুদ্ধিতেই বোঝা যায়, বাজারে বিক্রির জন্য যে কোনো পণ্যদ্রব্য প্রচুর মানুষের ব্যবহারের কথা ভেবে নির্মাণ করতে চাইলে তাতে একটা না একটা ছাঁচ লাগে – যেমন ফোর্ড কোম্পানীর মোটরগাড়ির প্রতিটিই নির্দিষ্ট কোনো ছাঁচ মেনে একই আকারে তৈরী। কিন্তু একই সাথে – ছাঁচ যেমন জরুরি, তেমনই জরুরি ছাঁচের মধ্যেও সামান্য পরিবর্তনের। শুধুই রিপিটেশন হলে পণ্যবাজারে দ্রব্য মূল্যবান থাকবে না, দরকার ভ্যারিয়েশন। জঁর ফিল্মের ক্ষেত্রে এই রিপিটেশন ভ্যারিয়েশনের খেলাটিই সবচেয়ে জরুরী – একটি জঁরের প্রায় সব ছবিরই ছাঁচ যেন এক – যেমন থ্রিলার বললে সেখানে ক্রাইম, ক্রিমিনাল, সাসপেন্স, গোয়েন্দা, রহস্য, তদন্ত এবং রহস্য উদ্ঘাটন – এই চেনা উপাদানগুলো আছেই। কিন্তু এর মধ্যেই শিল্পীরা তাঁদের মুনশিয়ানায় নানান ভ্যারিয়েশন তৈরী করেন – সময়ের সাথে সাথে এই ভ্যারিয়েশনের জন্যই জঁরের নানান প্রাথমিক বৈশিষ্ট্যও পালটে পালটে যায়। থ্রিলার গল্পের যেমন দীর্ঘদিনের প্রাথমিক ছাঁচ ছিল হুডানইট (whodunit?) কাঠামো – অর্থাৎ জটিল একটি নকশা বুনে ক্রিমিনালকে খুঁজে বের করাই গোয়েন্দার আসল উদ্দেশ্য। ফেলুদা-ব্যোমকেশের অধিকাংশ গল্পই এই হুডানইট ছাঁচে ফেলা। কিন্তু ক্রমশ গোয়েন্দা গল্পের বিবর্তনে এই কাঠামোর পরিবর্তে দেখা গেছে সাসপেন্সের প্রাবল্য – অর্থাৎ অপরাধ কে করেছে, তার বদলে কীভাবে অপরাধীকে ধরা হবে, সেইটিই হয়ে উঠেছে থ্রিলারের মূল আকর্ষণ বিন্দু। সত্যজিৎ স্বয়ং যখন সোনার কেল্লা অবলম্বনে ছবি করেছেন, প্রথম দৃশ্যেই অপরাধী কে, আমরা জেনে গেছি – বাকি রয়েছে সাসপেন্স – কীভাবে ফেলুদা অপরাধীকে পাকড়াও করবে। থ্রিলার জঁরের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ফিল্মমেকার আলফ্রেড হিচকক বারবারই বলতেন, কে অপরাধ করেছে সেটা তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং কীভাবে অপরাধীর মনের ভেতর ঢুকে গিয়ে তার যাত্রাপথের সঙ্গে দর্শককে একাত্ম করে তার অপরাধ শনাক্ত করা হবে – সেইটিই তাঁর ছবির প্রধান যাত্রাপথ। শ্যাডো অফ আ ডাউট (১৯৪৩) থেকে সাইকো (১৯৬০) অবধি প্রায় সমস্ত ছবিতেই আমরা গল্পের এইরকম চলন দেখতে পাই।
*****
এই প্রবন্ধে আমাদের আলোচ্য মূলত গ্যাংস্টার জঁর – কিন্তু তা সত্ত্বেও খানিক ইচ্ছে করেই ‘থ্রিলার’ নিয়ে আমি কিছু কথা বলতে চাইলাম। সাধারণত ‘থ্রিলার’ জঁর অনেকগুলো বিভিন্ন জঁরকে এক ছাতার তলায় ধরে রাখে। চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞ স্টিভ নিল তাঁর থ্রিলার সংক্রান্ত আলোচনায়২ স্পষ্ট দেখিয়েছেন – অপরাধী, অপরাধ, অপরাধের শিকার (ভিক্টিম), আইনের রক্ষক অর্থাৎ পুলিশ কিংবা গোয়েন্দা – এই ধরণের চরিত্র এবং তাদের কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া ঘটনা মূলত তিন ধরণের অপরাধকেন্দ্রিক ছবির প্রধাণ বিষয় হিসেবে উঠে আসে। তিনি থ্রিলারের ছাতার তলায় এই তিনধরণের ছবিকে নামকরণ করেছেন এইভাবে – ডিটেকটিভ ফিল্ম, গ্যাংস্টার ফিল্ম এবং সাসপেন্স থ্রিলার (ইংরেজী এই শব্দগুলির আমি বাংলা করছি না – কারণ এই ধরণের কাজ বলতে মূলত ইংরেজী ভাষার আমেরিকান ছবিই আমাদের দেখার অভ্যেস – তাই সবার কাছেই এই শব্দগুলো অত্যন্ত পরিচিত)। সিনেমার ইতিহাসের একদম শুরুরদিকের তিনটে ছবি – The Monogrammed Cigarette (1910), The Bold Bank Robbery (1904) এবং The Lonely Villa (1909) – পাশাপাশি রেখে স্টিভ নিল আমাদের মনে করিয়ে দেন যে তিনটিই অপরাধ-কেন্দ্রিক থ্রিলার গোত্রের ছবি – কিন্তু এই তিনটিতেই ছবির চলনে গুরুত্বের হেরফের হওয়ার কারণে কীভাবে আলাদা আলাদা জঁরের জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনা দেখা গেছে। প্রথম ছবিটির মূল চলন নির্ধারিত হয় এক প্রখ্যাত গোয়েন্দার মেয়ের অপরাধ শনাক্ত করার কাহিনির মাধ্যমে। দ্বিতীয় ছবির ক্ষেত্রে প্রাথমিক গুরুত্ব দেওয়া হয় সংগঠিত অপরাধে – কীভাবে একদল ডাকাত একটি ব্যাংক লুঠ করছে। অন্যদিকে তৃতীয় ছবিতে কেন্দ্রে চলে আসে অপরাধের শিকার ভিক্টিম মানুষেরা – এক মহিলা এবং তার সন্তান ডাকাতদের হাত থেকে বাঁচতে বাড়িতে আটকে পড়ে আছে। স্টিভ নিল আমাদের দেখান – প্রথম ছবিতে গোয়েন্দা এবং অপরাধ শনাক্তকরণের প্রক্রিয়া, দ্বিতীয় ছবিতে অপরাধীদের অপরাধ করার প্রক্রিয়া এবং তৃতীয় ছবিতে ভিক্টিমদের অসহায়তা এবং শেষ মুহূর্তে তাদের উদ্ধার হওয়ার সম্ভাবনার প্রক্রিয়া, যথাক্রমে ডিটেকটিভ, গ্যাংস্টার এবং সাসপেন্স – সিনেমার ইতিহাসে এই তিনধরণের থ্রিলারের উৎস হিসেবে খুঁজে নেওয়া যায়। অর্থাৎ ছবির প্রেক্ষিতে সাদৃশ্য থাকলেও আমরা ছবিগুলিকে আলাদা করতে পারি তাদের চলন এবং ভিন্ন বিষয়ে গুরুত্বের পার্থক্যের উপর।
*****
অতএব বোঝা গেল, গ্যাংস্টার জঁরের কেন্দ্রে থাকে অপরাধ, মূলত গোষ্ঠীবদ্ধ অপরাধীদের আখ্যান। গোয়েন্দা কিংবা পুলিশ সেখানে গৌণ – অপরাধী শণাক্তকরণের প্রক্রিয়াও গৌণ – মূল বিষয় অপরাধী স্বয়ং। এই প্রবন্ধে আমরা গ্যাংস্টার জঁর বিষয়ে দীর্ঘ সাধারণ আলোচনা করতে পারব না, কারণ সেই আলোচনা আমাদের আলোচ্য সিরিজ সম্পর্কে বিশেষ আলোকপাত করতে সক্ষম হবে না। সাধারণ ভাবে গ্যাংস্টার জঁরের বিখ্যাততম ছবি, গডফাদার ট্রিলজি-র কথা পাঠকদের ভাবতে অনুরোধ করি। সংগঠিত অপরাধ চক্র, তাদের আমেরিকান সমাজের সর্বস্তরে সংযোগ এবং সেই সূত্র ধরে ‘ক্ষমতা’ নামক বিষয়টিই এই (ধরণের) ছবির মূল কেন্দ্রবিন্দু। ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলা স্বয়ং উল্লেখ করেছিলেন, কীভাবে গডফাদারের উত্থানের মাধ্যমে আমেরিকান পুঁজিবাদের একটি রূপকধর্মী আখ্যান তিনি উপন্যাসটি পড়তে পড়তেই খুঁজে পেয়েছিলেন।
শুধুমাত্র আমেরিকান গ্যাংস্টার ছবিই নয় – অপরাধ এবং মাফিয়া চক্র যে কোনো গ্যাংস্টার ছবিরই মূল কেন্দ্রে থাকে। আমরা যদি উপমহাদেশ থেকে উদাহরণ খুঁজতে চাই – ধরা যাক ম্যাকবেথের কাহিনী অবলম্বনে বিশাল ভরদ্বাজের মকবুল (২০০৩)। এই ধরণের ছবি আধুনিক পৃথিবীর বড় বড় মেট্রোপলিটন শহরের পেটের ভিতর লুকিয়ে থাকা আরেকটি শহর – ইংরেজী ভাষায় যাকে বলে আন্ডারওয়ার্ল্ড – মূলত সেই ধরণের জগতের উপর প্রাথমিক জোর দেয়। আন্ডারওয়ার্ল্ডে থাকা পরিবারকেন্দ্রিক অপরাধ চক্র – যেখানে বংশানুক্রমে, মূলত পিতৃতান্ত্রিক ভাবে বংশের পুরুষেরা ক্রমশঃ আন্ডারওয়ার্ল্ডের রাজা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
উদাহরণ বাড়িয়ে পাঠককে ভারাক্রান্ত করতে চাইবো না – তবে এইটুকু শুধু মাথায় রাখতে বলবো – গ্যাংস্টার ছবির আইকনোগ্রাফির৩ কথা। আমরা শুরুতেই বলেছি, যে কোনো জঁরেই আখ্যান, চলন, চরিত্রের মত আইকনোগ্রাফিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জিনিস। এদেশে কিংবা বিদেশে, গ্যাংস্টার জঁরের ক্ষেত্রে আমাদের পরিচিত ইমেজগুলির কথা আমরা জানি – যা দেখলেই কোনো ছবিকে গ্যাংস্টার বলে চেনা যায়। আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্ধকার, হাই কনট্রাস্ট সিনেমাটোগ্রাফির মাধ্যমে গ্যাংস্টার ছবিতে আমরা অপরাধীদের বাসস্থান দেখি, অন্ধকার রাতের শহর এবং ছুটন্ত গাড়ি সেখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সঙ্গে থাকে অপরাধ-গোষ্ঠীর নেতা এবং তার অনুগত সাঙ্গোপাঙ্গোর দল। প্রয়োজনে পরিবার, পরিজন, এবং মহিলা চরিত্র আসতে পারে, গডফাদার ট্রিলজি তে মহিলা চরিত্রদের উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ – কিন্তু তা আসে মূলত সংশ্লিষ্ট অপরাধ গোষ্ঠীর পিতৃতান্ত্রিক রূপটিকে বিশেষ করে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যই। এর সঙ্গেই থাকে সমাজের উচ্চতম অংশের মানুষজনদের বিনোদনের পরিসর – বেশীরভাগ গ্যাংস্টার ছবিই অপরাধী গোষ্ঠী কীভাবে উচ্চতম এবং নিম্নতম সামাজিক গোষ্ঠীকে ক্ষমতার এক সূত্রে বেঁধে রাখে, তা স্পষ্ট করে দেখাতে চায়। অর্থাৎ অত্যন্ত ধনী ব্যক্তিদের নাইটক্লাব এবং শহরের ঘিঞ্জি বস্তি কিংবা বেশ্যাপাড়া – এই আপাত দুই মেরুর পরিসর এবং আইকোনোগ্রাফির মধ্যে গ্যাংস্টার ছবির অবাধ চালচলন ঘটে থাকে।




*****



আমরা শুরুতেই উল্লেখ করেছি, মাইসেলফ অ্যালেন স্বপন বেশ সচেতনভাবেই এই ধরণের পরিসরের মধ্যে থেকে তার যাত্রা শুরু করে। প্রথম এপিসোডে শহরে না হলেও, গ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ড দেখতে পাই আমরা – ইললিগ্যাল ইমিগ্র্যান্ট হিসেবে মংপু নামক চরিত্রটির বাসস্থান এবং মংপুর পালিয়ে যাওয়ার পরে অ্যালেন স্বপনের লুকানো পোড়োবাড়ি – এই সবই গ্যাংস্টার ছবির আইকোনোগ্রাফি হিসেবে আমাদের চেনা ছক। কিন্তু গন্ডগোল শুরু হয় এরপরেই – দ্বিতীয় এপিসোডের শুরুতেই সিরিজটি হঠাৎই প্রায় হ্যাঁচকা টানে ঢাকা শহরের নিতান্ত মধ্যবিত্ত একটি পরিবারের দৈনন্দিনতার মধ্যে আমাদের নিয়ে আসে। এতক্ষণের আলোচনা থেকে এইটুকু আমাদের স্পষ্ট হয়েছে – গ্যাংস্টার ছবির সঙ্গে মধ্যবিত্ত সমাজের খুব একটা সম্পর্ক থাকার কথা নয়। কারণ সাতে পাঁচে না থাকা মধ্যবিত্ত সমাজ সাধারণত অপরাধচক্র কিংবা সেই ধরণের ক্ষমতার সিঁড়ি থেকে বেশ কিছুটা দূরে থাকতেই পছন্দ করে। অ্যালেন স্বপনের যমজ দাদা শামসুর রহমানের স্ত্রী-কন্যা নিয়ে ঢাকা শহরের যে বাড়ি, সেই বাড়িও খুব স্বাভাবিক ভাবেই গ্যাংস্টার জগতের চেয়ে অনেক দূরে। কিন্তু সাত এপিসোডের এই সিরিজের প্রায় সত্তরভাগেরও বেশী অংশ – পাঁচটি এপিসোড – মূলত এই মধ্যবিত্ত বাড়ির দৈনন্দিনতার মধ্যেই আটকে। এই লেখার বাকি অংশে আমরা আপাত ভাবে এই কন্ট্রাডিকশন নিয়ে চিন্তা করতে চাইব – কীভাবে আপাদমস্তক গ্যাংস্টার ছবি হয়েও সিরিজটি নিজেকে মধ্যবিত্ত গার্হস্থ্য জীবনের আঙিনায় নিজেকে সঁপে দেয়।
সিরিজটির কাঠামো ভাষায় ব্যাখ্যা করতে গেলে ব্র্যাকেটের কথা মনে আসে। ব্র্যাকেট যেভাবে দুইদিক থেকে কোনো বাক্যকে ধরে রাখে, সেরকম ভাবেই সিরিজের শুরু আর শেষে আমরা দেখতে পাই গ্যাংস্টার ছবির আইকোনোগ্রাফি – আন্ডারওয়ার্ল্ড, অন্ধকার রাস্তা, মৃতদেহ, পুলিশি তদন্ত, অপরাধচক্র, অপরাধীদের নেতা ইত্যাদিকে। কিন্তু ব্র্যাকেটের মাঝের অংশে – এক্ষুণি আমরা যা বললাম – ছাপোষা মধ্যবিত্ত গার্হস্থ্য জীবন। আপাতভাবে গল্পের চলনে একে সহজেই বোঝা যায় – অ্যালেন তার দাদা শামসুর রহমানের ভেক ধরে অন্য জীবনে লুকিয়ে থাকতে ঢাকায় এসে আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু ব্যাপারটি এই এক লাইনে বলে দিলে আসলে কিছুই বলা হয় না।
সিরিজে মধ্যবর্তী এই পাঁচটি এপিসোডের কিছু কিছু অংশের দিকে আমরা মনোনিবেশ করতে পারি। যে মুহূর্তে অ্যালেন স্বপন শামসুর রহমান সেজে দাদার বাড়িতে প্রবেশ করে, সেই মুহূর্তে থেকে ছবির ভরকেন্দ্র আগে বর্ণিত সাসপেন্সের দিকে ঘুরে যায় – অপরাধী কে আমরা জেনে গেছি – সে কি তবে আদৌ ধরা পড়বে? দর্শক তো জানে যে এই লোকটি শামসুর রহমান নয়, অ্যালেন স্বপন – কিন্তু শামসুরের স্ত্রী, সিরিজের অন্যতম প্রধাণ চরিত্র – সে তো জানে না তার স্বামীর ভেক ধরে ঘরে প্রবেশ করেছে এক আততায়ী। সে কি তবে বুঝতে পারবে?
এই সময় থেকেই সিরিজটির কেন্দ্রে চলে আসে মধ্যবিত্ত দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট ঘটনা। অ্যালেন কি তার দাদার মতো জুতো পড়েই গটগট বাড়িতে ঢুকে পড়বে? ঘরের আলমারির চাবিটা কি সে দাদার মতোই বালিশের তলায় রাখবে? চাবির গোছায় যে চাবিতে আলমারি খোলে, যা দৈনন্দিনতার অভ্যাসে দাদা একবারেই পারত, সে কি সেটা একবারে পারবে? সে কি দাদার মতো স্কুটার চালিয়ে অফিস যেতে পারবে? দীর্ঘদিনের যৌনতাহীন দাম্পত্য জীবন কী একইরকম থেকে যাবে? দাদার মতোই সে ব্রেকফাস্টে খাবার খেতে পারবে? দাদার মতোই সে মেয়েকে আদর করতে পারবে?



দর্শক হিসেবে এই প্রশ্নগুলো আমাদের একভাবে সাসপেন্সের দিকে ঠেলে দেয় বটে – কিন্তু সাসপেন্সেরও প্রাথমিক স্তরের দিকে আমরা যদি তাকাই, তাহলে একটি জরুরি পরিবর্তন দেখতে পাবো। যে গ্যাংস্টার ছবির মূল কেন্দ্রবিন্দু হত তাড়া খাওয়া অপরাধী, বন্দুকের নল কিংবা রাতের শহর, সেই গ্যাংস্টার ছবিই এখন ঘরের জুতো পরতে পারা, আলমারির চাবি খোলা, স্কুটার চালাতে পারা কিংবা না পারা, চেনা দোকানিকে শনাক্ত করতে পারার দিকে ঘুরে গেছে। আমরা জানি, মধ্যবিত্ত জীবনের এই ছোট ছোট ডিটেল সাধারণত গ্যাংস্টার ছবিতে আসার কথাই নয়, কারণ গ্যাংস্টার ছবি মধ্যবিত্ত জীবনের গল্প বলে না। অ্যালেন স্বপনের ভেক ধরার গল্পের ছুতো ধরে এই সিরিজের নির্মাতারা আমাদের সরাসরি এনে ফেলেছেন মধ্যবিত্ত জীবনের ঘেরাটোপে – আপাত শান্ত স্থির দৈনন্দিনতাতেই এবার নির্মাণ হচ্ছে রহস্যের ঘনঘটা।
গ্যাংস্টার ছবি হঠাৎ করে মধ্যবিত্ত বাস্তবতায় পরিবর্তিত হয়ে যাওয়ার ঘটনা আমাদের সিনেমার ইতিহাস তথা বর্তমান সম্পর্কে খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু মন্তব্য তুলে ধরে। ঐতিহাসিক ভাবেই মধ্যবিত্ত জীবনের তুচ্ছ দৈনন্দিনতা যে ধরণের (জঁর নয়৪) ছবির আখ্যানে এনেছে, তা হল বাস্তবধর্মী সামাজিক আখ্যান। ইতালীয় নিওরিয়ালিস্ট ছবি উম্বের্তো ডি-র সেই বিখ্যাত রান্নাঘরের দৃশ্য আমরা সবাই দেখেছি। বাড়ির কাজ করতে করতে অল্পবয়সী কাজের মেয়েটি চুপ করে বসে আছে – ক্যামেরাও তার সঙ্গে অপেক্ষা করছে দৈনন্দিনতার ঘেরাটোপে। উপমহাদেশের ছবিতে এই ধরণের বাস্তবধর্মী আখ্যান আমরা দেখেছি সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে। সারা পৃথিবী জুড়েই বাস্তবধর্মী ছবি তার চলনে মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের দৈনন্দিনতাকে প্রধান গুরুত্ব দিয়ে এসেছে – যার চূড়ান্ত একটি রূপ পাওয়া যায় ফরাসী চলচ্চিত্রকার শাঁতাল আকেরম্যানের জঁ দিয়েলম্যান (১৯৭৫) ছবিতে।
এখন প্রশ্ন হল – দৈনন্দিনতাই যদি একটি ছবি/সিরিজের মূল বিষয় হয়, তাহলে সে কি রহস্য সৃষ্টি করতে পারে না? বাস্তবধর্মী সামাজিক ছবি সাধারণত গ্যাংস্টার থ্রিলার হয় না (অবশ্যই ব্যতিক্রম আছে), আবার অন্যদিকে গ্যাংস্টার গল্প মধ্যবিত্ত জীবন নিয়ে খুব একটা কথা বলে না। কিন্তু আমরা জানি, শিল্পে অসম্ভব বলে কিছু নেই – সব যুগের শিল্পীরাই তাঁদের নিজেদের কাজের পরিসরকে ক্রমশ উন্মুক্ত করেছেন একের সাথে অন্যকে মিশিয়ে দিয়েই। মাইসেলফ অ্যালেন স্বপন সিরিজটি খুব সচেতন ভাবেই এই মাস্টারস্ট্রোক তৈরী করে – সে গ্যাংস্টার ছবিকে মধ্যবিত্ত গৃহস্থালীর আওতায় নিয়ে চলে আসতে চায়, যা অত্যন্ত কঠিন একটি প্রক্রিয়া। এর ফলে কিছু জরুরি অর্জনও হয়, যা আমরা খানিকটা আলোচনা করার চেষ্টা করবো।
যেমন ধরা যাক একটি নির্দিষ্ট মোটিফ। অ্যালেন স্বপন যখন তার দাদার বৌকেও নিজের দলে টেনে নিয়ে যৌনতায় লিপ্ত হয়, তখন বারবার ঘরের দরজা বন্ধ করে দেওয়ার দৃশ্য আসে – ধরের বাইরে থেকে নির্মাতারা আমাদের দেখান/শোনান, দরজা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং ভিতর থেকে দুই নারী-পুরুষের শীৎকার মিশ্রিত হাসির শব্দ ভেসে আসছে। বাড়ির অন্য যে সদস্যরা রয়েছে, তারা মাঝে মাঝেই এই দুই মানুষের দরজা বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনায় খানিক অবাক হয় – ফলে দরজা বন্ধ করে দেওয়ার ক্রিয়াটি আরও বেশি করে আন্ডারলাইন করে দেওয়া হয়। আপাতভাবে ঘরের দরজা বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাটি সাধারণ মধ্যবিত্ত ডিটেল হিসেবেই আমাদের কাছে পরিচিত – কিন্তু গ্যাংস্টার ছবির ইতিহাসে এই দরজা বন্ধ করে দেওয়ার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দ্যোতনা রয়েছে।


গডফাদার ছবিটি নিয়ে শুরু থেকেই কথা বলছিলাম আমরা – এই ছবির অন্তিম লগ্নে দরজা বন্ধ করে দেওয়ার অত্যন্ত কাব্যিক এবং ইঙ্গিতপূর্ণ একটি দৃশ্য রয়েছে। আল পাচিনো অভিনীত ‘সোনি’-র চরিত্র, যে তার এককালীন প্রেমিকা ডায়ানা কিটন অভিনীত ‘কে’ নামের মেয়েটিকে কথা দিয়েছিল, তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সব কথাই ভাগ করে নেবে – সে-ই এখন কোরলিওনে পরিবারের অধিপতি হয়ে ওঠার মুহূর্তে, পারিবারিক বেআইনি ব্যবসার কথা আড়াল করার জন্য ‘ঘর’ নামক সত্তাটিকে আলাদা করে দেয় প্রেমিকার কাছ থেকে। ঘরে থেকেও অধিপতি পুরুষের ঘরকে আলাদা করে দেওয়ার, কিংবা গ্যাংস্টার হয়ে ওঠার এই ম্যাসকুলিন যাত্রাপথে তার প্রেমিকাকে ছেঁটে ফেলার জরুরি একটি চিহ্নক হিসেবে দরজা বন্ধ করে দেওয়ার এই শটটি সিনেমার ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দ্যোতনা হয়ে থেকে যাবে।
মাইসেলফ অ্যালেন স্বপন-এ, বলা বাহুল্য, দরজা বন্ধ করে দেওয়ার দ্যোতনা সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে – কিন্তু গডফাদার ছবির সঙ্গে এই অবশ্যম্ভাবী আত্মীয়তার দিকটি আমরা এড়িয়ে যেতে পারি না। একদিকে যেমন সিনেমার ইতিহাসকে নিজের শরীরে খোদাই করে রাখার সিনেফিলিক প্রচেষ্টা খুঁজে পাওয়া যায়, অন্যদিকে গ্যাংস্টার ছবির ঘরানায় থেকেও সে যে খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিবর্তনের পথে হাঁটছে, তাও আমাদের কাছে এই শটগুলির মাধ্যমেই স্পষ্ট হয়ে যায়।
কিন্তু গ্যাংস্টার ছবি হয়েও মধ্যবিত্ত দৈনন্দিনতার ঘেরাটোপে নিজেকে আটকে ফেলার যাওয়ার এই প্রক্রিয়া শুরুমাত্র সিনেফিলিক ট্রিবিউট বললে আমরা অনেকটাই ভালো করে দেখতে পাবো না। এই সক্রিয় সিদ্ধান্তে একদিকে যেমন গ্যাংস্টার জঁরেই জরুরি কিছু অন্তর্ঘাত ঘটানো সম্ভব হয়, একই সাথে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ‘ঘর’, নিরাপত্তা এবং সন্ত্রাসের ধারণাটিও৫। কিন্তু তার সাথে একইভাবে জরুরী হয়ে ওঠে বাস্তবতাবাদ (রিয়েলিজম) বিষয়ে সমকালীন বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার ছবির কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনে। এই প্রসঙ্গে সামান্য কিছু আলোচনা করেই আমরা এই প্রবন্ধের ইতি টানবো।
সিনেমার ইতিহাসে দীর্ঘকাল বাস্তবতাবাদী ছবি এবং মূলধারার ছবির মধ্যে বেশ আড়াআড়ি এক বিভাজন ছিল। ক্লাসিকাল হলিউড ছবির আপাত বাস্তবতাবাদী মোড়ক থেকে যুদ্ধ পরবর্তী ইতালির বাস্তবতাবাদী ছবিকে আলাদা করার জন্য যেমন নয়া-বাস্তববাদ (নিও রিয়েলিজম) শব্দটি ব্যবহার করা হয়। শুধু শব্দেই নয় – চলচ্চিত্রের প্রাথমিক বোধের জায়গা থেকেই মূলধারার ছবির বাস্তবতাবাদ এবং সমান্তরাল ছবির বাস্তবতাবাদ অনেকটা আলাদা ছিল। প্রথম ধরণের ছবি যদি তুচ্ছ দৈনন্দিন ডিটেলে নজর দেয়ও, তা হবে অঙ্কের নিয়মে মাপা – কোথাও কোনো বাড়তি কথার জায়গা থাকবে না। কিন্তু নয়া-বাস্তববাদী ছবি এই সাধারণ জীবনের সাধারণ ঘটনাকেই তাদের ছবির প্রধান বিষয় বলে দাবি করে – সেখানে ঘটনার গতির থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে দৈনন্দিনতার ডিটেল।
মূলত বিশ্বায়ন-পরবর্তী পৃথিবীর চলচ্চিত্র এবং পরবর্তীকালের ওয়েব সিরিজেই এই বিভাজন অনেকখানিই ধুয়ে গেছে। চলচ্চিত্রের ডিজিটাল রূপান্তর হওয়ার সাথে সাথে বেশ কিছু চলচ্চিত্রবেত্তা রিয়েলিজম জিনিসটাই বাতিলের খাতায় ফেলে দিতে চেয়েছিলেন এই যুক্তিতে, যে পোস্ট-প্রোডাকশন ম্যানিপুলেশনে এখন কম্পিউটার এবং সফটওয়্যার কার্যত চিত্রকরের কল্পনার সমতুল্য ইমেজ জন্ম দিতে পারে। যদি চলচ্চিত্রের ইনডেক্সিকাল সম্পর্কই৬ নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে আর ‘রিয়েল’ বলে কিছু থাকে কি?
কিন্তু ঘটনাচক্রে দেখা গেছে, চলচ্চিত্র এবং ওয়েব সিরিজে বাস্তববাদ জিনিসটা প্রায় নতুন রূপে ফিরে এসেছে। শুধুমাত্র সমান্তরাল ধারার ছবিই নয়, বরং মূলধারার রীতিমত ঘোষিত জঁর ছবিও ইদানীং বাস্তবতাবাদী ছবির নানান স্ট্র্যাটেজি অনুসরণ করতে শুরু করেছে। মাইসেলফ অ্যালেন স্বপন এই ধারায় শুধুমাত্র গুরুত্বপূর্ণ একটি সংযোজনই নয়, বরং বলা চলে জরুরি একটি মাত্রা – কারণ ধ্রূপদী বাস্তববাদী চলচ্চিত্রের প্রধানএকটি বৈশিষ্ট্য, মধ্যবিত্ত জীবনধারার খুঁটিনাটি-কে, সিরিজটি গল্পের প্রায় প্রাথমিক ভরকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে। প্রকারান্তরে গ্যাংস্টার গোত্রের ছবি/সিরিজের ধারায় মাইসেলফ অ্যালেন স্বপন রীতিমত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এই সিদ্ধান্তের জন্যই – রহস্য, রোমাঞ্চ, সাসপেন্স, অপরাধ দেখানোর জন্য শুধুমাত্র চেনা ছকের চেনা আইকোনোগ্রাফিই নয়, বরং মধ্যবিত্ত গৃহস্থালীর অন্দরের ছবিও একইরকম কার্যকরী হতে পারে। গ্যাংস্টার ছবির আতঙ্ক কিংবা ত্রাসকে এই সিরিজ সদর থেকে অন্দরে টেনে আনে। এই স্ট্র্যাটেজির জন্যই নতুন ধরণের বাস্তবতাবাদী ছবি/সিরিজ নিয়ে যাঁরা চিন্তিত, মাইসেলফ অ্যালেন স্বপনতাঁদের জন্য অত্যন্ত জরুরী একটি কাজ হিসেবে গুরুত্ব পাবে।
তথ্যসূত্র ও টীকাঃ
১) ব্যারি কেইথ গ্রান্ট, “ইন্ট্রোডাকশন”, ফিল্ম জঁর রিডার, অস্টিন, ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাস প্রেস, পৃঃ ix.
২) স্টিভ নীল, জঁর অ্যান্ড হলিউড, রাটলেজঃ লন্ডন ও নিউ ইয়র্ক, পৃঃ ৬৫।
3) চলচ্চিত্রে আইকোনোগ্রাফি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জিনিস। জঁর ফিল্মের ক্ষেত্রে বারবার ব্যবহৃত হতে হতে নির্দিষ্ট ধরণের যে ইমেজ একটি জঁরের সাথে সংযুক্ত হয়ে যায়, সেই ইমেজকেই আইকোনোগ্রাফি বলা হয়। যেমন উন্মুক্ত অ্যারিজোনার রুক্ষ প্রান্তর ওয়েস্টার্নের আইকোনোগ্রাফি। মহাশূণ্য থেকে দেখা পৃথিবী, স্পেসশীপ, রকেট, মহাকাশচারী ইত্যাদিদের ইমেজ সায়েন্স ফিকশন ছবির আইকোনোগ্রাফি।
৪) ‘রিয়েলিজম’ বা বাস্তবতাবাদকে অনেকে জঁর বলেন বটে, তবে জঁরের সংজ্ঞায় রিয়েলিজমকে ফেলা যায় না। বাস্তবতাবাদ একটি ‘মোড’ হিসেবে আমরা পড়ে থাকি। যে কোনো জঁরের ছবিই বাস্তববাদী হতে পারে। কিন্তু বাস্তববাদী ছবি কোনো জঁর ছাড়াও বানানো হয়ে থাকে।
৫) সিনেমার ইতিহাসের দীর্ঘ একটা সময় জঁর ফিল্মে সদর আর অন্দরের খুব মোটাদাগের ব্যবধান ছিল। অপরাধ কেন্দ্রিক ছবিতে সদর যদি হয় দুষ্কর্ম কিংবা আতঙ্কের জায়গা, অন্দর সেখানে নিশ্চিত নিরাপত্তার ক্ষেত্র – এ মোটামুটি সাধারণ নিয়ম হিসেবে মেনে চলা হত। তবে ঠিক যেভাবে জঁরের মধ্যেই নানান ভ্যারিয়েশন হয়, সেভাবেই ঘরের মধ্যেই মূল বিপদ লুকিয়ে আছে – এই জাতীয় বিষয় নির্বাচন করে দীর্ঘদিন ধরে জঁর-ভিত্তিক সাহিত্য কিংবা সিনেমা বানানো হয়েছে। ১৯৪৬ সালের ছবি দ্য স্পাইরাল স্টেয়ারকেস এই বিষয়ে প্রথম সারিতে থাকবে। তবে সদর থেকে অন্দরে সন্ত্রাসের যাত্রা বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতার সেরা কাজ রে ব্র্যাডবেরীর লেখা ছোট্ট একটি গল্প, ‘দ্য হোল টাউন ইজ স্লিপিং’, যা ১৯৫০ সালে প্রকাশিত হয়েছিল।
৬) যেকোনো বাস্তব বস্তু আর তার রিপ্রেজেন্টেশন, অর্থাৎ চিত্র, লেখা ইত্যাদি – এই দুইয়ের মধ্যে তিন ধরণের সম্পর্ক দেখা যায় (আমেরিকান ভাষাতত্ত্ববিদ সি এস পিয়ার্স এই ভাবে শ্রেণীবিভাগ করেছিলেন)। আইকন, ইনডেক্স এবং সিম্বল। এর মধ্যে ইনডেক্স হল সেই ধরণের সম্পর্ক, যেখানে রিপ্রেজেন্টেশন হওয়ার জন্য বাস্তবের বস্তুটির প্রত্যক্ষ উপস্থিতি জরুরী। যেমন আঙুলের ছাপ – ছাপটি যদি রিপ্রেজেন্টেশন হয়, তাহলে রিয়েলিটি হিসেবে কোনো একটি মানুষ আছেই, ধরে নিতে হবে। ডিজিটাল রেভোল্যুশনের আগে পর্যন্ত ফটোগ্রাফির ক্ষেত্রেও এই ইনডেক্সিক্যাল রিলেশনশিপ অত্যন্ত জরুরী ছিল – অর্থাৎ ফটো তুলতে গেলে বাস্তব বস্তুটির অস্তিত্ব অপরিহার্য। চলচ্চিত্রের ধ্রুপদী বাস্তবতাবাদী তত্ত্ব এই সম্পর্কের উপরজোর দিয়েই তৈরি হয়েছে।

One thought on “অন্দরে সন্ত্রাসঃ গ্যাংস্টার জঁর ও মাইসেলফ অ্যালেন স্বপন”